১৬ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

স্মরণ ॥ বোনেরা তোমরা জেগে উঠ...

  • কেয়া চৌধুরী

বাঙালী মুসলিম নারীকে মানুষ হিসেবে নিজেকে চেনার, জানার আহ্বান জানিয়ে যে বিপ্লবী কলমযোদ্ধা প্রথমবারের মতো ডাক দিয়ে বলেছিলেন, ‘বোনেরা তোমরা জেগে উঠ’...। নারী সমাজকে তার মেধাপ্রজ্ঞা ও অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য দিয়ে বেড়ে উঠার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন তিনিই তো... আমাদের আলোরবর্তিকা, পথপ্রদর্শক বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত। বিদুষী রোকেয়া আঠারো-বিশ শতকের রক্ষণশীল সমাজে নারীকে যখন গৃহকোণের বস্তু হিসেবে ভাবা হতো। পর্দা প্রথা নামে নারীকে সমস্ত অধিকার থেকে, পৃথিবীর সকল সৌন্দর্য থেকে বঞ্চিত করা হতো। জড় জীবের মতো গৃহস্থালি কাজে নিয়োজিত রাখা হতো। ঠিক সেই সময় বেগম রোকেয়া দু’নয়ন মেলে পৃথিবীর সকল সৌন্দর্যকে দেখার আহ্বান জানিয়ে গৃহকোণের বাইরেও যে নারীর কর্মক্ষেত্রের একটা বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে সে চিন্তার দুয়ার তিনি খুলে দিয়েছেন।

দৃঢ়চেতা রোকেয়া বাঙালী নারী সমাজের শিক্ষা বিস্তার, মুসলিম নারীর ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি নারীর প্রতি সকল বৈষম্য প্রতিহত করার শক্ত একটি স্তর প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন। তার মননশীল ব্যক্তিত্ব মুক্তচিন্তা প্রকাশভঙ্গি তার সময়ে সকলের মাঝে সহজে রোকেয়াকে আলাদা করা যেত।

জমিদার জহির উদ্দিন আবু আলীর দ্বিতীয় কন্যা (বর্তমান রংপুরের মিঠাপুকুর থানার পায়রাবন্ধ গ্রামের) বেগম রোকেয়া অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে শিক্ষাগ্রহণ করেছিলেন বড় ভাই ইব্রাহীম সাবের ও বড় বোন করিমুননেছার কাছ থেকে। কতটা মানসিক শক্তি থাকলে সম্পূর্ণ বিপরীত পরিবেশে স্বশিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া যায়, রোকেয়াই তার অন্যতম উদাহারণ। বেগম রোকেয়ার সময়ে তিনি ছিলেন অগ্রগামী চিন্তা ও কর্মোদ্দীপক বিদুষী নারী। তার সমস্ত জীবন দিয়ে সত্য ও সুন্দরকে তিনি আহ্বান জানিয়েছেন। যে কারণে রোকেয়ার সকল সাহিত্য ও কর্মপ্রয়াস নারীজাগরণ এবং সমাজ পরিবর্তনের উদ্দীপক হিসেবে কাজ করেছে এবং করছে। অথচ রোকেয়ার সমসাময়িক সময়ে তার কর্মপন্থাকে বিশেষ করে পর্দা প্রথার বিপরীতে আধুনিক সাহিত্যচর্চার প্রতিটি ক্ষেত্রকে অনগ্রসর সমাজ ভাল চোখে দেখেনি। হাত বাড়ায়নি সহায়তার। বরং সমালোচনায় মুখর হয়েছে। অসহযোগিতার বেড়াজালে আবৃত করতে চেয়েছে বিপ্লবী নারী রোকেয়াকে। কিন্তু রোকেয়া থেমে যাননি, বরং মানসিক শক্তি নিয়েই বেগম রোকেয়া ‘স্ত্রীশিক্ষা বাধ্যতামূলক আইন’ পাস, নারীর সমঅধিকার, নারীর ভোটাধিকার, বাল্যবিবাহ রোধ ইত্যাদি বিষয়ে জোরালো যুক্তিবাদী মনোভাব পোষণ করে লিখেছেন এবং বক্তব্য প্রদান করেছেন। যা আজ কেবল ইতিহাস। যে ইতিহাস শক্তির উৎস হয়ে আজকের নারীকে নারীর ক্ষমতায়নের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

রোকেয়া সাখাওয়াত শিক্ষাকে নারীর ক্ষমতায়নের হাতিয়ার হিসেবে গুরুত্বারোপ করেছেন। তবে শিক্ষার মূল্যায়নে রোকেয়া মুখস্থ বিদ্যার বিষয়ে সতর্ক করে দিয়ে বলেনÑ ‘প্রকৃত শিক্ষা না পেলে মানুষ যেমন নিজেকে চিনতে পারে না, তেমনি নিজ সংস্কৃতি, নিজ দেশ, নিজ দেশের মানুষকে চিনতে পারে না। বুঝতে পারে না নিজ কর্তব্যকর্ম।’ দূরদর্শী রোকেয়া কেবল নারী শিক্ষা, নারী অধিকার নিয়ে কথা বলেননি, তিনি আদর্শিক সমাজ গঠনে, দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে নারীকে তার মেধা, প্রজ্ঞা বিনিয়োগ করার মতো মানসিকতা তৈরির তাগিদ দিয়েছেন। স্বদেশী চিন্তার ক্ষেত্র থেকে বিপ্লবী রোকেয়া জাতিগত উন্নয়নে নারীর অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে সকল কুসংস্কার, অবরুদ্ধ জীবন থেকে বের হয়ে ‘চিন্তার মুক্তির’ আহ্বান জানিয়েছেন।

আজকের নারীরা অর্থনৈতিক মুক্তির মধ্য দিয়ে বহুদূর এগিয়ে গেলেও নারীর প্রতি সহিংসতা থেমে যায়নি। যদি বাংলাদেশের দিকে তাকাই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারীর ক্ষমতায়ন, রাজনীতিতে নারীর অগ্রগতির সূচক বাংলাদেশ, ভারতসহ সকল প্রতিবেশী রাষ্ট্রকে পিছিয়ে ফেলে অনেক সামনে এগিয়ে এসেছে। শেখ হাসিনা সরকারের নারীবান্ধব বহুবিদ কর্মকাণ্ডে বাংলাদেশের নারীরা আজ অর্থনৈতিক বৈষম্য থেকে বের হয়ে আসার পথ খুঁজে পেয়েছে। সম্প্রতি জেনেভাভিত্তিক বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে লিঙ্গবৈষম্য-২০১৫ শীর্ষক প্রতিবেদনে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাংলাদেশের নারীদের অংশগ্রহণ বিশ্বে অষ্টম। এই প্রতিবেদনে ১২৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৬৪তম, যা আগের বছর ছিল ৬৮তম। এই ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য দূরীকরণে যুগান্তকারী কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। তার মধ্যে অন্যতম জাতীয় নারী উন্নয়ননীতি-২০১১। এছাড়াও নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ জাতীয় কর্মপরিকল্পনা ২০১৩-২০১৫ প্রণয়ন ইত্যাদি।

অসুন্দরের সবকিছুকে ছাপিয়ে সকল বৈষম্য, সকল প্রকার নির্যাতন, হীনম্মন্যতাকে অতিল্ডম করে নারী সমাজ স্বীয় মর্যাদায় তখনই অধিষ্ঠিত হবে, যখন তার নিজের মধ্যে বেগম রোকেয়ার আদর্শকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে, যখন তার নিজের প্রতি আস্থাশীল হবে, কাজের প্রতি হবে বিশ্বাসী। সর্বোপরি চিন্তার ক্ষেত্রে হবে সে সম্পূর্ণ স্বাধীন। ভয়ভীতি, প্রভাবহীন মানসিকতায় সে দৃঢ় পদক্ষেপে গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যাবে।

লেখক : সমাজকর্মী ও সংসদ সদস্য