১৩ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রার্থীরা আগামীকাল থেকেই প্রচার চালাতে পারবেন

  • পৌরসভা নির্বাচন

স্টাফ রিপোর্টার ॥ পৌরসভা নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের হিসাবনিকাশ কষতে শুরু করেছেন বাছাইয়ে বৈধতা পাওয়া প্রার্থীরা। ভোটাররাও তাদের কাক্সিক্ষত জনপ্রতিনিধি নির্বাচনে মানসিক প্রস্তুতি শুরু করেছেন। ভোটারদের অভিমত, যাকে ভোট দিলে বিপদে আপদে কাছে পাওয়া যাবে, এলাকার উন্নয়নে ও জনকল্যাণে যে প্রার্থী বেশি অবদান রাখতে পারবেন মেয়রপদে তাকেই বেছে নেবেন। এদিকে প্রার্থীরা ভোটারদের কাছে নিজের জনপ্রিয়তা তুলে ধরতে আগামীকাল থেকেই মাঠের লড়াই শুরু করবেন। তবে স্বতন্ত্র মেয়র, কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর প্রার্থীরা প্রতীক নিয়ে নির্বাচনী প্রচার শুরু করতে পারবেন ১৪ ডিসেম্বর থেকে। কমিশন জানিয়েছে, দলীয় প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দ থাকায় কাল থেকেই দলীয় প্রতীকে প্রচারে নামতে কোন বাধা নেই। কিন্তু স্বতন্ত্র বা নির্দলীয় প্রার্থীরা প্রতীক বরাদ্দের আগে আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু করতে পারছেন না। এজন্য তাদের ১৪ তারিখ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। তবে প্রতীক ছাড়া অনানুষ্ঠানিকভাবে কাল থেকে তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চাইতে পারবেন।

ইসির নিবন্ধিত ৪০টি রাজনৈতিক দল থাকলেও ইসি জানিয়েছে, এবারের পৌরসভা নির্বাচনে মোট ২০টি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করছে। তবে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট জোটগতভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলেও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট পৌরসভায় আলাদাভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে। তবে নির্বাচন কমিশনার শাহনেওয়াজ সাংবাদিকদের বলেন, এসব রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা আগামীকাল থেকেই তাদের দলীয় প্রতীকে প্রচার চালাবেন। তবে স্বতন্ত্র বা কাউন্সিলর প্রার্থীদের প্রতীক নিয়ে প্রচার চালাতে ১৪ তারিখ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। এছাড়া কমিশন আরও জানিয়েছে, চূড়ান্তভাবে কতটি রাজনৈতিক দল এ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে তা জানতে প্রার্থী প্রত্যাহারের শেষদিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। এখন পর্যন্ত কমিশনের হিসেবে যেসব দলের পক্ষে তাদের প্রার্থিতা নিশ্চিত করেছে তার মধ্যে রয়েছেÑ আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জাসদ, বিকল্পধারা, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, ওয়ার্কার্স পার্টি, জাতীয় পার্টি, বিএনএফ, এনপিপি, পিডিপি, খেলাফত মজলিশ, এলডিপি, বাসদ, সিপিবি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, ইসলামী ঐক্যজোট, বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন ও ন্যাপ।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এবারের নির্বাচন দলীয়ভাবে হওয়ায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে লড়াইটা জমবে বেশ ভালই। তবে ভোটের সুষ্ঠু পরিবেশের জন্য নির্বাচন কমিশনকে গুরুদায়িত্ব পালন করতে হবে। এজন্য সবার জন্য লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করতে হবে। এদিকে কমিশন জানিয়েছে প্রার্থীসহ দলের নেতাকর্মীদের আচরণবিধি মেনেই নির্বাচনী প্রচারে অংশগ্রহণ করতে হবে। ইতোমধ্যে সরকারের অতিগুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নির্বাচনী প্রচারে সব ধরনের সংশ্লিষ্টতা থেকে দূরে থাকার জন্য চিঠি দেয়া হয়েছে। তবে কমিশন জানিয়েছে, ক্ষমতার কোন অংশীদারিত্ব না থাকায় বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াসহ দলের সব নেতাকর্মীই নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিতে পারবেন। তবে তাদের প্রচার যেন জনসভায় রূপ না নেয় সেজন্য আগে থেকেই দলের চেয়ারপার্সনকে চিঠি দিয়ে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে।

আওয়ামী লীগের যেসব এমপি দলীয় প্রার্থীর পক্ষে মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার সময় দলীয় প্রার্থীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন বা আগাম প্রচারে অংশ নিয়েছেন তাদেরও কারণ দর্শাতে ইসি থেকে চিঠি দেয়া হয়েছে। তিন দিনের মধ্যে এ বিষয়ে ইসির কাছে তাদের জবাবদিহিতার জন্য ডাকা হয়েছে। তারা হলেনÑ ঢাকা-২০ আসনের এমএ মালেক, নাটোর-২ আসনের মোঃ শফিকুল ইসলাম শিমুল এবং বরগুনা-২ আসনের শওকত হাচানুর রহমান রিমন। এছাড়া আরও যেসব প্রার্থীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে তাদের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন।

নির্বাচন কমিশন সচিব মোঃ সিরাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, তিন সংসদ সদস্যকে শোকজ করা হয়েছে। নির্বাচনে যারা আচরণবিধি লঙ্ঘন করবেন তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে। কমিশন জানিয়েছে মন্ত্রী, সংসদ সদস্যসহ সরকারের সুবিধাভোগী অতিগুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নির্বাচনী প্রচারে অংশ না নেয়ার অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দিয়েছে (ইসি)। ইতোমধ্যে কমিশন সচিবালয় থেকে সংসদ সচিবালয়ের সচিব ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিবের কাছে পৃথক দুটি চিঠি দিয়ে এ অনুরোধ জানানো হয়। এছাড়াও নির্বাচন কর্মকর্তাদের যথাযথ দায়িত্ব পালনের বিষয়ে সতর্ক করে আরও একটি চিঠি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠিয়েছে ইসি। ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন ৩০ ডিসেম্বর ভোটগ্রহণের দিন পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে নির্বাচনের শুরুতেই কঠোর হতে চায় ইসি।

এদিকে কমিশন জানিয়েছে আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনে ব্যয়ের হিসাব চূড়ান্ত করা হয়েছে। ২৩৪টি পৌরসভা নির্বাচনে তাদের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১শ’ কোটি টাকা। কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই খরচের মধ্যে নির্বাচন পরিচালনায় যাবে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা। আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় খরচ ধরা হয়েছে ৫৫ কোটি টাকা। নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নির্বাচন পরিচালনায় প্রায় ৬৪ খাতে ব্যয় বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রিটার্নিং অফিসার, সহকারী রিটার্নিং অফিসার, নির্বাহী-বিচারিক হাকিমের বরাদ্দ, ভোটকেন্দ্র-ভোটকক্ষ স্থাপন, ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের ভাতা, নির্বাচনী সামগ্রী কেনা, পরিবহন, ব্যালট পেপার মুদ্রণসহ নানা খাত রয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, নির্বাচন পরিচালনায় খাতভিত্তিক ব্যয়ে মোট ৪৪ কোটি ৯২ লাখ ৪১ হাজার ৫০০ টাকা প্রয়োজন হতে পারে। আর বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য ৫৫ কোটি ৭ লাখ ৫৮ হাজার ৫০০ টাকা প্রয়োজন হবে। চলতি অর্থবছরে কমিশনের হাতে থাকা ৩১৬ কোটি টাকা থেকে ব্যয় হবে এ অর্থ। কমিশনের বাজেট শাখার এক কর্মকর্তা বলেন, বরাবরই নির্বাচন পরিচালনার চেয়ে আইনশৃঙ্খলা খাতে ব্যয় বেশি হয়। নির্ধারিত বরাদ্দের কম-বেশি ব্যয় হতে পারে।

এদিকে নির্বাচন কমিশনার মোঃ শাহনেওয়াজ সোমবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, কমিশনের জনবল কম থাকায় এবং সিনিয়র কর্মকর্তার অভাবে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের রিটার্নিং অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, কমিশনের সিনিয়র কর্মকর্তার সংখ্যা কম। আবার অফিসারেরও স্বল্পতা রয়েছে। এছাড়া ৮৫ জন কর্মকর্তার নামে মামলা চলছে। কাজেই প্রশাসন কর্মকর্তাদের দিয়ে নির্বাচন করছি এ ধরনের অভিযোগ সঠিক নয়। পৌরসভা নির্বাচন এবারই প্রথম হচ্ছে না। অথচ এবারই ইসির ৬১ জন কর্মকর্তাকে রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। আগের নির্বাচনগুলোতে ইসির কর্মকর্তাকে রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়নি। তাছাড়া প্রত্যেকটি পৌরসভায় ইসির কর্মকর্তাদের সহকারী রিটার্নিং অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, জনবল বাড়ানো হলে এবং অফিসাররা সিনিয়র হলে এর সংখ্যা আরও বাড়বে। আশা করছি কমিশনের কর্মকর্তা এবং প্রশাসনের কর্মকর্তারা মিলে নির্বাচনটা সুন্দর হবে।

নির্বাচনে সংরক্ষিত নারী প্রার্থীর প্রতীক নিয়ে সমালোচনার প্রেক্ষিতে তিনি বলেন, নারী প্রতীকগুলো কাউকে অসম্মান জানাতে সংরক্ষণ করা হয়নি। এগুলো করা হয়েছে প্রার্থীকে চিহ্নিত করতে। কমিশন স্থানীয় সরকার পৌরসভা নির্বাচনের আইন পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই বিধিমালাও পরিবর্তন করেছে। তাই বিধিমালা পরিবর্তনের সময় প্রতীক নিয়ে আলোচনার জন্য খুব সময় পাওয়া যায়নি। যে কারণে ওই প্রতীকগুলোই তাড়াহুড়ো করে দেয়া হয়েছে। এ নিয়ে কেউ অভিযোগ দিলে তা বাদ দেয়ার চিন্তাভাবনা কমিশনের রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

নির্বাচনী প্রচারের বিষয়ে বলেন, দলের মেয়র প্রার্থীরা আগামীকাল ৯ ডিসেম্বর থেকেই প্রচারণা চালাতে পারবেন। স্বতন্ত্র মেয়রপ্রার্থী এবং কাউন্সিলরদের প্রতীকের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। কারণ তাদের প্রতীক বরাদ্দ হবে আগামী ১৪ ডিসেম্বর। এ জন্য তাদের বিরাট ক্ষতি হয়ে যাবে বলে মনে করি না। স্বতন্ত্র ও দলীয় প্রার্থীদের মধ্যে বৈষম্য তৈরি হবে কিনাÑ এমন প্রশ্নের উত্তরে বলেন, এটা সামান্য একটা বিষয়। ভোটার প্রতীক নয়, ব্যক্তিকে দেখে নির্বাচনে ভোট প্রদান করে। পৌরসভা বড় এলাকা নিয়ে গঠিত নয়। এতে খুব বেশি ক্ষতি হবে না। কারণ প্রতীক ছাড়াই স্বতন্ত্র প্রার্থীরা নিজ পরিচিতিতে প্রচারণা চালাবেন। তবে তিনি উল্লেখ করেন কে কিভাবে প্রচার চালাবেন তারা নিজেরা ঠিক করবেন। তবে তারা যেন কোন বিধি লঙ্ঘন না করেন সেদিকে কমিশন নজর রাখবে। তিনি বলেন, চাঁদপুর ও ফেনী থেকে কোন ধরনের আপত্তি-অভিযোগ কমিশনে আসেনি। প্রাথমিকভাবে সার্বিক বিষয়গুলো রিটার্নিং কর্মকর্তারা দেখেন। তবে কেউ যদি রিটার্নিং কর্মকর্তার আদেশে সংক্ষুব্ধ হন তাহলে তারা জেলা প্রশাসকের কাছে আপীল করার সুযোগ পাবেন। এ অভিযোগ ইসিতে এলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।