২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

এক রূপকথার গল্প ॥ আইসিসির ‘বর্ষসেরা ওয়ানডে’ ক্রিকেট দলে মুস্তাফিজ

  • সৈয়দ মাজহারুল পারভেজ

আইসিসির বর্ষসেরা ওয়ানডে একাদশে জায়গা করে নিলেন বাংলাদেশের তরুণ বাঁহাতি পেসার মুস্তাফিজুর রহমান। খবরটি মুস্তাফিজের জন্য যতটা গর্বের বা আনন্দের, বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্যও ঠিক ততটাই গৌরবের। কেননা বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় বিষয়। একদিনের ক্রিকেটের ৪৪ বছরের ইতিহাসে বাংলাদেশের কোন ক্রিকেটার এই প্রথম আইসিসির বর্ষসেরা ওয়ানডে একাদশে জায়গা করে নিলেন। যদিও এর আগে ২০০৯ সালে আইসিসির শীর্ষ ওয়ানডে অলরাউন্ডার বাংলাদেশের সাকিব আল হাসান আইসিসির বর্ষসেরা টেস্ট একাদশে জায়গা পেয়েছিলেন। সেটাই ছিল এ যাবতকালের বাংলাদেশের আইসিসির বর্ষসেরা ওয়ানডে একাদশে একমাত্র ঠাঁই পাওয়ার ঘটনা। সেও সেই একবারই। আর আইসিসির বর্ষসেরা ওয়ানডে একাদশে? মুস্তাফিজই প্রথম এবং একমাত্র ক্রিকেটার। যদিও নির্বাচনটা হয়েছে ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পারফর্মেন্স বিবেচনায়। কিন্তু মজার বিষয় হচ্ছে, মুস্তাফিজের ওয়ানডে অভিষেকই হয়েছে এ বছর জুনে। তার মানে অন্যরা যেখানে এক বছর পারফর্ম করে যা পেল মুস্তাফিজ সেটা পাচ্ছে মাত্র ৪ মাসের পারফর্মেন্সে।

‘মুস্তাফিজ উপাখ্যান’ রূপকথার গল্পকেও বুঝি হার মানিয়েছে। এ যেন এডলফ হিটলারের সেই অমর বাণীর মতো, ‘এলেন, খেললেন; জয় করলেন।’ যেন সব জয় করার জন্যই তার আগমন। সব রেকর্ডকে ভেঙ্গে চুরে চুরমার করার জন্যই তার আসা। কবি নজরুলের ভাষায় যাকে বলা যায়:

আমি চিরদুর্দম, দুর্বিনীত, নৃশংস,

মহা-প্রলয়ের আমি নটরাজ, আমি সাইক্লোন, আমি ধ্বংস,

আমি মহাভয়, আমি অভিশাপ পৃথ্বীর,

আমি দুর্বার,

আমি ভেঙে করি সব চুরমার!

আমি অনিয়ম উচ্ছৃঙ্খল,

আমি দ’লে যাই যত বন্ধন, যত নিয়ম কানুন শৃঙ্খল!

আমি মানি নাকো কোন আইন,

আমি ভরা-তরী করি ভরা-ডুবি, আমি টর্পেডো, আমি ভীম

ভাসমান মাইন!

আমি ধূর্জটি, আমি এলোকেশে ঝড় অকাল-বৈশাখীর!

আমি বিদ্রোহী, আমি বিদ্রোহী-সুত বিশ্ব-বিধাত্রীর!

আমি ঝঞ্ঝা, আমি ঘূর্ণি,

আমি পথ-সম্মুখে যাহা পাই যাই চূর্ণি।

হ্যাঁ, ক্রিকেটের সব নিয়ম-কানুন ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দেয়ার জন্যেই বুঝি তার আসা। অনেকে ভাববেন, কী এমন কীর্তি গড়েছেন ঊনিশ পেরোনো ছেলে, যার জন্য এত স্তুতি? কী করেছেন না বলে বলা যায়, কী করেননি! ক্রিকেটের অনেক রেকর্ডকে ভেঙ্গে দিয়েছেন। বাংলাদেশের তো বটেই এমন কী বিশ্ব ক্রিকেটেও এমন স্মরণীয় অভিষেক খুব কম ক্রিকেটারের হয়েছে। ওর শুরুটা স্বপ্নকেও হার মানিয়েছে। বাংলায় একটা কথা আছে, ‘রাজকীয় অভিষেক’। সেটাই হয়েছে তার। সে কারণে এই বয়সেই সে এখন রীতিমতো সুপারস্টার। অথচ মাস চারেক আগেও সে ছিল অনেকের কাছেই ছিল অচেনা। মাত্র ক’দিনেই কেবল গোটা বাংলাদেশ নয়, বলা যায় গোটা ক্রিকেটবিশ্ব মাতিয়ে ফেলেছেন। নইলে এ বছর এপ্রিলে পাকিস্তানের বিপক্ষের টি২০ ম্যাচে আন্তর্জাতিক অভিষেকের পর মধ্য জুনে ভারতের বিপক্ষে একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের অভিষেক হওয়ার পর ছয় মাসও পেরোয়নি তার মধ্যেই আইসিসির বর্ষসেরা ওয়ানডে একাদশে জায়গা করে নিলেন। তাও আবার খেলেছেন মাত্র ৪ মাসেরও কম সময়। এই ৪ মাসে তিনি খেলেছেন ৯ ম্যাচ। আর তা থেকে তার ঝুলিতে জমা পড়েছে ২৬ উইকেট। তার আগে এত কম একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ খেলে এত বেশি উইকেট পাননি। তার কারণে তিনি রেকর্ড ভেঙ্গে ঢুকে গেছেন ক্রিকেট ইতিহাসের রেকর্ডের পাতায়। আর তার এই ইতিহাস, এই ৪ মাসের পারফর্মেন্স তাকে জায়গা করে দিয়েছে একদিনের ক্রিকেটের বিশ্ব একাদশে। এটি নিঃসন্দেহে একটি বিশাল বিষয়। এ কথা বললে বাড়িয়ে বলা হবে না যে, রেকর্ড ভাঙ্গার জন্যই বুঝি তার জন্ম। একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের অভিষেক ম্যাচে ভারতের বিপক্ষে ৫০ রানে ৫ উইকেট নিয়ে রেকর্ডের পাতায় নাম লিখে ক্রিকেটবিশ্ব চমকে দেন। তার রূপকথার গল্পের এখানেই শেষ নয়। পরের ম্যাচে তিনি আবার ৪৩ রানে ৬ উইকেট নিয়ে তিনি তামাম ক্রিকেটবিশ্বকে জানিয়ে দিলেন ‘আমিই রেকর্ড গড়ার কারিগর।’ এই দুই ম্যাচেই ক্রিকেটদুনিয়া চিনে ফেলল মুস্তাফিজকে। একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ইতিহাসে প্রথম বোলার হিসেবে পর পর ২ ম্যাচে ৫ বা এর অধিক উইকেট নেয়ার এক নতুন রেকর্ড গড়লেন মুস্তাফিজ। তৃতীয় ম্যাচে আরও ২ উইকেট পাওয়ায় ৩ ম্যাচের সিরিজ শেষে একদিনের ক্রিকেট ইতিহাসে অভিষেকে তো বটেই সঙ্গে এক সিরিজে সর্বোচ্চ ১৩ উইকেট পাওয়ার আরও একটি অনন্য রেকর্ড গড়েন। আর তাতে করে নাম লেখালেন ক্রিকেট ইতিহাসের পাতায়। বলা যায়, এ সিরিজে তার অনবদ্য কৃতিত্বে ভারতের বিপক্ষে ‘একদিনের ক্রিকেট সিরিজ’ জয়ের অনন্য কৃতিত্ব অর্জন করে বাংলাদেশ। ভারতের পরে দ. আফ্রিকার বিপক্ষেও অবস্থা তথৈবচ। দুর্বার গতিতে এগিয়ে গেলেন মুস্তাফিজ। বলতে গেলে এর মধ্যে বাংলাদেশের যে কয়টি জয় এসেছে তার সবই মুস্তাফিজের হাত ধরে। এ কথা বললে অত্যুক্তি হবে বলে মনে না যে তার কারণেই বাংলাদেশ এতটা সহজে আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে খেলার সুযোগ পেয়েছে।

এ নিয়ে এর আগেই লেখা হয়েছে। মাত্র কুড়ি বছর বয়সের সবে কৈশোর পেরোনো টগবগে এই যুবকের কীর্তিগাথা এখন আর একজন ক্রিকেটপ্রেমীরও অজানা আছে বলে আমার মনে হয় না। এত অল্প বয়সে এত সব অনন্য অর্জন আর কোন ক্রিকেটারের ভাগ্যে হয়েছে বলে মনে হয় না। ক্রিকেট তথা বিশেষ করে একদিনের ক্রিকেট ইতিহাসের এই ‘স্বপ্ন বালক’র সাতকাহন হাজার পৃষ্ঠা লিখলেও শেষ হবে না। কী করেছেন না বলে বলা যায় কী করেননি! একদিনের ক্রিকেটের ৪৫ বছরের ইতিহাসে অন্য কেউ যা করতে পারেননি তিনি সেটাই করে দেখিয়েছেন। মাত্র ক’দিনেই কেবল গোটা বাংলাদেশ নয়, বলা যায় ক্রিকেট বিশ্ব মাতিয়ে ফেলেছেন। অনন্য ক্রিকেট রেকর্ডে নিজেকে নিয়ে গেছেন এক অনন্য উচ্চতায়। এরই মধ্যে সে কেবলমাত্র নিজেকেই নয়, নিজের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশকেও তুলে নিয়ে গেছে কয়েক ধাপ ওপরে। নিজেই রেকর্ড গড়েছেন তা নয়, সে রেকর্ডে শামিল হয়েছে বাংলাদেশকেও। আর সে কারণে জায়গা পেয়েছেন আইসিসির বর্ষসেরা ওয়ানডে একাদশে। যে দলে জায়গা পেয়েছেন এবারের বিশ্বকাপের দুই ফাইনালিস্ট অস্ট্রেলিয়ার স্মিথ ও স্টার্ক এবং নিউজিল্যান্ডের রস টেলর ও ট্রেন্ট বোল্ট মাত্র এই ২ জন করে ক্রিকেটার। তবে এ দিক দিয়ে এগিয়ে আছে দ. আফ্রিকা। একমাত্র দ. আফ্রিকা থেকে সর্বাধিক ৩ জন হাশিম আমলা, এবি ডি ভিলিয়ার্স ও ইমরান তাহির এ দলে জায়গা পেয়েছেন। এ ছাড়া একদিনের ক্রিকেটের ১৭ দলের মধ্যে ১০ দলেরই কোন খেলোয়াড় ওয়ানডে একাদশে জায়গা পায়নি। এর মধ্যে রয়েছে সাবেক চ্যাম্পিয়ন ভারত, ওয়েস্ট ইন্ডিজের মতো দলও। ছোটখাটো দলগুলোর কথা না হয় বাদই দিলাম। তার মানে এমন একটি দলে জায়গা পাওয়ায় তাও আবার মাত্র ৪ মাসের পারফর্মেন্সে। যেখানে বাকি সবাই এসেছেন এক বছরের পারফর্মেন্স বিবেচনায়। এমন একটি সাফল্যে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের উজ্জ্বল নক্ষত্র, এক জ্বলজ্বলে ধ্রুবতারা মুস্তাফিজুর রহমান আত্মশ্লাঘান্বিত হতেই পারেন।

ক্রিকেটের ১৩৮ বছরের ইতিহাসে রেকর্ড গড়ে রাজকীয় অভিষেকের ঘটনা অনেক আছে। রেকর্ড গড়ার পাশাপাশি বড় কাজ হচ্ছে ক্রিকেট মাঠে টিকে থাকা। টিকে থাকতে পারলেই একদিন সাফল্যের শিখরে পৌঁছানো সম্ভব। দু’একটি রেকর্ড গড়ে ক্যারিয়ার থেমে গেলে সে রেকর্ড পূর্ণতা পায় না। বিশ্বক্রিকেটাকাশে এমন অনেক স্বাতি, অনেক ধ্রুবতারার জ্বলজ্বল করে জ্বলে ওঠার পর অনেক পতনও আমরা দেখেছি। তারাবাজির মতো ফরফর করে জ্বলতে জ্বলতে নিভে যাওয়ার দৃষ্টান্তও ক্রিকেটে ভুরিভুরি রয়েছে। রেকর্ড গড়ে ক্যারিয়ার শুরুর পর দু’মাস না যেতেই অনেকের নাম ভুলে যেতে পাঠকের সময় লাগেনি। মুদ্রার যেমন দুই পিঠ থাকে তেমনি যে কোন শুরুরও দু’টো দিক। টিকে থাকলে একদিন কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে ঠিকই পৌঁছানো সম্ভব। আর টিকে থাকতে হলে চাই কঠোর সাধনা আর অধ্যবসায়।

এ কথাগুলো বললাম এ কারণে, মুস্তাফিজের ক্রিকেট ক্যারিয়ার কেবল শুরু। এখনও অনেক পথ বাকি। যেতে হবে বহুদূর। অনেক চড়াই-উতরাই, অনেক বন্ধুর পথ পাড়ি দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, খ্যাতির বিড়ম্বনাও অনেক আর পথটাও বড়ই পিছল। চলতে হয় খুব সাবধানে। থাকে যে কোন মুহূর্তে পা পিছলে পড়ে যাওয়ার ভয়। পথভ্রষ্ট হওয়া ক্রিকেটারের সংখ্যাও কম নয়। পরিসংখ্যানের বিচারে নাইবা গেলাম। একটা কথা বলে রাখি, পাহাড়চূড়োয় ওঠা যতটা কষ্টের তার চেয়ে কষ্টের সেখানে টিকে থাকা। অনেক ঠেলা, অনেক ঝড়-ঝাপটা সামলে সেখানে টিকে থাকতে হয়। সেটা যে করতে পারে শেষ জয়টা সেই পায়। এ কথাটা মনে রাখতে হবে মুস্তাফিজকে। ঐদিনও সবার জানা আইসিসির বর্ষসেরা ওয়ানডে একাদশে কারা ঠাঁই পেয়েছেন তারপরও চর্বিত চর্বন আরেকবার: হাশিম আমলা (দ. আফ্রিকা), তিলকারতেœ দিলশান (শ্রীলঙ্কা), কুমার সাঙ্গারকারা (শ্রীলঙ্কা), এবি ডি ভিলিয়ার্স (দ. আফ্রিকা), স্টিভেন স্মিথ (অস্ট্রেলিয়া), রস টেলর (নিউজিল্যান্ডে), মিচেল স্টার্ক (অস্ট্রেলিয়া), ট্রেন্ট বোল্ট (নিউজিল্যান্ডে), মুস্তাফিজুর রহমান (বাংলাদেশ), মোহাম্মদ সামি (পাকিস্তান), ইমরান তাহির (দ. আফ্রিকা) ও টুয়েলভ ম্যান জো রুটস (ইংল্যান্ড)।

লেখক : ক্রীড়ালেখক, কথাসাহিত্যিক ও সাহিত্য সংগঠক

e-mail : syedmayharulparvey@gmail.com

নির্বাচিত সংবাদ