২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

স্বপ্নযাত্রার সারথি শেখ হাসিনা

  • এম. নজরুল ইসলাম

তাঁর হাত ধরে অনেক অর্জন বাংলাদেশের। ১৯৮১ সালে যখন জান্তার বুটের তলায় পিষ্ট প্রিয় স্বদেশ, তিনি এসেছিলেন অবরুদ্ধ গণতন্ত্রকে মুক্ত করতে। সেই থেকে কঠোর ব্রত সাধনায় তাঁর এই দীর্ঘ পথচলা। বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়েছেন তিনি। পায়ে পায়ে পাথর সরিয়ে দেশের মানুষের জন্য তৈরি করেছেন গণতন্ত্রের এক শক্ত ভূমি, যেখানে ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’। বাঙালী মানস সর্বদা স্বাধীনচেতা। কিন্তু ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জাতিকে ভিন্ন পথে চালিত করার যে অপতৎপরতা রাজনৈতিকভাবে শুরু হয়েছিল, কারফিউ গণতন্ত্রীদের সেই অপরাজনীতিকে প্রতিহত করতেই দেশে পা রেখেছিলেন তিনি। এর পর আবার নতুন এক স্বৈরশাসকের আবির্ভাব। কিন্তু গণমানুষের মুক্তির দূত হিসেবে যাঁর শপথ তিনি পিছনে ফিরে তাকাননি। সুখী গৃহকোণ ছেড়ে রাজনীতির জটিল পথকেই বেছে নিলেন কেবল জনকল্যাণের কথা চিন্তা করেই। জানতেন এ এমনই এক পথ যেখান থেকে তাঁর অন্তত সরে যাওয়ার কোন উপায় নেই। বাবার আদর্শ ছিল তাঁর পথ চলার নির্দেশক। সেই আদর্শের আলোকবর্তিকা জ্বালিয়ে রেখে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ বিশ্বনেতৃত্বের প্রথম সারির একজন। বিশ্বের আলোচিত রাজনৈতিক নেতৃত্ব হিসেবে তাঁর অর্জন, বাংলাদেশের জন্য গর্বের। গৌরবের অনেক অর্জন তাঁর হাত ধরে।

একেবারে সাম্প্রতিক অর্জনটি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী ‘ফরেন পলিসি’ সাময়িকীর একটি তালিকায় তাঁর নাম অন্তর্ভুক্তি। বিশ্বে পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে আগের বছরের সুনির্দিষ্ট অবদান ও ধারণাকে বাস্তব রূপ দেয়ার ক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে এ তালিকা তৈরি করেন ফরেন পলিসির সম্পাদকরা। বিভিন্ন দেশের রাজনীতিক, আইনজীবী, উদ্ভাবক, শিল্পী, সরকারী কর্মকর্তা ও স্বপ্নদ্রষ্টাদের নাম এতে স্থান পায়। এবার বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ১০০ চিন্তাবিদের তালিকায় স্থান পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

যুক্তরাষ্ট্রের মর্যাদাপূর্ণ সাময়িকী ‘ফরেন পলিসি’ এ তালিকা প্রকাশ করেছে ১ ডিসেম্বর। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ‘ডিসিশন মেকার’ হিসেবে এ তালিকায় স্থান করে নিয়েছেন। ফরেন পলিসি সাময়িকী চলতি বছর সিদ্ধান্ত প্রণেতা (ডিসিশন মেকারস), প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে সাফল্য অর্জনকারী (চ্যালেঞ্জার), উদ্ভাবক, (ইনোভেটর), পরামর্শদাতা (এ্যাডভোকেট), রূপকার (আর্টিস্ট), প্রশমনকারী (হিলার), তত্ত্বাবধায়ক (স্টুয়ার্ড), ইতিহাস বিষয়ক ভাষ্যকার (ক্রনিক্লার) ও ক্ষমতাধর কর্মকর্তা (মোগল) ক্যাটাগরিতে এই ১০০ চিন্তাবিদের তালিকা তৈরি করে। ২০০৬ সাল থেকে প্রতিবছরই প্রায় অভিন্ন ক্যাটাগরিতে শীর্ষ চিন্তাবিদদের তালিকা প্রকাশ করে আসছে সাময়িকীটি।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে তালিকায় রাখার ব্যাপারে ফরেন পলিসি তাদের প্রতিবেদনে যে কথা বলেছে তা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। ফরেন পলিসির প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ‘বাংলাদেশ বিশ্বের গ্রীনহাউস গ্যাস নির্গমনে মাত্র .০৩ শতাংশ পরিমাণে দায়ী থাকলেও ২০৫০ সাল নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে দেশটির এক কোটি ৮০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হবে। এ অবস্থায় অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা এবং ৩০ শতাংশ দারিদ্র্য হার থাকলেও দেশটির প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে পরিবেশগত সুরক্ষা গ্রহণ করেছেন। এই প্রচেষ্টা তাঁকে জাতিসংঘের ‘চ্যাম্পিয়ন্স অব দ্য আর্থ’ পুরস্কারও এনে দিয়েছে।’ ২০০৯ সালে তাঁর নেতৃত্বে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশই প্রথম জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় জাতীয় কৌশল গ্রহণ করেছে বলে ঐ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এর পর থেকে দেশটির জাতীয় বাজেটের ৬ থেকে ৭ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হচ্ছে এ খাতে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের এ প্রচেষ্টাকে উন্নয়নশীল বিশ্বের উদাহরণ হিসেবে বর্ণনা করে আসছেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আরও কিছু অর্জন এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। এসব অর্জন বাংলাদেশকেই গৌরবান্বিত করেছে। বাংলাদেশকে নতুন পরিচয়ে পরিচিত করেছে বিশ্বের দরবারে। ২০১১ সালে বিশ্বের সেরা প্রভাবশালী নারী নেতাদের তালিকায় ৭ম স্থানে রয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নাম। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক নিউইয়র্ক টাইমস সাময়িকীর জরিপে বিশ্বের সেরা প্রভাবশালী ও ক্ষমতাধর নারী নেতৃত্বের ১২ জনের নাম নির্বাচিত করে থাকে। ২০১০ সালে নিউইয়র্ক টাইমস সাময়িকীর অনলাইন জরিপে তিনি বিশ্বের সেরা দশ ক্ষমতাধর নারীর মধ্যে ষষ্ঠ স্থানে ছিলেন। ঐ সময় শেখ হাসিনা জার্মানির বর্তমান চ্যান্সেলর এ্যাঞ্জেলা মার্কেলের ঠিক পিছনে ছিলেন এবং ব্যাপক প্রভাব-প্রতিপত্তি বিস্তার করেছিলেন। ২০১০ সালের ৮ মার্চ বিশ্ব নারী দিবসের শতবর্ষে পদার্পণ উপলক্ষে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিশ্বখ্যাত সংবাদ সংস্থা সিএনএন ক্ষমতাধর ৮ এশীয় নারীর তালিকা প্রকাশ করে। উক্ত তালিকায় ষষ্ঠ অবস্থানে ছিলেন শেখ হাসিনা। এছাড়াও ২০১২ সালের ১২ জানুয়ারি দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি এবং উন্নয়নে অনন্য অবদানের জন্য ভারতের ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁকে ডক্টর অব লিটারেচার বা ডি-লিট ডিগ্রী প্রদান করে। ২০১৪ সালে সমুদ্রসীমা জয়ের জন্য তিনি সাউথ সাউথ পুরস্কার লাভ করেন। ২০১৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ ৭০তম অধিবেশনে পরিবেশ বিষয়ক সর্বোচ্চ পুরস্কার ‘চ্যাম্পিয়নস অব দ্য আর্থ’ পুরস্কারে ভূষিত হন। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে অনন্য অবদানের জন্য আইসিটি টেকসই উন্নয়ন পুরস্কার লাভ করেছেন তিনি। বাংলা একাডেমির সম্মানিত ফেলো শেখ হাসিনা, অনেক গ্রন্থের প্রণেতা।

সব কিছু ছাড়িয়ে তিনি এমন একজন সফল নেতা যিনি জনগণের মনের কথা বুঝতে সক্ষম। বাঙালীর মানস পরিবর্তনেও তাঁর অবদান কম নয়। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করেছেন। তাঁর ইস্পাতদৃঢ় সঙ্কল্পের কারণেই দেশ কলঙ্কমুক্ত হচ্ছে। এরই মধ্যে চার মানবতাবিরোধী অপরাধীর চূড়ান্ত দ- কার্যকর হয়েছে। অন্যদের বিচার চলছে। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচার ও দ- কার্যকর হয়েছে। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া চলমান।

অন্যদিকে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পথে অনেকখানি এগিয়ে গেছে বাংলাদেশ। পদ্মা সেতুর কাজ চলছে। শুরু হবে বঙ্গবন্ধু উপগ্রহের কাজ। নির্মিত হবে গভীর সমুদ্রবন্দর। খাদ্যে বাংলাদেশ এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ। নিম্ন আয়ের দেশ থেকে বেরিয়ে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত বাংলাদেশ এখন উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে পরিচিত হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। বাংলাদেশের উন্নয়নের রথে গতির সঞ্চার হয়েছে। বাংলাদেশের এ স্বপ্নযাত্রার সারথি তিনি। জয়তু শেখ হাসিনা!

লেখক : অস্ট্রিয়া প্রবাসী লেখক, মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিক

nayrul@gmx.at