২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ছেলেবেলা ও ছাত্রজীবন

  • আবুল মাল আবদুল মুহিত

ঢাকায় ছাত্রজীবনের আরও কথা

(৭ ডিসেম্বরের পর)

ছোট ভাই আব্দুল খালেক চৌধুরী ঢাকার ক্রীড়াঙ্গনে নামকরা ফুটবল খেলোয়াড় ছিল। সম্ভবত সে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ফুটবল এবং পূর্ব পাকিস্তান ফুটবল টিমের ক্যাপ্টেনও কোন সময় ছিল। কুমিল্লায় কিন্তু দু’চার দিন ঘোরাফেরা করেই আমার কঠিন অসুখ হলো ‘টাইফয়েড’। তখন সবেমাত্র টাইফয়েডের প্রতিষেধক ‘ক্লোরোমাইসেটিন’ ব্যবহৃত হচ্ছে, কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানে সেটা পাওয়া যায় না। আমার ডাক্তার বাবু ওষুধটা আগরতলা থেকে সংগ্রহ করার ব্যবস্থা করেন। যদিও এই ভ্রমণের উদ্দেশ্য ছিল দু’চার দিনের জন্য কুমিল্লা দেখার। কিন্তু বাস্তবে সেখানে আমাকে প্রায় ১০ দিন থাকতে হয়। তারপর আমাকে সিলেটে গিয়ে বিশ্রাম নিতে হয়।

ঢাকা যখন স্বাধীন পাকিস্তানের পূর্ববাংলা প্রদেশের রাজধানী হলো ১৯৪৭ সালে তখন সেখানে কোন দৈনিক এবং সম্ভবত কোন সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশিত হতো না। কলকাতায় দৈনিক পত্রিকা প্রকাশনার ইতিহাস তখন প্রায় ২০০ বছরের মতো। সেখানে অবশ্য প্রথম যে দৈনিকটি মুসলমান সম্পাদক কর্তৃক প্রকাশিত হলো সেটি ছিল ১৯৩৬ সালের দৈনিক আজাদ। এই পত্রিকাটি ১৯৪৮ সালের ১৯ অক্টোবর ঢাকায় স্থানান্তরিত হলো এবং এটিই ছিল পূর্ববাংলার প্রথম দৈনিক। জিন্দেগী নামে একটি দৈনিক মাত্র কয়েকদিনের জন্য প্রকাশিত হয়; কিন্তু অর্থাভাবে প্রেসটি দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। ঢাকায় দ্বিতীয় দৈনিক সংবাদপত্র ছিল ইংরেজীতে প্রকাশিত পাকিস্তান অবজারভার। মুসলিম লীগ নেতা এবং বিতাড়িত অর্থমন্ত্রী হামিদুল হক চৌধুরী ১১ মার্চ ১৯৪৯ সালে এই দৈনিকটি প্রকাশ করেন। এই মাসেই ২০ তারিখে তৃতীয় দৈনিক প্রকাশিত হয় এবং সেটাও ছিল ইংরেজী মর্নিং নিউজ। এই বছরেই মার্চ মাসের ১৪ তারিখে সাপ্তাহিক ইত্তেফাক আত্মপ্রকাশ করে। এই সাপ্তাহিকই ১৯৫৩ সালের ২৪ ডিসেম্বরে হয় ঢাকার পঞ্চম দৈনিক। জিন্দেগী প্রেস খরিদ করে ১৯৫১ সালের ১৯ মে মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিনের পৃষ্ঠপোষকতায় মুসলিম লীগের দৈনিক হিসেবে প্রকাশিত হয় দৈনিক সংবাদ। সংবাদ তাই ছিল চতুর্থ দৈনিক।

ঘটনাবহুল ১৯৫৪ সাল

১৯৫৪ সালটি ছিল নানা কারণে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর। আমার জীবনেও ছিল ঘটনাবহুল ও গুরুত্বপূর্ণ। জানুয়ারিতেই আমার বিশ বছর পূর্ণ হয় এবং বর্ষশেষে আমি ইংরেজী বিষয়ে সম্মান নিয়ে স্নাতক হই। এই বছরে আমি রাজনৈতিক বন্দী হিসেবে গ্রেফতার হই, তবে কারাবাস থেকে রক্ষা পাই। জাতীয় জীবনে এই বছরেই শুরু হয় পাকিস্তানকে ধ্বংস করার পরিকল্পিত কার্যক্রম। গোলাম মোহাম্মদ, বিচারপতি মোহাম্মদ মুনির বা চৌধুরী মোহাম্মদ আলী, যাদের পাকিস্তান আন্দোলনের সঙ্গে সামান্যই সম্পর্ক ছিল তারা হয় দেশের সর্বেসর্বা। নিজেকে প্রশ্ন করি কেমন কাটালাম এই গুরুত্বপূর্ণ বছরটি। তারই জবাব দেবার চেষ্টা করছিÑ

ক্স ১৯৫৩ সালের শেষ দুটি মাস ছিল পূর্ব বাংলায় প্রথম সাধারণ নির্বাচন নিয়ে সারাদেশের প্রস্তুতি। ১৯৪৬ সালে ব্রিটিশ ভারতে সর্বশেষ প্রাদেশিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেই সময়ে যারা নির্বাচিত হন তাদের মূল দায়িত্ব ছিল ব্রিটিশ শাসনের অবসানে ক্ষমতা গ্রহণ। কিন্তু এই সময়ে পাকিস্তানের নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই মনে করেন যে, তারা এই নতুন দেশটিকে শাসন করবেন এবং তারা অনবরত স্বাধীন দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠানটি পিছিয়ে দিতে থাকেন। এই শাসকবর্গ পাকিস্তানের সর্বত্রই ভীষণভাবে অজনপ্রিয় ছিলেন। পূর্ব বাংলার প্রতিনিধিরা সম্ভবত সেই সময়ে তাদের দেশে সবচেয়ে ঘৃণিত ব্যক্তিদের পর্যায়ে ছিলেন। নির্বাচন হবে এই তথ্যটি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সারাদেশের প্রস্তুতি শুরু হয় বিশেষভাবে এদের হাত থেকে দেশটিকে মুক্ত করার উদ্যোগটি ছিল একদিকে যেমন দৃঢ়, অন্যদিকে তেমনি বিরাট। অবশ্য এই সুযোগে অনেক প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিও তখন বিরোধী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে চায়। জনমত যখন মুসলিম লীগের নুরুল আমিন সরকারকে উচ্ছেদের জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল তখন অনেক ভুঁইফোঁড় দলও এই সুযোগে বাজিমাত করতে চায়। সব বিরোধী দল মিলে একটি যুক্তফ্রন্ট গঠন করে, যার নেতৃত্ব দেন আওয়ামী লীগের হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, নবগঠিত কৃষক-শ্রমিক-প্রজা দলের শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক এবং আওয়ামী লীগের মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। যুক্তফ্রন্ট নিয়ে অনেক নিবেদিত নেতাকর্মী অসন্তুষ্ট হলেও শেষ পর্যন্ত তারা যুক্তফ্রন্টের ছায়াতলেই সমবেত হন।

ক্স আওয়ামী লীগ ১৪-১৬ নবেম্বর ময়মনসিংহে তাদের কাউন্সিল সভায় যুক্তফ্রন্টের পক্ষে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং ৪ ডিসেম্বর লৌকিকভাবে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়। আওয়ামী লীগ এবং কৃষক-শ্রমিক-প্রজা দল ছাড়াও তার সদস্য হয় খেলাফতে রব্বানী গণতন্ত্রী ও নেজামে ইসলাম নামে কয়েকটি নতুন দল এবং জামায়াতে ইসলামী নামে পাকিস্তান বিরোধী মাওলানা মওদুদীর আরেকটি দল। ৮ ও ৯ মার্চে অবশেষে পূর্ব বাংলায় প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো।

চলবে...