২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ভারতে ধরাশায়ী দ.আফ্রিকা

মোঃ নুরুজ্জামান ॥ কে বলবে এই দক্ষিণ আফ্রিকা র‌্যাঙ্কিংয়ের ‘এক নম্বর’ দল। টেস্ট সিরিজে ভারতের কাছে যে পাত্তাই পেল না হাসিম আমলারা। চার টেস্টের সিরিজে কার্যত ‘হোয়াইটওয়াশ’ প্রোটিয়ারা। ভারতের জয় ৩-০তে। মোহালির প্রথম টেস্টে ১০৮ রানের বড় জয় দিয়ে মিশন শুরু করে বিরাট কোহলি-বাহিনী। বৃষ্টি বাগড়ায় বেঙ্গালুরুর দ্বিতীয় ম্যাচ ড্র হয়। নাগপুরের তৃতীয় টেস্টে ১২৪ রানের জয়ে এক ম্যাচ হাতে রেখেই সিরিজ পকেটে পোড়ে স্বাগতিকরা। দিল্লীর শেষ ম্যাচটা অতিথিদের জন্য ছিল মান বাঁচানোর লড়াই। সেটি তো হয়ইনি, উল্টো ৩৩৭ রানের বিশাল হারের লজ্জায় মাথা নোয়ায় সফরকারীরা। অথচ এই দক্ষিণ আফ্রিকাই ভারত সফর শুরু করেছিল টি২০ সিরিজ জিতে, এরপর ওয়ানডেতেও এবি ডি ভিলিয়ার্সদের দাপট অব্যাহত ছিল। অথচ টেস্টে খাবি খেল ক্রিকেট বিশ্বের সেরা শক্তি।

দিল্লী জয়ে এক নম্বর টেস্ট দলের বিপক্ষে কেবল ম্যাচ বা সিরিজই নয়, যেন নিজেদের ক্রিকেটীয় গৌরবই পুনরুদ্ধার করল কোহলি-বাহিনী। নাগপুরে পিচ-বিতর্কের পর ইন্ডিয়ান বোর্ডের (বিসিসিআই) গায়ে যে কালিমা লেগেছিল, সোমবার দিল্লীতে তা ধুয়েমুছে সাফ হয়ে যায়! আমলা- ডি ভিলিয়ার্স, বাভুমা-ডুপ্লেসিসদের ‘ব্লক-গাঁথায়’ ইতি টেনে দিলেন ভারতীয় বোলাররা। একই সঙ্গে স্বাগতিকরা বুঝিয়ে দিল, কেবল ঘূর্ণি পিচের সাহায্যে নয়, তাদের জয়টা এল দলীয় নৈপুণ্যে।

আগেই সিরিজ নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল। তবু দিল্লী টেস্ট সামনে রেখে ভারত অধিনায়ক বিরাট কোহলি বলেছিলেন, কোন রকম ছাড় নয়, তাদের একমাত্র লক্ষ্য ‘৩-০’তে শেষ করা। শেষ পর্যন্ত তাই হয়। ভেঙ্গে যায় হাসিম আমলা-এবি ডি ভিলিয়ার্সদের ‘অবিশ্বাস্য’ প্রতিরোধও। স্বাগতিক ঘূর্ণিবিষে ফের নীল হয় অতিথি শিবির। এবার র‌্যাঙ্কিংয়ের এক নম্বর দল ধরাশায়ী ৩৩৭ রানে। যার মধ্য দিয়ে শেষ হয় প্রোটিয়াদের মিশ্র নৈপুণ্যের দীর্ঘ ভারত সফর। যেখানে টি২০ আর ওয়ানডে জয়ের পর টেস্টে মুখ থুবড়ে পড়ল অতিথিরা। কোহলিদের কাছে পাত্তাই পায়নি আমলারা। একতরফা দাপটে চার টেস্টের সিরিজটা পকেটে পোড়ে ভারত। দুই ইনিংসে সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে ম্যাচসেরা হন অজিঙ্কা রাহানে। আর দুরন্ত বোলিংয়ে সিরিজসেরা স্পিনার রবিচন্দ্রন অশ্বিন। ২ উইকেটে ৭২ রান নিয়ে পঞ্চম ও শেষ দিনে দ্বিতীয় ইনিংসের খেলা শুরু করে দক্ষিণ আফ্রিকা। ৪৮১ রানের লক্ষ্য ছোঁয়ার দুঃস্বপ্নটা নিশ্চয়ই ছিল না আমলাদের। তারা চেয়েছিলেন কেবল দাঁতে দাঁত চেপে ক্রিজে থেকে দিন পার করে দিতে। নিদেন ড্র। কিন্তু সেটিও হয়নি। ৭১ ওভারে আর ৭১ রান যোগ করে অলআউট হয় অতিথিরা। ঠেকানো আর কাকে বলে? ১৪৩.১ ওভারে ১৪৩ রান করতে সমর্থ হয় ‘নাম্বার ওয়ান’রা! প্রথম ইনিংসে যারা গুটিয়ে যায় ১২১-এ। আর ভারত করে ৩৩৪ ও ২৬৭/৫ (ডিক্লেঃ)। ১২০ ওভার মিলিয়ে যারা ৩ উইকেট হারিয়েছিল, সেই প্রোটিয়ারাই কাল ১৪ বলের ব্যবধানে হারায় আরও ৩ উইকেট! জ্বলে ওঠা অশ্বিন-রবিন্দ্র জাদেজার ঘূর্ণির মুখে এই ধাক্কা সামলানো আর সম্ভব ছিল না। ধৈর্যের পাহাড় গড়ে অটুট প্রতিরোধ গড়া আর সমান ধৈর্যের নিখুঁত বোলিং দিয়ে সেই প্রতিরোধ ভেঙ্গে দেয়ার অসাধারণ এক ম্যাচই উপহার দেয় দিল্লী টেস্ট। যে ধৈর্যের লড়াইয়ে শেষ জয়টা ভারতেরই। এবিকে নিয়ে চতুর্থ দিনই দুর্দান্ত প্রতিরোধ গড়েছিলেন অধিনায়ক আমলা। সোমবার দিনের ১৩তম ওভারে ভাঙে আমলার ২৮৮ মিনিট ও ২৪৪ বলে ২৫ রানের অবিশ্বাস্য সেই প্রতিরোধ। এরপরও অবিচল ছিলেন ডি ভিলিয়ার্স, কিন্তু কাজটা সহজ ছিল না। পুরো ইনিংসে যার ২ উইকেট সেই জাদেজাই করে দেন আসল কাজ। আমলার পর ডুপ্লেসিসকেও ফেরান তিনি। শেষ পর্যন্ত ২৩ ওভারে শেষ ৭ উইকেট হারায় প্রোটিয়ারা। এর মধ্যে ১৩৮.৫ ওভার থেকে ১৪১- অর্থাৎ ১৪ বলে হয় বড় সর্বনাশ। পর পর তিন উইকেট হারায় সফরকারীরা। ৫ উইকেটে ১৩৬ থেকে মুহূর্তেই ৮ উইকেটে ১৪০! এর মধ্যে রয়েছে ডি ভিলিয়ার্সের মহাগুরুত্বপূর্ণ উইকেটটি। ২৯৭ বলে ৪৩ রানের ইনিংস খেলেন ওয়ানডেতে মাত্র ৩১ বলে সেঞ্চুরির বিশ্বরেকর্ড গড়া এই ব্যাটসম্যান! এর মধ্য দিয়ে টানা চতুর্থ ইনিংসে ৫ উইকেট নেয়ার কৃতিত্ব দেখান অশ্বিন। মোট ৩১ উইকেট নিয়ে সিরিজসেরাও এই ভারতীয় তারকা। ১২৭ ও ১০০* রানের চমৎকার দুই ইনিংস উপহার দিয়ে দিল্লী জয়ের ‘নায়ক’ অবশ্য রাহানে। দিল্লী টেস্টে অনেক রেকর্ড হয়েছে- (১) ভারতের উমেশ যাদব ২১ ওভার বল করে দেন মাত্র ৯ রান! মেডেন ১৬ টা! কোন ফাস্ট বোলার টেস্ট ম্যাচে এত কৃপণ বোলিংয়ের নজির আর নেই। (২) ৩৩৭- রানের হিসেবে এটাই ভারতের সব চেয়ে বড় ব্যবধানে জয়। এর আগে ২০০৮ সালে ভারত, অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়েছিল ৩২০ রানে। (৩) স্পিনার রবীন্দ্র জাদেজা দ্বিতীয় ইনিংসে ৪৬ ওভার বল করে নিয়েছেন ৩৩ মেডেন। ভারতের হয়ে এমন রেকর্ড রয়েছে ভিনু মাকড়ের। তিনি ৭৬ ওভার বল করে ৪৭টি মেডেন নিয়েছিলেন। (৪) সিরিজে জে পি ডুমিনির গড় ১০.৬২। বিশ্বের আর কোনও দেশের বিপক্ষে তার পারফর্মেন্স এতটা কুৎসিত নয়! (৫) ব্যাটিংয়ে সবচেয়ে মন্থরতম পার্টনারশিপও হয়েছে এই টেস্টেই। অন্তত ২০০ বল খেলা হয়েছে, সেক্ষেত্রে হাসিম আমলা আর এবি ডিভিলিয়ার্স করেছেন মাত্র ২৭ রান! (৬) হাসিম আমলা গড়েছেন মন্থরতম ব্যাটিংয়ের রেকর্ড। তার স্ট্রাইক রেট ১০.২৪! ২৪৪ বলে করেন ২৫! পিছিয়ে ছিলেন না এবি ডি ভিলিয়ার্সও। তিনি ২৯৭ বলে করেন ৪৩! (৭) দক্ষিণ আফ্রিকা এই টেস্টে প্রথম ৫০ ওভার ব্যাট করে তোলে মাত্র ৪৯! (৮) যেখানে নিজের আগের ২১ টেস্টে অজিঙ্কা রাহানের ছক্কা ৫ টি, সেখানে এই টেস্টেই মেরেছেন ৭টি (৯) দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে প্রথম ভারতীয় হিসেবে দুই ইনিংসেই সেঞ্চুরি করেন রাহানে।