২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

স্মরণ ॥ অগ্নিযুগের বিপ্লবী বাঘা যতীন

যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় ওরফে বাঘা যতীন ২৬ অগ্রহায়ণ ১২৮৬ বঙ্গাব্দে (৮ ডিসেম্বর ১৮৭৯) কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার কয়া গ্রামে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা উমেশ চন্দ্র মুখোপাধ্যায়, মাতা সুপ্রশংসিত কবি শরৎশশী দেবী। পিতৃ বিয়োগের পর বাবার বাড়ি ঝিনাইদহ জেলার হরিণাকু-ুর সাধুহাটির বিশাখালী থেকে মায়ের সঙ্গে নানা বাড়ি কুমারখালীর কয়ায় চলে আসেন বাঘা যতীন।

কথিত আছে বাঘের সঙ্গে জঙ্গলে লড়াই করে নিজেকে রক্ষা করায় কলকাতার এক চিকিৎসক তার নাম দেন বাঘা। যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় তখন থেকেই বাঘা যতীন নামেই পরিচিত। কলকাতাতে পড়ার সময় বিপ্লবী গুপ্ত সমিতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে শুরু হয় তাঁর সংগ্রামী জীবন। ভারতবর্ষের মানুষকে ইংরেজদের পরাধীনতা থেকে সর্বপ্রকার দাসত্বের শৃঙ্খল ভেঙ্গে অর্থনৈতিক শ্রেণী বৈষম্য দূর করতে চেয়েছিলেন। এ লক্ষ্যেই তিনি বিপ্লবী সংগঠনকে একত্র করে ‘যুগান্তর দল’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর আন্দোলনের কৌশল ও দূরদর্শিতার গুণে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন নতুন মাত্রা লাভ করে। ক্রমশ তিনি হয়ে ওঠেন সর্বভারতীয় নেতা। বিপ্লবী বাঘা যতীন সর্বদা সাথীদের উদ্দেশ করে বলেন, ‘দেশের সুরাহা বাইরে থেকে নয়, তা আসবে অভ্যন্তর থেকে।’

জার্মানি থেকে অস্ত্র সংগ্রহ ও দীপান্তরপ্রাপ্ত বন্দীদের মুক্ত করে একযোগে ভারতের সর্বত্র ব্রিটিশ বাহিনীকে আক্রমণের পরিকল্পনা করেন। বিদেশী জাহাজের অস্ত্র খালাস করতে গিয়ে বাঘা যতীন তার সহযোগীদের নিয়ে আশ্রয় নেন চাষখ-ের জঙ্গলে। তাঁর হাত ধরেই ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন তথা স্বাধীনতা সংগ্রামের বিপ্লব যাত্রার সূচনা হয় তখন থেকেই। কাপ্তিপোদায় মাদারীপুরের চিত্তপ্রিয় রায় চৌধুরী, মনোরঞ্জন সেনগুপ্ত, নরেন্দ্র নাথ দাসগুপ্ত (নীরেন) ও কুষ্টিয়ার যতীন পাল (জ্যোতিষ)-এই চার কিশোরসহ অল্পসংখ্যক যোদ্ধা নিয়ে ব্রিটিশ ম্যাজিস্ট্রেট কিলবি এবং সেনাপ্রধান ট্রেগার্ট বাহিনীর সাড়ে চার হাজার ব্রিটিশ সৈন্যের বিশাল বাহিনীর সঙ্গে মরণপণ যুদ্ধ করেন, যা ছিল অভিনব এবং ভারতবর্ষে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে প্রথম সম্মুখযুদ্ধ। এ যুদ্ধ ছিল অপরিকল্পিত। সৈন্যরা চারদিক থেকে কাপ্তিপোদার চষাখ-ের জঙ্গল ঘিরে ফেলে। আড়াই ঘণ্টা মতান্তরে সাড়ে তিন ঘণ্টাব্যাপী চলে এ যুদ্ধ। ঘটনাস্থলে চিত্তপ্রিয় গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান। বাঘা যতীন গুলিবিদ্ধ হন অপর তিন কিশোর তাদের হাতে ধরা পড়েন গুলি শেষ হওয়ার পর। বাঘা যতীন পরদিন ১০ সেপ্টেম্বর বালাশোরের সামরিক হাসপাতালে ইহলোক ত্যাগ করেন। অন্তিম নিঃশ্বাস ত্যাগ করার পূর্বে তিনি বলেন, আমরা মরব, দেশ জাগবে। ‘ব্রিটিশ সেনাপ্রধান টেগার্টকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘ওদের কোন দোষ নেই। আমার অপরাধে ওদের যেন কোন দ- না হয়।’

টেগার্ট বিচলিত হয়ে পড়লেন। বললেন, ‘টেল মি যতীন মুখার্জি, হোয়াট ক্যান আই ডু ফর ইউ?’ বাঘা যতীন শান্তস্বরে উত্তর দিলেন, ‘নো থ্যাঙ্কস! অল’স ওভার, গুড বাই...’ টেগার্টের সামনেই বাঘা যতীন তার নিজের শরীরের সমস্ত সেলাই টেনে ছিঁড়ে ফেলেন। আবার ব্যান্ডেজ সেলাই দেয়ার চেষ্টা চলে। কিন্তু তাদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে মহান এই বিপ্লবী গোটা ভারতবর্ষকে কাঁদিয়ে চিরবিদায় নেন। কিন্তু রেখে যান দেশমাতাকে স্বাধীন করার অমূল্য মন্ত্রবীজ। টেগার্ট মাথা থেকে ক্যাপ খুলে বললেন, ‘If Jatin were an English man, then the English people would have built his statue next to Nelson’s at Trafalgar Square.।

বাঘা যতীন শুধু বিপ্লবী বীরই ছিলেন না, তিনি দার্শনিকও ছিলেন বলে এ কথা বলতে পেরেছিলেন- আর পালানো নয়... যুদ্ধ করে আমরা মরব, এতেই দেশ বাঁচবে- আমরা মরব জগৎ জাগবে।’ লিটন আব্বাস