১০ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিধ্বস্ত জাফলং

দেশের নয়নাভিরাম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র জাফলং পাথরখেকো ও ভূমিদস্যু চক্রের কারণে এখন ধূ-ধূ বালুচর। বিরাজ করছে শত শত গর্ত। এসব গর্ত থেকে অবৈধভাবে প্রতিদিনই সংগ্রহ করা হচ্ছে লাখ লাখ ফুট পাথর। নানা ধরনের যন্ত্র ব্যবহার করা হয় এই পাথর সংগ্রহে। এখন সৌন্দর্যপ্রিয় পর্যটক নয়, জাফলং শ্রমিকদের পদভারে মুখরিত। স্বচ্ছতোয়া নদী এখন কেবলই শ্মশানসম খননক্ষেত্র। জাফলংয়ের ওপর দিয়ে বয়ে চলা পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ জলকে এক সময় তুলনা করা হতো আয়নার সঙ্গে। জাফলং বেড়াতে গিয়ে পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ জলরাশির নিচে মাছের খেলা দেখে অভিভূত হতো পর্যটকরা। ভারতের মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশ ঘেঁষে বয়ে যাওয়া এ নদী এখন ঠাঁই নিতে চলেছে ইতিহাসের পাতায়। কোন কালে এখানে খরস্রোতা একটি নদী ছিল, এমনটা বিশ্বাসই করতে চান না পর্যটকরা।

জাফলংকে রক্ষা করার জন্য সরকার বেশ কয়েকবার পদক্ষেপ নেয়। সরকারী হস্তক্ষেপে অবৈধ পাথর উত্তোলন ও পরিবেশ দূষণ কিছুদিন বন্ধ থাকলেও পরে আবার শুরু হয়ে যায় তা-ব। বর্তমানে মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলনে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা থাকলেও প্রকৃতি ও পরিবেশের ওপর নির্মম কর্মকা- চালিয়ে যাচ্ছে শক্তিশালী একটি মহল। জাফলংয়ে পৌঁছানোর কয়েক কিলোমিটার আগ থেকেই ক্রাশার মেশিনের বিকট শব্দে বধির হয়ে পড়ে শ্রুতি। ধুলোয় দূষিত হয়ে উঠছে পরিবেশ। পিয়াইন নদীতে শ্রমিকরা হাত দিয়ে পাথর উত্তোলনের পরিবর্তে বিভিন্ন সিন্ডিকেট অত্যাধুনিক মেশিন বসিয়ে ৫০ থেকে ৭০ ফুট মাটি গর্ত করে পাথর উত্তোলন করছে। স্থানীয় প্রভাবশালী ও প্রশাসনের কতিপয় কর্মকর্তার ছত্রছায়ায় থেকে এবং কারও কারও নাম ভাঙ্গিয়ে চলছে পাথর উত্তোলনের নামে ধ্বংসলীলা। প্রতিদিন জাফলং থেকে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও জনপ্রতিনিধির নাম ভাঙ্গিয়ে লাখ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। চাঁদা পাচ্ছে প্রশাসনসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তি।

পিয়াইন নদীর মরণদশায় জাফলংয়ের পর্যটক সংখ্যাই শুধু কমে যায়নি, এ এলাকার কৃষিক্ষেত্রে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। পানির উৎস বিলীন হয়ে যাওয়ায় সেচের অভাবে ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন। পিয়াইন নদীর মতো দেশের বহু নদী লোভী ব্যবসায়ীদের কবলে পড়ে বিধ্বস্ত, মুমূর্ষু। আমরা মনে করি দেশের মৃতপ্রায় নদ-নদীকে বাঁচানোর জন্য আশু পদক্ষেপ নিতে হবে। সুনির্দিষ্ট একটি নদী নয়, দেশের মরণাপন্ন সব নদীর অস্তিত্বের স্বার্থে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। কালবিলম্ব না করে নদী খনন করা দরকার। নদীকে কষ্ট দিয়ে যারা প্রকারান্তরে বৃহত্তর জনগোষ্ঠী ও প্রকৃতির ক্ষতি করছেন, সেই মুনাফালোভী শুভবোধহীন ব্যবসায়ীদের অবশ্যই আইনের আওতায় নিয়ে আসা চাই। মনে রাখতে হবে, নদী বাঁচলেই বাংলাদেশ বাঁচবে। অর্থাৎ বাঁচবে দেশের মানুষ। জাফলং থেকে অপরিকল্পিত ও অবৈধ উপায়ে পাথর উত্তোলন বন্ধে বিশেষ কার্যক্রম পরিচালনা করা জরুরী হয়ে পড়েছে। পাথর উত্তোলনের ক্ষেত্রে সামান্যতম অনিয়ম কাম্য নয়। পরিবেশ সুরক্ষার জন্য যা যা জরুরী, সব পদক্ষেপই নিতে হবে অনতিবিলম্বে। জাফলং সুপরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলতে হবে যাতে করে আগের মতো দেশী পর্যটকের ঢল নামে সেখানেÑ একই সঙ্গে বিদেশী পর্যটকরাও যেন আকৃষ্ট হয়। প্রকৃতির বিরুদ্ধচারী যেসব অর্থলোভী অসাধু ব্যবসায়ী জাফলংয়ের ভগ্নদশার জন্য দায়ী তাদের বিরুদ্ধে এখনই আইনানুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।