২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রকৃতি ও মানবতা

হেমন্তে শীতের আমেজের আগে একটু শুষ্ক আবেশ থাকে। শীত আসছে তা জানান দিতেই বোধহয় প্রকৃতি ধরন পাল্টায়। হাতে পায়ে গায়ে লোশন, ক্রিম, তেল না দিলে শরীরে অসস্তি বোধ হয়। আবহাওয়া পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের অভ্যাস পরিবর্তনের জন্যই হয়ত এমন আগাম আয়োজন আমাদের প্রকৃতিতে আগমন করে। হেমন্তের বিকেলে গ্রামের আঁকাবাঁকা পথ দিয়ে চললে ধানের সবুজগুলোতে শিশিরের আভা নজরে পড়ে ও অনুভূত হয়। রৌদ্রের প্রখরতা কম মনে হয়। তখন সূর্যাস্ত দেখলে মনের ভেতর এক নতুন অনুভবের অনুভূতি জাগে। সূর্যকে তখন যে রঙ্গে দেখা যায় সেটাকে কি রং বলবেন? লাল বলা যাবে না, লালের মতো একটি আভা। লালের সঙ্গে হলদে। মন-প্রাণ দিয়ে এ রং অনুভব করতে হবে, তা না হলে এমন রং হৃদয়ে কোন আলাদা অনুভূতি আনবে না। সূর্য পৃথিবী থেকে নয় কোটি ত্রিশ লাখ মাইল দূরে। সূর্যের কাছাকাছি তাপমাত্রা ছয় হাজার ডিগ্রী সেলসিয়াস। অথচ এ হেমন্তের শুরুতেই আমরা সূর্যের স্নিগ্ধ আলো পাই। প্রকৃতিতে পরিবর্তন আসে। মেঠোপথের দু’ধারে সকালের রূপের সঙ্গে দুপুর আর বিকেলের রং আলাদা আলাদা রূপে সাজে। দুপুরে যখন সূর্যের আলোর বিচ্ছুরণ হয়ে অতনু ধানের গাছের সবুজে পরে তখন মনে হয় আলোর ঝরনা ঝরছে। সত্যিই তো তাই। সবুজ সব গাছগুলোই এই আলোর ঝরনা থেকে ক্লোরোফরমটাকে গ্রহণ করে আর বাতাস থেকে কার্বন-ডাই অক্সাইড। আর আমরা মানুষ বাতাস থেকে অক্সিজেন নেই আর কার্বন-ডাই অক্সাইড ছেড়ে দেই। এখন বিজ্ঞান বলে কার্বন-ডাই অক্সাইডই হলো গ্রীন হাউস এফেক্টের মূল কারণ। যার দ্বারা জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে। এ গ্রহের উষ্ণতা বেড়ে যাচ্ছে, এর প্রভাবে আস্তে আস্তে এন্টার্টিকার বরফ গলে সমুদ্রের উচ্চতা বেড়ে যাবে, তাতে পৃথিবীর অনেক শহর-লোকালয় ডুবে যাবে, যে লিস্টে আমার অনেক প্রিয় জন্মস্থান ভোলার নামটিও আছে। মানুষ জীবনকে সহজ করার জন্য বিজ্ঞানের উন্নতি করছে, তা অবশ্যই করার প্রয়োজন। বিজ্ঞান এমন এক আবিষ্কার যা আমাদের এ পৃথিবীতে যা যা বিদ্যমান সেগুলোর ওপর গবেষণা করে আনতে হয়। শত শত বছর এটার একটা ধারাবাহিকতাও আছে। এখন বিজ্ঞানের স্বর্ণালী যুগ। কিন্তু বিস্ময়কর হলো মানুষের প্রয়োজনের জন্য যা যা আবিষ্কার তার অধিকাংশই এ পৃথিবীর অস্তিত্বের জন্য ক্ষতিকর। কলকারখানা, অণু-পরমাণুর গবেষণা, তা থেকে তৈরি সব প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র হতে হেলিকাপ্টার, প্লেন, রকেট, এটমবোমা পারমাণবিক বোমা আরও অনেক বড় বড় লিস্ট এ তালিকায় যোগ হবে। কলকারখানার কার্বন-ডাই অক্সাইড নিঃসরণ থেকে শুরু করে বড় বড় পারমাণবিক চুল্লি থেকে আলফা, বিটা, গামা-রে সহ সব কিছুই পৃথিবীর স্বাভাবিকতাকে নষ্ট করছে। অথচ প্রকৃতির সব কিছুই প্রকৃতির জন্য হীতকর ও পৃথিবীর অস্তিত্বের জন্য খুব প্রয়োজন। কার্বন-ডাই অক্সাইড নিঃসরণ কমানোর জন্য এখন নতুন নতুন উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে যাতে জলবাযুর পরিবর্তন কমানো যায়। আসলে তা হলো এ পৃথিবীকে রক্ষা করার প্রয়াস। পৃথিবীকে মানুষের বাসযোগ্য করার চেষ্টা। এ পৃথিবীর যত প্রাণী আছে কেউই এ পৃথিবীকে ধ্বংস করার কোন কাজে লিপ্ত হওয়ার ক্ষমতা স্রষ্টা তাদেরকে দেয়নি। অথচ মানুষ তার বুদ্ধি আর বিবেক দিয়ে নিজের আরাম আয়েশের সব ব্যবস্থাই করার চেষ্টা করতে পারছে। ৩০ ডিগ্রী সেলসিয়াস এ যেমন টিকে থাকতে পারছে আবার ৫০ ডিগ্রী তে ও আরাম আয়েশে টিকে আছে। অনেক প্রতিকূল পরিবেশে মানব জাতিকে সুরক্ষা ও শান্তি দেয়ার জন্য চেষ্টা চলছে। ধনী দেশগুলো গরিব দেশগুলোকে সহযোগিতা করছে বলে ধারণা আপাত ও বাহ্যিক দৃষ্টিতে।

বিজ্ঞান মানুষকে উন্নত করছে। মানুষের যে খুব অল্প সময়ের জীবন তাতে স্বস্তি যোগ হচ্ছে। যে পথে আগে হেঁটে হেঁটে যেতে হতো, মাসের পর মাস লাগত সেখানে এখন ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছানো যায়। ঝর-প্রলঙ্করী জলচ্ছ্বাসে তখনকার দিনে লাখ লাখ মানুষ মারা যেত, এখন আবাহাওয়া অফিসের বদৌলতে জীবনের ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমানো যাচ্ছে। বিজ্ঞানের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে হৃদরোগ, ক্যান্সারসহ কত বড় বড় রোগের চিকিৎসা মানুষ পাচ্ছে। সব গবেষণা মানুষের শান্তির জন্য করা হয়। কিন্তু বিজ্ঞানের যে আবিষ্কার তা দিয়ে মানুষের ক্ষতিও তো করছে। পৃথিবী অশান্ত হচ্ছে।

ক্যান্সারের চিকিৎসায় যে রে ব্যবহৃত হয় তা দিয়ে আক্রান্ত রোগী যেমন সুস্থ হয়ে ওঠে তেমনি এর অসতর্কতা সাধারণত মানুষের ক্ষতিও করে। পারমাণবিক চুল্লি ব্যবহার করে বিদ্যুত উৎপাদন বাড়িয়ে বিজ্ঞান ও সভ্যতার উন্নতি যেমন হচ্ছে ও তেমনি এর অসতর্কতা হাজার লক্ষ লোকের প্রাণ হরণ করে নিতে পারে। পারমাণবিক বোমার আরও ভয়ঙ্কর রূপ এ পৃথিবী দেখেছে জাপানের হিরোশিমা-নাগাসাকিতে। লাখ লাখ নিরীহ মানুষের প্রাণহানি করেছে যা যুগ যুগ বহু যুগ ধরে এমন অসভ্য মানবতাকে পৃথিবী অবাক বিস্ময়ে দেখেছে, এখনও অনুভব করছে। আজ বিজ্ঞান এমন এমন আবিষ্কার নিয়ে আসছে যা হয়ত ১০০ বছর আগের মানুষ যদি শুনতো তা হলে বলত ‘অলৌকিক’।

নিরীহ বলেই হয়তবা প্রকৃতি মানুষের প্রিয়, সুন্দরের প্রতিচ্ছবি। শিশুরাও মানুষ কিন্তু নিরীহ অসহায়, তাই শিশুরা সবার প্রিয় আদরের। যে কোন দেশের এক একটি শিশু ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে পৃথিবীর সবার কাছেই প্রিয়। নারীরাও নিরীহ। তাই নারী ও শিশুদের রক্ষার জন্য মানবতা সৃষ্টির শুরু থেকেই বিশেষ দৃষ্টি পেয়েছে। একজন শিশু যেন সুস্থ সুন্দরভাবে পৃথিবীতে আগমন করতে পারে তার জন্য কত আয়োজন আমরা করছি। বিজ্ঞানের বদৌলতে প্রসূতিকালীন মা ও শিশুর মৃত্যুর হার গরিব দেশগুলোতেও অনেক কমে যাচ্ছে।

বিজ্ঞানের চর্চা হয় মানবতাকে রক্ষার জন্য, শিশু নারী আর প্রকৃতিকে সুরক্ষা দেয়া ও মানবতাকে টিকিয়ে রাখার জন্য। বিজ্ঞানকে বলা হয় সভ্যতা অথচ যেই বুদ্ধি আর বিবেক দিয়ে মানুষ বিজ্ঞানের বিস্তৃতি ঘটিয়েছে আবার সেই বিজ্ঞানের নিয়ন্ত্রকই কেন বা মানবতাকে হারিয়ে ফেলেছে! ধ্বংসযজ্ঞে মেতে উঠেছে! কত নিষ্ঠুর, অমানবিক আর পশুর চেয়ে অধম কাজে ধ্বংস আর হত্যায় মেতে উঠেছে। নিজেদের আরও উন্নত আরও প্রভাবিত রাখার জন্য দেশে-দেশে জাতিতে-জাতিতে বিভেদ ছড়িয়ে গোলা-বারুদের ঝনঝনানীতে নারী-শিশু, মানুষ-প্রকৃতি আর মানবতাকে চুরমার করে ধ্বংস করছে।

মো. জগলুল কবির

aglul2015@yahoo.com

মডেল : রুমা