২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ছয় প্রকল্পে সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা দিচ্ছে জাপান

  • ১৩ ডিসেম্বর চুক্তি

হামিদ-উজ-জামান মামুন ॥ বড় ছয় প্রকল্প বাস্তবায়নে সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা ঋণ দিচ্ছে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)। ফলে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে যে অনিশ্চয়তা ছিল তা কেটে যাচ্ছে। জাপান সরকারের ৩৬তম ওডিএ লোন প্যাকেজের আওতায় সংস্থাটি ১০৭ কোটি ডলার ঋণ দিতে রাজি হয়েছে। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী যার পরিমাণ প্রায় সাড়ে আট হাজার কোটি টাকা। আগামী ১৩ ডিসেম্বর এ বিষয়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি-২ সম্মেলন কক্ষে এ চুক্তিতে স্বাক্ষর করবেন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সিনিয়র সচিব মোহাম্মদ মেজবাহ উদ্দিন এবং জাইকার চীফ রিপ্রেজেনটেটিভ মিকিও হেতেদা। অন্যদিকে, একই অনুষ্ঠানে এ বিষয়ে একটি বিনিময় নোটও স্বাক্ষরিত হবে। এতে মোহাম্মদ মেজবাহ উদ্দিন ও জাপানের রাষ্ট্রদূত মাসাটো ওটানাবে স্বাক্ষর করবেন।

ইআরডি সূত্র জানায়, পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) লিমিটেডের ঢাকা-চট্টগ্রাম মেইন সঞ্চালন লাইন শক্তিশালীকরণে ২ হাজার ৭৪৯ কোটি টাকা, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং অর্থ বিভাগের বিদেশী বিনিয়োগ উন্নয়ন প্রকল্পে এক হাজার কোটি টাকা, সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের পশ্চিমাঞ্চলের সেতু উন্নয়নে ১ হাজার ৮৪৩ কোটি টাকা, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মানবজাতক স্বাস্থ্য এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রকল্পে ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা, গৃহায়ন ও গণপূর্ত অধিদফতরের নগরে ভবনের ঝুঁকি কমানো প্রকল্পে ৭৬০ কোটি টাকা এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের উপজেলা গভার্নেন্স উন্নয়ন প্রকল্পে এক হাজার কোটি টাকা ঋণ দিচ্ছে জাইকা।

এ ঋণের বার্ষিক সুদের হার মাত্র দশমিক শূন্য ১ শতাংশ। যা ১০ বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ৪০ বছরের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। সংস্থাটির সুদের হার বাংলাদেশের অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগী বিশ^ব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), রাশিয়া, চীনের তুলনায় অনেক কম। আবার ঋণের অর্থের একটি বড় অংশ অনুদান হিসেবে প্রদান করে জাইকা। যা পরবর্তীতে জাপান ডেভেলপমেন্ট ফান্ডের (জেডিএফ) মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় করা হয়।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) জাপান উইংয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, নতুন প্যাকেজের আওতায় বড় অঙ্কের অর্থ পেলেও গত অর্থবছরের তুলনায় প্রায় এক হাজার কোটি টাকা কম ঋণ দিচ্ছে জাইকা। ইআরডি গঙ্গা ব্যারেজসহ কয়েকটি বড় প্রকল্পে আরও অর্থায়নের প্রস্তাব দিলেও সংস্থাটি রাজী হয়নি। দেশটির অর্থনৈতিক মন্দা এবং অগ্রাধিকার প্রকল্প প্রস্তাব না থাকায় অর্থায়ন কমতে পারে। তবে জাইকার পক্ষ থেকে বিষয়টি সুস্পষ্ট করা হয়নি। তিনি বলেন, জাইকার আর্থিক এবং কারিগরি সহযোগিতায় আরও কয়েকটি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। আরও কয়েকটি মেগা প্রকল্পে অর্থায়নের বিষয়ে আলোচনা চলছে।

জাইকা গত বছর ৩৫তম ঋণ প্যাকেজের আওতায় পাঁচ প্রকল্পে ৯ হাজার ২০০ কোটি টাকা দেয় জাইকা। সংস্থাটির অর্থায়নে প্রায় অর্ধশত প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে-মেট্রোরেল, মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত কেন্দ্র, প্রাকৃতিক গ্যাসের দক্ষতা উন্নয়ন, ইনক্লুসিভ সিটি গভার্নেন্স, হাওরের বন্যা ব্যবস্থাপনা এবং জীবিকার উন্নয়ন, ক্ষুদ্র এবং প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকদের কৃষি উৎপাদনের উন্নয়ন এবং বৈচিত্র্যায়নে অর্থায়ন প্রকল্প।

সূত্র জানায়, বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে জাপান। স্বাধীনতার পর থেকে দেশটি নিরবচ্ছিন্নভাবে এদেশের অগ্রগতিতে সহযোগিতা দিয়ে আসছে। ১৯৭২ থেকে এখন পর্যন্ত ঋণ ও বিভিন্ন প্রকার অনুদান মিলে জাপান প্রদান করেছে। এককভাবে জাপান বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় উন্নয়ন সহযোগী দেশ। তবে বৈদেশিক সহায়তার ক্ষেত্রে সকল উন্নয়ন সহযোগী দেশে ও সংস্থাসমূহের মধ্যে দেশটির অবস্থান তৃতীয়। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এসব বিষয় উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাপান বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতের উন্নয়ন প্রকল্পে ঋণ, অনুদান, কারিগরি সহায়তা, ঋণ মওকুফ অনুদান সহায়তা, ঋণ মওকুফ অনুদান সহায়তা প্রতিরূপ তহবিল, ঋণ মওকুফ তহবিল এবং বৃত্তি ও প্রশিক্ষণ সহায়তা প্রদান করে। মূলত জাপান যেসব খাতে সহায়তা করে সেগুলো হচ্ছে, মানব সম্পদ উন্নয়ন, শিক্ষা ও দারিদ্র্য দূরীকরণ, পরিবহন ও অবকাঠামো উন্নয়ন, পানি নিষ্কাশন, কৃষি ও সেচ, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ, যোগাযোগ, বিদ্যুত ও জ্বালানি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং শিল্প।

জাপানের অনুদানের বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিবছর জাপান সরকার বাংলাদেশকে অনুদান ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করে থাকে। দারিদ্র্য বিমোচন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জনে বাংলাদেশ সরকারের অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জাপান সরকার অবকাঠামো উন্নয়ন, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ, পরিবেশ উন্নয়ন, বিদ্যুত ও জ্বালানি এবং মানব সম্পদ উন্নয়ন খাতের প্রকল্পে অনুদান সহায়তা দিয়ে আসছে। কারিগরি সহায়তা অংশে বলা হয়েছে, কারিগরি সহায়তা ও মানব সম্পদ উন্নয়ন, বিশেষজ্ঞ নিয়োগ, জাপান ওভারসিজ কো-অপারেশন ভলান্টিয়ারস (জেওসিভি) প্রেরণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে জাপান সরকার বাংলাদেশকে দীর্ঘ দিন থেকে সহায়তা প্রদান করে আসছে।

ঋণ মওকুফ অনুদান সহায়তার বিষয়ে বলা হয়েছে, ১৯৭৮ সালের ১২ মার্চ অনুষ্ঠিত আঙ্কটার্ডের ট্রেড এ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের অধিবেশনে উন্নয়নশীল দেশসমূহের ঋণ মওকুফ করার জন্য সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সে মোতাবেক বাংলাদেশের স্বাধীনতা উত্তরকাল থেকে ১৯৮৮ সালের মার্চ পর্যন্ত জাপান সরকারের নিকট থেকে বাংলাদেশ যে ঋণ গ্রহণ করেছে এবং মূলধন ও সুদ বাবদ যে অর্থ পরিশোধ করেছে, জাপান সরকার উক্ত সমুদয় অর্থ ডিআরজিএ হিসেবে বাংলাদেশকে ফেরত দিচ্ছে।