২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিশ্ব দরবারে মুস্তাফিজ

  • মোঃ মামুন রশীদ

পুরনো ভীতির শেকড় উপড়ে ফেলে নতুন কিছু করতে বিস্ময়কর কিছু দরকার। কিছু করার ইচ্ছে, কিছু বদলানোর স্বপ্ন ও অপরিসীম কল্পনা- এই তিনের যোগসূত্র নিয়ে পথ চলায় তারুণ্যের শক্তি অপরিহার্য। কেউ কেউ এগিয়ে থাকে, তারাই ছিনিয়ে আনে বিজয়- জাগে নতুন বিস্ময়। এসব কিছুরই সম্মিলনে যেন জ্বলজ্বলে দৃষ্টান্ত বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের তরুণ পেসার মুস্তাফিজুর রহমান। তিনি দেখিয়েছেন তারুণ্য এক দুর্নিবার, অজেয় শক্তি। মাত্র ৮ মাসের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ক্যারিয়ারে গুটিকয়েক ম্যাচ খেলেই সারাবিশ্বে হৈচৈ ফেলে দেন এ তরুণ। ১৮ জুন অভিষেকের পর থেকে এখন পর্যন্ত ৯ ওয়ানডেতে ২৬ উইকেট নিয়ে বছরের সেরা উদীয়মান ক্রিকেটার তিনি। তাই আইসিসির বর্ষসেরা ওয়ানডে একাদশে ঠাঁই হয়েছে। যা বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে অনন্য ঘটনা, বিরল অর্জন এবং গৌরবময় অধ্যায়ের সূচনা। অবশ্য ২০০৯ সালে আইসিসির বর্ষসেরা টেস্ট দলে জায়গা করে নিয়েছিলেন বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান। কিন্তু ওয়ানডেতে এই প্রথম সেই গৌরব বয়ে আনলেন মুস্তাফিজ। তরুণ প্রজন্মের প্রেরণার জন্য জ্বলজ্বলে দৃষ্টান্ত কিভাবে হয়ে উঠলেন আট মাস আগেও সবার অচেনা এই মুস্তাফিজ? সে যেন এক রূপকথা-

জন্ম হোক যথা-তথা, কর্ম হোক ভাল। এ বছর ২২ এপ্রিলের আগে পর্যন্ত মুস্তাফিজের নাম পর্যন্ত শোনেনি কেউ। এমনকি জাতীয় দলের নির্বাচকরাও চেনেন না ঠিকমতো। সেদিন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে একমাত্র টি২০ ম্যাচের স্কোয়াডে মুস্তাফিজের নাম দেখে সবাই আশ্চর্য হয়ে গেছেন, সবার মনে প্রশ্ন ‘কে এই মুস্তাফিজ?’ অনুসন্ধান করে যতটা না জানা গেল ওই তরুণ ২৪ এপ্রিল মাঠে নেমেই তাঁর পরিচয়টা দিয়ে দিলেন। বয়সে মাত্র ১৯ তখন তিনি! অচেনা এক পেসার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের প্রথম পদার্পণে পাকিস্তান দলকে ভড়কে দিলেন, উইকেট নিলেন দুর্ধর্ষ মারকুটে শহীদ আফ্রিদি ও মোহাম্মদ হাফিজের। প্রথমবার পাকিস্তানের বিরুদ্ধে টি২০ জয় পায় বাংলাদেশ। তবে মুস্তাফিজকে নিয়ে গবেষণাটা তখন হয়নি। মুস্তাফিজের আসল চেহারা দেখেছে ভারত, সেই সঙ্গে বিশ্ববাসী। শুরু হলো সবার গবেষণা। আর লুকনো রতেœর হঠাৎ ঝলমল করে ঝলসে ওঠা দেখে পুরো বাংলাদেশই যেন ইন্দ্রজালে আবিষ্ট হয়ে গেল। কী করলেন মুস্তাফিজ তা জানতে একটু পেছনে তাকাতে হবে।

বাংলাদেশ দলে বাঁহাতি পেসার একেবারেই বিরল। সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলার তারালি ইউনিয়নের তেঁতুলিয়া গ্রামের মুস্তাফিজ বাঁহাতি পেসার। বাবা আবুল কাশেম গাজী ব্যবসায়ী, মা মাহমুদা খাতুন গৃহিণী। ৬ সেপ্টেম্বর ১৯৯৫ সালে তার জন্ম। চার ভাই ও দুই বোনের মধ্যে সবার ছোট তিনি। তার ক্রিকেটে আসার পেছনে অবদান সেজ ভাই মোখলেসুর রহমানের। সাতক্ষীরায় অনুর্ধ-১৪ ক্রিকেট বাছাই পর্বে মুস্তাফিজ নজর কাড়েন। সেখান থেকে শুরু ক্রিকেট জীবনের পথচলা। এরপর সাতক্ষীরা অনুর্ধ ১৬, ১৮ ও ১৯ জেলা দলের হয়ে খেলেছেন। বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি। ডাক পান খুলনা বিভাগীয় দলে। তিন বছর আগে মিরপুর স্টেডিয়ামে ফাস্ট বোলিং ক্যাম্পে ট্রায়াল দেয়ার পর কোচরা আর ছাড়েননি মুস্তাফিজকে। নিয়মিতই অনুর্ধ-১৯ দলে খেলেছেন। সম্ভাবনার দ্যুতি ছড়ান গত বছর অনুর্ধ-১৯ বিশ্বকাপে ৯ উইকেট নিয়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি হয়ে। নেটে বল করতেন জাতীয় দলের অনুশীলনে। গত বছর মে মাসে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে বাংলাদেশ ‘এ’ দলেও সুযোগ পান মুস্তাফিজ। প্রথম শ্রেণীতে খেলা শুরু করেন এর এক মাস আগেই। কিছুদিন পরেই অভিষেক হয় ঘরোয়া এক দিনের ম্যাচে। এরপর তো আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেই বিস্ময়কর আবির্ভাব। সাতক্ষীরা থেকে ‘হোম অব ক্রিকেট’ মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় স্টেডিয়াম। এই হচ্ছে মুস্তাফিজের উঠে আসার গল্প।

শুরুটা জুনে ভারত বধ দিয়ে। আর সেখানে ত্রিশুলের ফলা, গতির ঝড় হয়ে আসলেন আবির্ভাব মুস্তাফিজ বিস্ময়ের। ১৮ জুন অভিষেক ওয়ানডেতে ৫০ রানে ৫ এবং দ্বিতীয় ম্যাচে ৪৩ রানে ৬ উইকেট নিয়ে বিশ্ব ক্রিকেটকেই চমকে দিলেন। অবিশ্বাস্য একটি ডেলিভারি তার মূল অস্ত্র। ভয়ানক ‘কাটার’ নাম সেটির। তা দিয়েই অভিষেক হওয়ার পর প্রথম দুই ম্যাচে নিয়ে নিলেন ১১ উইকেট। গড়লেন বিশ্ব ক্রিকেটের অনন্য ও বিরল এক রেকর্ড। ওয়ানডে ইতিহাসে বিশ্বের কোন বোলার ক্যারিয়ারের প্রথম দুই ম্যাচে ১১ উইকেট নিতে পারেননি। পরের ম্যাচে আরও দুই উইকেট নিয়ে ৩ ম্যাচের সিরিজে ১৩ উইকেট নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার পেসার রায়ান হ্যারিসের বিশ্বরেকর্ডে ভাগ বসালেন। ভারতের বিরুদ্ধে প্রথম ওয়ানডের পরই তার নাম হয়ে গেল ‘কাটার’ মাস্টার মুস্তাফিজ। অনুশীলনে নেটে বোলিং করতে এলে দেশের নামী ব্যাটসম্যানরাও অনুরোধ করে বলতেন, ‘ভাই, আমাকে অন্তত কাটার দিস না!’ ভারতের মতো অনেক গবেষণা করেও দক্ষিণ আফ্রিকা তার সেই ভয়ানক ‘কাটারের’ হানা থেকে অক্ষত থাকতে পারেনি।

ওয়ানডে ক্রিকেটে ২০১৫ সাল বাংলাদেশ ক্রিকেটের সোনালি বছর। কোন সিরিজেই হারেনি টাইগাররা। এমনকি পাকিস্তান, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো যুগ যুগ ধরে বিশ্ব ক্রিকেটে দর্পের সঙ্গে বিচরণ করা দলকে পর্যুদস্ত করেছে। যদিও ক্রিকেটের মোড়লরা ভ্রƒ কুঁচকে টাইগারদের সাফল্যকে ক্ষণিকের অর্জন বলেই কটাক্ষ হানছে।