২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পাকিস্তানে পারমাণবিক অস্ত্র বিশ্বের জন্য হুমকি

  • অঞ্জন আচার্য

পাকিস্তানের পারমাণবিক ক্ষেত্রে ক্রমাগত এগিয়ে যাওয়া দেশটিকে বিশ্বের কাছে তৃতীয় পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। তাই এই মুহূর্তে যদি এর লাগাম টেনে না ধরা যায়, তাহলে এর ভয়াবহ ফল বহন করতে হবে বিশ্ববাসীকে। সম্প্রতি এ কথা বলা হয়েছে নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত এক সম্পাদকীয়তে। পত্রিকাটিতে বলা হয়েছে, যদিও পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় একমত। তার পরও দেশটির একের পর এক এ বিষয়ে সমৃদ্ধি অর্জন বিশ্ব নিরাপত্তাকে হুমকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। পাকিস্তানের ১২০টিরও বেশি পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে, যা দেশটিকে আগামী এক দশকের মধ্যে পারমাণবিক শক্তিধর দেশ হিসেবে বিশ্বে তৃতীয় স্থান অধিকার করবে বলে মনে করা হচ্ছে। এই অবস্থা যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়াকে অতিক্রম করতে না পারলেও চীন, ফ্রান্স এবং ব্রিটেনকে ছাড়িয়ে যাবে। সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের অস্ত্রাগারগুলোতে প্রাণঘাতী অস্ত্রের ভাণ্ডার দ্রুত বাড়ছে, যা আগের যে কোন সময়ের চেয়ে বেশি। এর মধ্যে ছোট কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্রও রয়েছে। এগুলো পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে যে কোন সময়ে আক্রমণ করার সক্ষমতা রাখে। আর দূরপাল্লার যে পারাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, তার কথা তো বলাইবাহুল্য। বর্তমানে পাকিস্তানের কাছে যে পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে, তা ভারতের চেয়েও বেশি। তবে সবচেয়ে বেশি পারমাণবিক অস্ত্র মজুদ আছে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে। আর অল্প ব্যবধানে রাশিয়ার অবস্থান দ্বিতীয়।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি সাময়িকীতে বলা হয়েছে, বিশ্বের বৃহৎ শক্তিগুলো এরই মধ্যে দুই বছর পার করে দিয়েছে, ইরানের পারমাণবিক পরীক্ষা কার্যক্রম বন্ধ করতে। অথচ তাদের হাতে আদৌ এ ধরনের অস্ত্র আছে কিনা, তা নিয়ে যথার্থ কোন প্রমাণ এখনও মেলেনি। অথচ জাতিসংঘের চার সদস্য দেশ- ভারত, পাকিস্তান, ইসরাইল এবং দক্ষিণ সুদান পারমাণবিক অস্ত্রবিরতিকরণ চুক্তিতে (এনপিটি) সই করেনি। নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচটি স্থায়ী সদস্য দেশ যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও চীন এতে স্বাক্ষর করলেও ভারত-পাকিস্তান এ থেকে দূরেই রয়ে গেছে। মার্কিন প্রশাসন এ বিষয়গুলো বর্তমানে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করছে। তার পরও এর ভবিষ্যত কতখানি তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। আবার ভারত ও পাকিস্তানে দীর্ঘদিন জিইয়ে থাকা কাশ্মীর সমস্যা সমধানেও যুক্তরাষ্ট্র চোখে পড়ার মতো কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে না। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও এ ব্যাপারে তেমন কোন ভূমিকা পালন করছেন না। কয়েক দশক আগে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের পারমাণবিক অস্ত্র সমৃদ্ধকরণের বিষয়ে বিরাগভাজন হলেও ২০০৮ সালে তার সুর পাল্টে যায়। চীনকে দমাতে তখন তারা ভারতকে পাশে রাখতে চায়। এ কারণে তারা ভারতের সঙ্গে একটা ‘উদার পারমাণবিক সহায়তা চুক্তি’ স্বাক্ষর করে। যাতে করে ভারত তাদের কাছ থেকে পারমাণবিক শক্তির প্রযুক্তি ক্রয় করে। মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, তারা পাকিস্তানকে ভারতের মতো সে ধরনের কোন চুক্তিতে আসতে দিতে চায় না।

২.

আগেই বলা হয়েছে আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার পরেই তৃতীয় বৃহত্তম পারমাণবিক অস্ত্র মজুদকারী দেশ হতে যাচ্ছে পাকিস্তান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক দ্য কার্নেগি এনডোমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস এবং দ্য স্টিমসন সেন্টারের বরাত দিয়ে সম্প্রতি এ খবরও প্রকাশ করে ওয়াশিংটন পোস্ট। প্রতিষ্ঠান দুটি জানায়, প্রতিবেশী দেশ ভারতকে পরোয়া না করেই পাকিস্তান পারমাণবিক বোমার উন্নয়ন কাজে এগিয়ে যাচ্ছে। দেশটি প্রতিবছর ২০টি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে সক্ষম। এদিকে বিশ্লেষকদের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, এক হিসাবে পাকিস্তানের এখন ১২০টি ওয়্যারহেড আছে, আর ভারতের আছে ১০০টির কাছাকাছি। ওয়্যারহেড বাড়ানোর মাধ্যমে পাকিস্তান এ ক্ষেত্রে বিশ্বে তৃতীয় বৃহৎ দেশে পরিণত হবে। অবশ্য পাকিস্তানের কায়েদ-এ-আজম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরমাণু বিশেষজ্ঞ মনসুর আহমদ দাবি করেন, ‘পাকিস্তানের যে সক্ষমতা তাতে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে দেশটি ৪০ থেকে ৫০টির বেশি ওয়্যারহেড বানাতে পারবে না।’

প্রকৃতপক্ষে পারমাণবিক শক্তিতে পাকিস্তান ভারতকে ছাড়িয়ে যাওয়ার কারণ পাকিস্তানের আছে ইউরেনিয়ামের সমৃদ্ধ মজুত। প্রতিবেদনে জানানো হয়, পাকিস্তানের তুলনায় ভারতের অনেক বেশি প্লুটোনিয়ামের মজুদ থাকলেও এর বেশিরভাগ অংশই ব্যয় হয় দেশটির অভ্যন্তরীণ বিদ্যুত উৎপাদনের কাজে। তবে বিদ্যমান অবকাঠামোতে পারমাণবিক বোমা তৈরির ব্যাপারে পাকিস্তানী কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা নিরুৎসাহিত করলেও পাকিস্তান পরমাণু বোমার উন্নয়নে এগিয়ে যাচ্ছে।

৩.

একবার আইনস্টাইনকে প্রশ্ন করা হয়েছিল ‘তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে কী ধরনের অস্ত্র ব্যবহার হতে পারে?’ আইনস্টাইনের উত্তর ছিল ‘তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ সম্পর্কে জানি না, তবে চতুর্থ বিশ্বযুদ্ধ যে লাঠি এবং পাথর দিয়ে হবে তা বলতে পারি।’ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে যুদ্ধরত প্রতিটি দেশই পারমাণবিক বোমার দিকে এগোচ্ছিল। যুদ্ধের ব্যয় মিটাতে ব্রিটেনের তখন ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। জার্মানি ইউরেনিয়াম ফিশন গবেষণায় এগিয়ে থাকলেও যুদ্ধের সময়ে এদিকে তার নজর ছিল না। রাশিয়াকে পারমাণবিক বোমার জন্য অপেক্ষা করতে হয় ১৯৪৯ সাল অবধি। যুদ্ধের কারণে জাপানে তখন ঘাটতি চলছে। তাদেরও পারমাণবিক গবেষণার টাকা তখন নেই। শুধুমাত্র অপেক্ষাকৃতভাবে কম ক্ষতিগ্রস্ত দেশ যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে গেল পারমাণবিক বোমার দিকে। তবে হাল আমলে এসে ভারত-পাকিস্তানও এ বোমার মজুদ গড়ে তুলছে প্রকাশ্য বা গোপনে। ভারতের ভয়ে দ্রুতগতিতে নিজের পরমাণু অস্ত্রের মজুদ বাড়াচ্ছে পাকিস্তান এমন তথ্যই পাওয়া যায়। আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরের মধ্যে সাড়ে তিন শ’ পরমাণু অস্ত্রের অধিকারী হতে যাচ্ছে দেশটি। যুক্তরাষ্ট্রের দুই থিঙ্ক ট্যাঙ্কের প্রতিবেদন মতে, প্রতিবেশী ভারতের ভয়ে পাকিস্তান খুব দ্রুতগতিতে তার পরমাণু অস্ত্রের মজুদ বৃদ্ধি করছে। এরই মধ্যে পরমাণু ওয়্যারহেডের উন্নয়নে ভারতের চেয়ে অনেক এগিয়ে গেছে পাকিস্তান। ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, পরমাণু বোমা পরীক্ষার পর পাকিস্তানী কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকরা এ অস্ত্রের বিস্তারে ন্যূনতম সংযম ধারণের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, বর্তমান পথ অনুসরণের মাধ্যমে সেই অঙ্গীকারকে ছাড়িয়ে গেছে পাকিস্তান। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে পাকিস্তানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বিশাল মজুদ দেশটির জন্য একটি সুবিধাজনক অবস্থান তৈরি করে দেবে। এই ইউরেনিয়াম দিয়ে সহজেই দ্রুততার সঙ্গে পরমাণু অস্ত্র তৈরি করা যাবে।

৪.

দক্ষিণ এশিয়া ‘বিপজ্জনক’ পরমাণু প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছে বলে মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান সতর্কবার্তা জানানোর একদিন পরই পরমাণু অস্ত্রের হিসাব তুলে ধরা হয়েছে এ্যাটমিক সাইন্টিস্টের বুলেটিনের তথ্যচিত্রে। এতে বলা হয়েছে, ভারতের চেয়ে পাকিস্তানের পরমাণু অস্ত্রের সংখ্যা বেশি রয়েছে। মার্কিন সতর্কতায় বলা হয়, পরাশক্তির হওয়ার লড়াইয়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটতে পারে চীন-ভারত ও পাকিস্তানকে ঘিরে। পাকিস্তানের করাচিতে নতুন পরমাণু চুল্লি চালু ও চীনের ৫৮ গিগাওয়াট পরমাণু পরিকল্পনার পরিপ্রেক্ষিতে এই আশঙ্কা করেছেন আন্তর্জাতিক অস্ত্র বিশেষজ্ঞরা। চীন দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্র না হলেও আঞ্চলিক ভূমি বিরোধ ও সীমান্তবর্তী সন্ত্রাস ঝুঁকিতে এই প্রক্রিয়ার অনিবার্য অংশ হয়ে উঠেছে। অপরদিকে বুলেটিনের তথ্যচিত্রে জানা গেছে, পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা ১২০টি। যা ভারতের চেয়েও ১০টি বেশি। ২০১৪ সালের হিসাব এটি। বুলেটিনের প্রতিষ্ঠাতা ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর একদল বিজ্ঞানী। ১৯৪৫ সালে যাত্রা শুরু হয় এটির। ম্যানহাটন প্রকল্পে প্রথম পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে সহায়তাও করেছিলেন এই বিজ্ঞানীরা। তাদের তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া উভয়েরই পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে ৫ হাজার করে। এছাড়া ফ্রান্সের ৩০০টি, চীনের ২৫০টি, যুক্তরাজ্যের ২২৫টি এবং ইসরাইলের ৮০টি পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক পরীক্ষা চালিয়েছে মাত্র ২০০৬, ২০০৯ এবং ২০১৩ সালে। তবে বুলেটিনে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ২০২৫ সালের মধ্যে পাকিস্তান বিশ্বের পঞ্চম (তৃতীয় নয়) পারমাণবিক শক্তিধর দেশে পরিণত হবে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১১ সালে পাকিস্তানের কাছে ৯০ থেকে ১১০টি পারমাণবিক বোমা মজুদ ছিল। বর্তমানে তা বেড়ে ১১০ থেকে ১৩০টিতে পৌঁছেছে।

উৎক্ষেপণ প্রযুক্তির অগ্রগতি, চারটি চলমান প্লুটোনিয়াম রিএ্যাক্টর ও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ অব্যাহত থাকায় আগামী ১০ বছরে দেশটির পারমাণবিক অস্ত্রের মজুদের পরিমাণ আরও বাড়বে বলে ধারণা প্রকাশ করা হয়েছে। তবে এটি আরও নানা বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। অন্যদিকে পাকিস্তানের কাছে রয়েছে বর্তমানে পরমাণু অস্ত্র বহনে সক্ষম ছয় ধরনের ব্যালাস্টিক মিসাইল। এছাড়া স্বল্পপাল্লার শাহীন-১ ও মাঝারিপাল্লার শাহীন-৩ নির্মাণাধীন রয়েছে। দেশটি স্থলভূমিতে ক্ষেপণযোগ্য বাবুর (হাতফ-৭) ও আকাশসীমায় ক্ষেপণযোগ্য রাদ (হাতফ-৮) নামে দুটি ক্রুজ মিসাইল নির্মাণ করছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

৫.

সম্প্রতি পাক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের নেতৃত্বে তড়িঘড়ি বৈঠকে বসে সে দেশের সর্বোচ্চ সামরিক কর্তৃপক্ষ। তবে, নয়াদিল্লীর এই বিপুল সমরসজ্জার মোকাবেলা কোন পথে, ভাবতে গিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন পাকিস্তান সামরিক কর্তারা। পাকিস্তানের সামরিক বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকারী সংস্থা হলো ন্যাশনাল কমান্ড অথরিটি বা এনসিএ। ভারতের অস্ত্রাগার প্রচুর পরমাণু বোমা এবং বিভিন্ন ভয়ঙ্কর ক্ষেপণাস্ত্রের বিপুল সম্ভারে সেজে উঠেছে বলে খবর পেয়েছেন পাকিস্তানের গোয়েন্দারা। এ খবরটি তাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে দিয়েছে। ইসলামাবাদের কাছে খবর আছে, ভারতের হাতে পরমাণু বোমা তৈরির জন্য প্রায় এক টন প্লুটোনিয়াম রয়েছে। রিএ্যাক্টর গ্রেড প্লুটোনিয়াম রয়েছে আরও ১৫ টন। পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার বিপুলহারে বাড়ানোর জন্যই ভারত এত প্লুটোনিয়াম মজুদ করেছে বলে পাকিস্তানের আশঙ্কা। শুধু বোমা নয়, ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতেও ভারত অনেকটা এগিয়ে গিয়েছে বলে পাক সরকারকে খবর দিয়েছে সে দেশের গুপ্তচরেরা। বৈঠকে পেশ হওয়া রিপোর্টে বলা হয়েছে, ভারতের হাতে কত ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, তার কোন হিসাব নেই। সাবমেরিন থেকে নিক্ষেপযোগ্য দূরপাল্লারও মাঝারিপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রও বানিয়ে ফেলেছে ভারত। তৈরি করেছে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রতিরোধ ব্যবস্থাও। সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে ভারতের নতুন সমর কৌশল নিয়ে। ‘কোল্ড স্টার্ট ডকট্রিন’ নামে সেই যুদ্ধ পদ্ধতি পাকিস্তানের পক্ষে ভয়ঙ্কর হতে পারে বলে মনে করছে ইসলামাবাদ । বৈঠকে তাই স্থির হয়, ভারতের ক্রমবর্ধমান সামরিক শক্তির মোকাবেলায় পাকিস্তানকেও কৌশল তৈরি রাখতে হবে। মোদ্দা কথা, পাকিস্তান অনেক বেশি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে। সেই কারণেই গত অক্টোবর মাসে হোয়াইট হাউসে এক বৈঠকে নওয়াজ শরিফ মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে সিদ্ধান্ত জানিয়ে বলেন, কৌশলগত ক্ষুদ্র পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে পাকিস্তান কোন বিধিনিষেধ মেনে নেবে না। তার মতে, ক্ষুদ্র পরমাণু অস্ত্রের কারণে পারমাণবিক শক্তিধর বৃহৎ প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত পাকিস্তানে আকস্মিক হামলা চালাতে অনুৎসাহিত হবে বলে মনে করছে পাকিস্তান। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ধারণা, ক্ষুদ্র আকারের কারণে প্রচলিত যুদ্ধেও এ ধরনের পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারে প্রলুব্ধ হতে পারে পক্ষগুলো। এতে ইতোমধ্যেই অস্থিতিশীল হয়ে থাকা ওই এলাকার পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে পড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান পরমাণু অস্ত্রের বিষয়ে ওয়াশিংটনের উদ্বেগের মাঝেই সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য ওবামা প্রশাসন দেশটির কাছে আটটি এফ-১৬ জঙ্গীবিমান বিক্রির প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে পাকিস্তানের কাছে কৌশলগত ক্ষুদ্র পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার না করার প্রতিশ্রুতি চায় যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু সম্ভাব্য হামলা থেকে ভারতকে বিরত রাখতে ইসলামাবাদ বিকল্প জারি রাখতে চায় বলে জানান সাউথ এশিয়ান স্ট্র্যাটেজিক স্টাবিলিটি ইনস্টিটিউটের প্রধান মারিয়া সুলতান। পাকিস্তানের পরমাণু কর্মসূচীর সঙ্গে জড়িত এক কর্মকর্তা বলেন, ‘পাকিস্তানের পরমাণু কর্মসূচী ভারতকেন্দ্রিক। যুদ্ধকে কোন সমস্যার বিকল্প না ভাবার জন্যই এই কর্মসূচী। আর কৌশলগত পরমাণু অস্ত্র যুদ্ধের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে।’ তার ভাষ্য, ‘আমরা কোন্্ ধরনের অস্ত্র তৈরি করব অথবা ব্যবহার করব কেউ তার নির্দেশনা দিতে পারে না।’ এছাড়া পাকিস্তান পারমাণবিক ডুবোজাহাজ (সাবমেরিন) তৈরির কাজ করছে বলেও জানিয়েছেন ওই কর্মকর্তা। এই ডুবোজাহাজ পরমাণু অস্ত্র বহন করতে ও ছুড়তে পারবে। স্থলভিত্তিক পরমাণু অস্ত্র আক্রান্ত হলে সমুদ্রভিত্তিক বিকল্প হামলার সুযোগ হাতে রাখতে এ প্রকল্প নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধে অঙ্গীকারাবদ্ধ হলেও আধুনিকায়ন এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টা চালিয়েই যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়াসহ ৯টি দেশ। বিষয়টি নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে স্টকহোম আন্তর্জাতিক শান্তি গবেষণা ইনস্টিটিউট (এসআইপিআরআই) বা সিপ্রি। পারমাণবিক অস্ত্রবিষয়ক বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২০১০ সাল থেকে ২০১৫- এই পাঁচ বছরে সারা বিশ্বে পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা ২২ হাজার ৬০০ থেকে কমে ১৫ হাজার ৮৫০ হয়েছে। পাঁচ বছরে মোট ৬ হাজার ৭৫০টি অস্ত্র কমে যাওয়ার পরেও সিপ্রি বিষয়টি নিয়ে সন্তোষ বা স্বস্তি প্রকাশ করতে পারেনি। বরং শঙ্কাই প্রকাশ করেছে তারা। সংস্থাটি পর্যালোচনা করে দেখেছে, পারমাণবিক অস্ত্রে সক্ষম ৯টি দেশ অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ব্রিটেন, ফ্রান্স, চীন, ভারত, পাকিস্তান, ইসরাইল ও উত্তর কোরিয়া আসলে ভেতরে ভেতরে তাদের পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার কর্মসূচীকে সমৃদ্ধই করছে। সিপ্রির গবেষক শ্যানন কাইল বলেছেন, ‘পরমাণু অস্ত্রধারী দেশগুলো আধুনিকায়ন কর্মসূচী চালিয়ে যাচ্ছে। এর অর্থ, অদূর ভবিষ্যতে দেশগুলো পারমাণবিক অস্ত্র পরিহার করবে বলে মনে হয় না।’ প্রতিবেদনে বলা হয়, পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা হ্রাসে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়া। মোট হ্রাসের শতকরা ৯০ ভাগই এই দুটি দেশের অবদান। তবে সংখ্যা হ্রাসের মাধ্যমে দেশগুলো পারমাণবিক অস্ত্র পর্যায়ক্রমে পরিহার করার সদিচ্ছা প্রকাশ করেনি, কেননা, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স এবং ব্রিটেন মূলত মেয়াদ উত্তীর্ণ অস্ত্র কমাচ্ছে আর পাশাপাশি অস্ত্রের মজুদকে করছে আরও আধুনিক? পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, পাকিস্তান, চীনের কাছে পর্যপ্ত পরিমাণ মজুদ রয়েছে এই পারমাণবিক বোমা। তাদের ভেতর রাজনৈতিক অবস্থাও যে খুব ইতিবাচক তাও নয়। তবে আগাম ভবিষ্যতে যদি তারা নিজের মধ্যে পারমাণবিক শক্তি প্রদর্শন করে তবে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে। সেটার ফলাফল বাংলাদেশকেও কিছুটা হলে ভোগ করতে হবে।

-বিদেশী পত্রিকা অবলম্বনে