২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বাংলাদেশের ৪ কোটি মানুষ জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হবে

  • প্যারিস সম্মেলনে ঢাকার ক্ষতিপূরণ দাবি

কাওসার রহমান, প্যারিস থেকে ॥ জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে বাংলাদেশ। সেই সঙ্গে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রী সেলসিয়াসের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

মঙ্গলবার দুপুরে প্যারিস জলবায়ু সম্মেলনে এক সংবাদ সম্মেলনে এ অবস্থানের কথা তুলে ধরেন বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতা পরিবেশমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার জন্য পর্যাপ্ত অভিযোজন কার্যক্রম গ্রহণ করা না গেলে বাংলাদেশে জলবায়ু উদ্বাস্তু পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করবে। দেশের ৪ কোটিরও বেশি মানুষ জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হবে।’

তবে বাংলাদেশ প্যারিস জলবায়ু শীর্ষ সস্মেলন থেকে জলবায়ুর প্রভাব মোকাবেলায় একটি সর্বজনীন চুক্তির ব্যাপারে উচ্চাশা করলেও, চুক্তির আইনগত বাধ্যবাধকতার বিষয়ে নীরবতা পালন করছে। এর আগে সোমবার সন্ধ্যায় জলবায়ু সম্মেলনে বক্তৃতায়ও বাংলাদেশের পরিবেশমন্ত্রী চুক্তির আইনগত বিষয়ে কোন উচ্চবাচ্য করেননি। যদিও প্যারিস সম্মেলনের শুরু থেকেই উন্নয়নশীল দেশগুলো বিশেষ করে স্বল্পোন্নত ও ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো প্যারিস আইনী বাধ্যবাধকতাযুক্ত চুক্তি দাবি করে আসছে।

সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘জলবায়ু পরিবর্তন ঘটছে। তাই এর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে বাংলাদেশের জরুরী ও অগ্রাধিকার ইস্যু হলো অভিযোজন কার্যক্রম। কিন্তু অভিযোজন কার্যক্রমের জন্য অর্থ বরাদ্দের পরিমাণ এখনও খুবই অপ্রতুল।’

সংবাদ সম্মেলনে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতসহ বিভিন্ন খাতে জলবায়ুর প্রভাব মোকাবেলায় খাপ খাইয়ে নিতে বাংলাদেশকে পর্যাপ্ত পরিমাণ অর্থ সহায়তা প্রদানের দাবি করা হয়। এই সহায়তা হতে হবে সহজে প্রাপ্যযোগ্য।

প্যারিস জলবায়ু সম্মেলনে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ২ ডিগ্রী সেলসিয়াসে সীমাবদ্ধ রাখতে সম্মত হলেও, বাংলাদেশ এই তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রী সেলসিয়াসে রাখার আবারও দাবি তুলেছে। মূলত কোপেনহেগেন জলবায়ু সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রী সেলসিয়াসে রাখার প্রথম দাবি তোলেন। যা কোপেনহেগেন এ্যাকর্ডে স্থান পায়।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলনে বিজ্ঞানীদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, ১.৫ ডিগ্রী সেলসিয়াসের বেশি বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। এতে জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে যাবে। তাই যে সকল দেশের সক্ষমতা কম তাদের অর্থ ও প্রযুক্তি সহায়তা দিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার ব্যাপারে এগিয়ে আসতে হবে। এই দায়িত্ব নিতে হবে বর্তমান পরিস্থিতির জন্য ঐতিহাসিকভাবে দায়ী দেশগুলোকে।

সংবাদ সম্মেলন পরিচালনা করেন পরিবেশ সচিব কামাল উদ্দিন আহমেদ। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সাবেক পরিবেশ মন্ত্রী ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সভাপতি ড. হাছান মাহমুদ, বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের সমন্বয়কারী ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ, ড. আইনুন নিশাত প্রমুখ।

প্যারিস চুক্তিতে বাংলাদেশের ৪ প্রত্যাশা ॥ আইনগত চুক্তির দাবি না তুললেও বাংলাদেশ প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে চার প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেছে। এ চুক্তিতে অর্থায়ন ও প্রযুক্তির বিষয়টি পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করার দাবি তুলে বাংলাদেশ বলেছে, প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে সকল দেশের কার্যকর অংশগ্রহণ থাকতে হবে।

সোমবার স্থানীয় সময় ৫টা ৪৮ মিনিটে বাংলাদেশের পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন প্লানারি হলে বক্তৃতা দিতে উঠেন। এ সময় তিনি বলেন, জলবায়ুর ঝুঁকির কারণে প্রতিবছর দুই থেকে তিন শতাংশ হারে অর্জন হারাচ্ছে। ফলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ২ ডিগ্রী বৃদ্ধিও বাংলাদেশের জন্য নিরাপদ নয়। এই তাপমাতা বৃদ্ধিও বাংলাদেশের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর ওপর প্রচ- নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

পরিবেশমন্ত্রী বলেন, কম কার্বন নিঃসরণ করেও জলবায়ুর প্রচ- ক্ষতির শিকার। জলবায়ুর ঝুঁকির কারণে বাংলাদেশ প্রতিবছর অন্তত দুই থেকে তিন শতাংশ হারে উন্নয়ন অর্জন হারাচ্ছে। জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটতে থাকলে এই ঝুঁকির পরিমাণ ভবিষ্যতে আরও বাড়বে।

তিনি বলেন, বৈশ্বিক আহ্বানে সাড়া দিয়ে আমরাও স্বেচ্ছায় কার্বন কমানোর ঘোষণা দিয়েছে। আমরা এই সম্মেলনে নিশ্চিত হতে চাই যে, প্যারিস চুক্তিতে সব দেশের স্বেচ্ছায় কার্বন কমানোর প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন করবে। সেই সঙ্গে অর্থায়ন ও প্রযুক্তির বিষয়টি পরিষ্কারভাবে চুক্তিতে উল্লেখ দেখতে চাই।

আনোয়ার হোসেন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন একটি বৈশ্বিক সমস্যা। তাই আমরা সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এর বৈশ্বিক সমাধান দেখতে চাই। মন্ত্রীর বক্তৃতায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে চার দফা প্রত্যাশার কথা তুলে ধরে বলা হয়, প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে সকল দেশের কার্যকর অংশগ্রহণ থাকতে হবে এবং তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে তা বাস্তবায়নে।

মন্ত্রী উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ১৫৮টি দেশ স্বেচ্ছায় কার্বন কমানোর যে ঘোষণা দিয়েছে তা বাস্তবায়িত হলেও বৈশ্বিক উষ্ণতা ২.৭ ডিগ্রী থেকে ৩.৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস বৃদ্ধি পাবে। বাংলাদেশের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর ওপর প্রচ- নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বৈশ্বিক তাপমাত্রা ২ ডিগ্রী বৃদ্ধিও বাংলাদেশের জন্য নিরাপদ নয়। তাই প্যারিস চুক্তিতে অভিযোজন ও প্রশমন চাহিদার পরিষ্কার উল্লেখ থাকতে হবে।

তিনি অভিযোজন কার্যক্রমকে বৈশ্বিক দায় উল্লেখ করে বলেন, অভিযোজন কার্যক্রমের জন্য অর্থায়ন এবং প্রযুক্তি জরুরী। বাংলাদেশের জন্য এটি আরও জরুরী। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয় ও ক্ষতির বিষয়টি প্যারিস চুক্তির একটি অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সেই সঙ্গে জলবায়ু বাস্তুচ্যুতদের সংঘটিত করে পরিকল্পিতভাবে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।

মন্ত্রী অভিযোজন ও প্রশমন কার্যক্রমকে প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে সমানভাবে গুরুত্ব প্রদানের আহ্বান জানিয়ে বলেন, অভিযোজন ও প্রশমন কার্যক্রম স্বল্পোন্নত ও ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর ক্ষেত্রে বিশেষভাবে বিবেচনায় নিতে হবে। এ লক্ষ্যে এলডিসি ফান্ডসহ গ্রীন ক্লাইমেট ফান্ডে আরও অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। চলুন আমরা প্যারিসকে ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য ঐতিহাসিকভাবে স্মরণীয় করে রাখার ব্যাপারে উদ্যোগী হই।