১১ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

দারিদ্র্য লালনের ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্প আর নয় ॥ প্রধানমন্ত্রী

  • একনেকে সিঙ্গেল মুরিং টার্মিনালসহ ১০ প্রকল্প অনুমোদন

অর্থনৈতিক রিপোর্টার ॥ চট্টগ্রামে দেশের প্রথম সিঙ্গেল মুরিং টার্মিনাল তৈরিসহ দশটি প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। এগুলো বাস্তবায়নে মোট ব্যয় হবে ৭ হাজার ২৭৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। এরমধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ১ হাজার ৯১৮ কোটি ৬৫ লাখ। বৈদেশিক সহায়তা থেকে ৪ হাজার ৭৫৫ কোটি ১১ লাখ এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থার নিজস্ব তহবিল থেকে ৬০২ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয় করা হবে। মঙ্গলবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এ অনুমোদন দেয়া হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপার্সন শেখ হাসিনা। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তাফা কামাল।

একনেক বৈঠকে শেখ হাসিনা বলেছেন, এখন থেকে ক্ষুদ্র ঋণবিষয়ক কোন প্রকল্প হাতে নেয়া যাবে না। কেননা মানুষ ঋণ নেয় কিন্তু শোধ করতে পারে না। ফলে আবারও ঋণ নেয়, এভাবে তারা ঋণের জালে আটকে যায়। আর বের হতে পারে না। আমি দেশের মানুষকে এই ঋণের জালে আটকাতে চাই না। তাই এখন থেকে মাইক্রোক্রেডিড নয়, হবে মাইক্রো ফাইন্যান্স এবং মাইক্রো সেভিংস। তিনি বলেন, ক্ষুদ্রঋণ দারিদ্র্য লালন-পালন করে। আমি দারিদ্র্য লালন করতে চাই না। প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, এখন থেকে যেসব সড়ক প্রশস্ত করা হবে সেগুলোতে যাতে রোড ডিভাইডার এবং অযান্ত্রিক যান চলাচলের জন্য আলাদা লেন থাকে সেটি নিশ্চিত করতে হবে। পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তাফা কামাল প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের এসব বিষয় জনকণ্ঠকে নিশ্চিত করেছেন।

একনেক বৈঠক শেষে ব্রিফিংয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তাফা কামাল বলেন, নির্বাচন একটি চলমান প্রকল্প (প্রক্রিয়া)। সারাবছর ধরে পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলাসহ বিভিন্ন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তাই বলে কি উন্নয়ন বন্ধ থাকবে? নির্বাচন সম্পন্ন করা যেমন রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব, জনগণকে সমৃদ্ধ করাও তেমনি মৌলিক দায়িত্ব। তাই উন্নয়ন ও নির্বাচন একসঙ্গেই চলবে। তবে যেসব প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয়েছে তার কোনটিই আঞ্চলিক প্রকল্প নয়। এগুলো জাতীয় প্রকল্প। যেসব এলাকায় প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হবে, সেসব অঞ্চলে নির্বাচনও হচ্ছে না। এসব বিষয় বিবেচনা করে একনেক প্রকল্পগুলো অনুমোদন দিয়েছে।

অনুমোদিত প্রকল্পগুলো হলো- ইনস্টলেশন অব সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং উইথ ডাবল পাইপলাইন প্রকল্প, এটি বাস্তবায়নে মোট ব্যয় হবে চার হাজার ৯৩৫ কোটি ৯৭ লাখ টাকা; পশ্চিমাঞ্চলীয় গ্রিড নেটওয়ার্ক উন্নয়ন প্রকল্প, এর ব্যয় এক হাজার ৪২৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা, চট্টগ্রাম, মংলা, আইসিডি কমলাপুর এবং বেনাপোল কাস্টমস হাউসের জন্য কন্টেনার স্ক্যানার ক্রয় প্রকল্প, এর ব্যয় ১১৭ কোটি ৪৬ লাখ টাকা, বাকেরগঞ্জ-পাদ্রীশিবপুর-কাঁঠালতলী-সুবিদখালী-বরগুনা সড়ক প্রশস্তকরণ ও মজবুতকরণ প্রকল্প, এতে ব্যয় হবে ১৪৪ কোটি ১৯ লাখ টাকা, বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন সড়ক প্রশস্তকরণসহ উন্নয়ন ও ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণ প্রকল্প, এর ব্যয় ৮৩ কোটি ৮১ লাখ টাকা, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প, এর ব্যয় ২৮১ কোটি ৮৯ লাখ টাকা, স্কিলস ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট, এর ব্যয় ১৬২ কোটি ৬৯ লাখ টাকা, সমন্বিত কৃষি কর্মকা-ের মাধ্যমে কুমিল্লা জেলার লালমাই-ময়নামতি পাহাড়ী এলাকার জনগণের জীবন-জীবিকার মানোন্নয়ন প্রকল্প, এতে ব্যয় হবে ৫৩ কোটি টাকা; সমবায়ের মাধ্যমে ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার উন্নয়ন প্রকল্প, এতে ব্যয় হবে ৩৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত এলাকায় মিশ্র ফল চাষ প্রকল্প, এতে ব্যয় হবে ৩৬ কোটি ৮১ লাখ টাকা।

প্রকল্পের বিস্তারিত হচ্ছেÑ চট্টগ্রামে তৈরি হচ্ছে সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং টর্মিনাল ও ডাবল পাইপলাইন। ফলে জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি আমদানিকৃত ক্রুড অয়েল এবং ফিনিশ প্রোডাক্ট (এইচএসডি) সহজে, নিরাপদে, স্বল্প খরচে ও স্বল্প সময়ে খালাস নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি এটি বাস্তবায়িত হলে লাইটারেজ অপারেশনের মাধ্যমে ক্রুড ওয়েল ও ফিনিসড প্রোডাক্ট আমদানিতে যে সিস্টেম লস হয় তা কমানো যাবে এবং দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা হবে। এ উদ্যোগটি বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ৯৩৫ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। এরমধ্যে সরকারী তহবিল থেকে ৯২০ কোটি ৮৭ লাখ, বাস্তবায়নকারী সংস্থার নিজস্ব তহবিল থেকে ১১১ কোটি ৯০ লাখ এবং চায়না এক্সিম ব্যাংকের ঋণ থেকে ৩ হাজার ৯০৩ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয় করা হবে। বিদ্যুত, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম বন্দরের অবকাঠামোতে বড় ক্রুড ভেসেল হ্যান্ডেল করা সম্ভব নয়। কেননা কর্ণফুলী নদীর চ্যানেলের নাব্য কম (মাত্র ৮ থকে ১৪ মিটার)। এসব সীমাবদ্ধতার কারণে বড় ক্রুড ভেসেলগুলো গভীর সমুদ্রে নোঙর করা হয়। এরপর ছোট লাইটারেজ ভেসেলের মাধ্যমে ক্রুড আনলোডিং করা হয়। এভাবে ১১ দিনে একটি এক লাখ ডিডব্লিউ ট্যাঙ্কার খালাস করা হয়। সুতরাং লাইটারেজ অপারেশনের মাধ্যমে বেশি পরিমাণ ক্রুড ইনলোড করা সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। এসব সমস্যা হতে উত্তরণের জন্য একটি সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) স্থাপন করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

২০১০ সালে ইনস্টেলেশন অব সিঙ্গেল মুরিং (এসপিএম) শীর্ষক একটি প্রকল্প জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) অনুমোদন দেয়। সে সময় ব্যয় ধরা হয়েছিল ৯৫৪ কোটি ২৮ লাখ টাকা। এরমধ্যে সরকারী তহবিলের ৪৭ কোটি ৮২ লাখ, ইসলামিক উন্নয়ক ব্যাংকের (আইডিবি) ঋণ ৯০৪ কোটি ৪১ লাখ এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থার দুই কোটি পাঁচ লাখ টাকা ধরা হয়েছিল। ২০১২ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। পরবর্তীতে প্রকল্পটির প্রথম সংশোধনী প্রস্তাব চলতি বছরের ৬ মার্চ পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়। এতে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ৪ হাজার ২৪৩ কোটি ১৫ লাখ টাকা। এরমধ্যে সরকারী তহবিলের ৮০২ কোটি ৭৮ লাখ, বৈদেশিক সহায়তা ৩ হাজার ৩০০ কোটি এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থার নিজস্ব তহবিল থেকে ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়। বৈদেশিক সহায়তার অংশে আইডিবি হতে ইতোপূর্বে গৃহীত ঋণের ৩৪ কোটি ২৫ লাখ এবং অবশিষ্ট অর্থ চায়না এক্সিম ব্যাংক হতে ঋণ গ্রহণের প্রস্তাব করা হয়। প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে আইডিবির ঋণসীমা অতিরিক্ত হওয়ায় এবং প্রকল্পের ডিজাইন ব্যাপক পরিবর্তন হওয়ায় আইডিবি সংশোধিত প্রকল্পের অর্থায়নে অপারগতা প্রকাশ করে। এ প্রেক্ষিতে প্রকল্পের ব্যয় ৩৩৪ দশমিক ৬৪ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ায় বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) কর্তৃক ব্যয় যৌক্তিকীকরণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। পরবর্তীতে আইএমইডির সুপারিশ অনুযায়ী পরিকল্পনামন্ত্রীর দিকনির্দেশনা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। গত ২৪ আগস্ট পরিকল্পনামন্ত্রীর সঙ্গে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তাফা কামাল পূর্বের গৃহীত প্রকল্পটি সমাপ্ত ঘোষণা করে নতুন করে প্রকল্প হাতে নেয়ার পরামর্শ দেন। সে অনুযায়ী প্রকল্পের নাম পরিবর্তন করে এবং ৯৪ কিলোমিটার পাইপলাইন যুক্ত করে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরি করে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হলে অনুমোদন দেয়া হয়।

প্রকল্পের আওতায় প্রধান কার্যক্রম হচ্ছে পাইপলাইন এবং সিঙ্গেল মুরিং টার্মিনাল তৈরি। অফসোরে ১৪৬ কিলোমিটার ও অনসোরে ৭৪ কিলোমিটার সর্বমোট ২২০ কিলোমিটার পাইপলাইন স্থাপন (এর মধ্যে ৩৬ ইঞ্চি ব্যাসের ৩২ কিলোমিটার এবং ১৮ ইঞ্চি ব্যাসের ১৮৮ কিলোমিটার)। মহেশখালী দ্বীপে ট্যাঙ্ক ফার্ম ও পাম্পস্টেশন স্থাপন। স্কাডা সিস্টেম স্থাপন। ভূমি অধিগ্রহণ, অধিযাচন ও ক্ষতিপূরণ। বিশেষজ্ঞ সেবা এবং ফায়ার ফাইটিং সিস্টেম ও সংশ্লিষ্ট পূর্তকাজ করা হবে।