২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিনিয়োগ, সরকারের উদ্বেগ ও কিছু ভাবনা -স্বদেশ রায়

দেশে কোন ধরনের কোন রাজনৈতিক বা বড় মাপের কোন সন্ত্রাসী গোলযোগ নেই। প্রতিবেশী অনেক দেশের থেকে বাংলাদেশের সব ধরনের স্থিতিশীলতা অনেক বেশি। এরপরেও দেশে বিনিয়োগ হচ্ছে না। বিদেশী বিনিয়োগ যেমন মোটেই আশানুরূপ নয়, তেমনি দেশী বিনিয়োগও হচ্ছে না। বিষয়টি নিয়ে সরকারের প্রধানমন্ত্রী এবং অর্থমন্ত্রীও চিন্তিত। এ লেখা লিখছি ৫ তারিখে। এর আগের সপ্তাহে অর্থমন্ত্রী বিনিয়োগের বিষয়ে বর্তমান ও সাবেক এফবিসিসিআই-এর বড় নেতাদের নিয়ে দুটো মিটিং করেছেন। অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে এ বিষয় নিয়ে একান্ত আলোচনায়ও তিনি বলেছেন, বিষয়টি নিয়ে তিনি চিন্তিত এবং কাজ করছেন। আগামী কয়েক সপ্তাহে তিনি আরও কাজ করবেন। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও তাঁর আলোচনা হচ্ছে। অর্থমন্ত্রী যে বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত ও কাজ করছেন তা এর মাসখানেক আগেও তিনি একান্ত আলোচনায় বলেছিলেন, বিনিয়োগের এই ব্যারিয়ারটি তাকে ভাঙতে হবে। কারণ, গত বিশ বছর বিনিয়োগ এক স্থানেই আছে।

গত বিশ বছরে বিনিয়োগের অবস্থান যে একই স্থানে ঘোরাফেরা করছে তার কারণ অবশ্য বর্তমান সরকারও বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী অনেক আগেই কিছুটা হলেও চিহ্নিত করেছেন। যার ভেতর একটি হলো দেশের সব স্থান সমানভাবে ব্যবহার হচ্ছে না। দেশের সব স্থান ও সব ধরনের কাঁচামাল সমানভাবে ব্যবহার করতে হলে প্রথমে কিছু মেগা প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করে নিতে হবে। যার অন্যতম পদ্মা সেতু। শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসেই পদ্মা সেতুর কাজ হাতে নেন। ১০ সালে বিশ্বব্যাংক এ কাজে সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসে। ওই সময়ে এ কাজ শুরু হলে এতদিনে পদ্মা সেতু চালু হয়ে যেত। দেশের দক্ষিণ অঞ্চল বিনিয়োগের একটি বড় ক্ষেত্র হয়ে উঠত। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে, দেশের কিছু শিক্ষিত মানুষ যারা আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিসম্পন্ন তারা এ কাজটি হতে দেননি। তারা বিশ্বব্যাংককে প্রভাবিত করতে সমর্থ হন তাদের আন্তর্জাতিক যোগাযোগের কারণে। এ কাজে একজন অর্থনীতিবিদ ও একজন সম্পাদক দেশের যে ক্ষতি করেছেন তা ভবিষ্যত ইতিহাস আরও স্পষ্ট করে বলবে।

যাহোক, এখন ধারণা করা যাচ্ছে ২০১৮ সালের ভেতর পদ্মা সেতুর কাজ শেষ হয়ে যাবে। পদ্মা সেতুর কাজ শেষ হলে কিছুটা হলেও দেশী ও বিদেশী বিনিয়োগ বাড়ার সুযোগ হবে। অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে একান্ত আলোচনায় জানা যায়, আগামী বাজেটে তিনি মেগা প্রজেক্টের জন্য আলাদা বাজেট করবেন। যাতে মেগা প্রজেক্টগুলোর অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন দ্রুত হয়। বর্তমানে ব্যাংকে যে প্রচুর পরিমাণে অলস টাকা পড়ে আছে এটাকে তিনি আন ইউজুয়াল সিসুয়েশান বলে বলেন, সরকারের নয়টা মেগা প্রজেক্ট আছে এগুলোতে ফিন্যান্স করা হবে। সরকারের এই নয়টা মেগা প্রজেক্টে ফিন্যান্স করলেই কিন্তু ব্যাংকের অলস টাকা সচল হয়ে উঠবে।

এখন প্রশ্ন আসে, শুধুমাত্র সরকারের মেগা প্রজেক্ট বাস্তবায়ন শুরু করলে এবং ব্যাংকের অলস টাকা সচল করলেই কি বিনিয়োগের চিত্র বদলে যাবে? আর শুধু দেশের টাকা বিনিয়োগ হলেই কি অর্থনীতি প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ পাবে? সরকারের কাজ ও কথা থেকে বোঝা যাচ্ছে সরকার তার মেগা প্রজেক্টে অর্থায়ন করে ও এফবিসিসিআই নেতাদের সঙ্গে কথা বলে বিনিয়োগের মাত্রা বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে। এমনকি ইতোমধ্যে বিনিয়োগের স্বার্থে সরকার শিল্প বা ব্যবসার ঋণের সুদের হার কমিয়েছে। তখন আমাদের দেশের শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীরা বলেছিলেন, সুদের হার কমিয়ে দিলে বিনিয়োগ বাড়বে। যদিও কমানোর পরে খুব বেশি সময় যায়নি কিন্তু তারপরেও কিন্তু তার সুফলের কোন আলোক রেখা দেখা যাচ্ছে না। বাস্তবে সুদের হার কমালেই যে বিনিয়োগ বাড়বে এই ধারণায় সকলে বিশ্বাসী নন, কয়েকজন অর্থনীতিবিদের সঙ্গে নানান সময়ে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, সে সব আলোচনায় অনেক আধুনিক শিল্পপতিও ছিলেন তাঁরা কিন্তু মনে করেন প্রকৃত শিল্প করার জন্য ডাবল ডিজিটের সুদের হার বড় বাধা নয়।

কিছু বাস্তবতা থেকে মনে হয়, সুদের হারের থেকে বড় বাধা কিন্তু বিনিয়োগের নতুন কনসেপ্টের অভাব ও ডায়নামিক ব্যাংকিং সেবা। আমাদের দেশে দেখা যাচ্ছে বিনিয়োগগুলো কয়েকটি নির্দিষ্ট খাতের ভেতর ঘোরাফেরা করছে। অন্যদিকে ব্যাংকও ট্রাডিশনাল ফিন্যান্সে বিশ্বাসী। আবার কখনও কখনও রক্ষণশীলতাও একটি বড় বাধা। তাই দেশীয় শিল্পপতিদের জন্য এখন প্রয়োজন নতুন নতুন কনসেপ্ট। আবার ব্যাংকগুলোকেও যারা পরিচালনা করেন বা এদের যারা রেগুলেটরি বডি তাদেরকেও নতুন কনসেপ্টগুলো বুঝতে হবে। আমাদের বিনিয়োগ যেমন একটি বৃত্তে আটকে গেছে, জিডিপি যেমন ৬ থেকে ৬.৫-এর বৃত্তে আটকে গেছে তেমনি আমাদের কনসেপ্টগুলোও কিন্তু একটি বৃত্তে আটকে গেছে। শিল্পের ইতিহাসে দেখা যায় এ ক্ষেত্রে সব সময়ই নতুন প্রজন্মের শিল্পপতিরাই এই বৃত্ত ভাঙ্গে। অনেক সময় তাদের কনসেপ্টগুলো ট্রাডিশনালদের কাছে পাগলামো মনে হয়। বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের শিল্পোদ্যোক্তা বা আগ্রহী শিক্ষিত তরুণদের সঙ্গে আলোচনা করে দেখেছি তাদের সঙ্গে ট্রাডিশনালদের একটি চিন্তার দূরত্ব আছে, পার্থক্য আছে। এখানে একটি মিলন ঘটাতে হবে, তাদের সুযোগ দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে তাই সরকারী আর্থিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় শুধুমাত্র ট্রাডিশনাল অভিজ্ঞদের গুরুত্ব না দিয়ে নতুন প্রজন্মের অর্থনীতির ছাত্রদেরকে যোগ করা যেতে পারে। তাহলে তাঁরা এই বৃত্তটি ভাঙতে সাহায্য করতে পারে।

বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারের সব থেকে বড় বাধা বাংলাদেশ সম্পর্কে সঠিক প্রচার হয় না। সত্যি অর্থে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে বিশ্বসভার দৃষ্টি আকর্ষিত হয়েছে কেবলমাত্র অমর্ত্য সেনের কয়েকটি লেখায় বাংলাদেশের উন্নতির রেফারেন্স থাকায়। এছাড়া প্রকৃত অর্থে ঠিক ওইভাবে বাংলাদেশকে বিশ্বসভায় তুলে ধরা হয়নি। অথচ সরকার আন্তরিক হলে এ কাজটি করতে পারে। এছাড়া আরও একটি বিষয় হলো, বাংলাদেশকে বিদেশীরা যে পত্রিকাটির মাধ্যমে দেখে ওই পত্রিকাটি দেশের ভাল দিকগুলো তুলে ধরে না। এর বিপরীতে সত্যি অর্থে দেশের প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরার মতো ইংরেজী ভাষায় কোন পত্রিকা এখনও অমন গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। যে কারণে গার্ডিয়ানের লেখা থেকে শুরু করে রামচন্দ্র গুহও একইভাবে বাংলাদেশ ও শেখ হাসিনার সরকারকে দেখে। এমনকি দি হিন্দুর মতো নিউজ পেপারও ওয়ার ক্রিমিনাল না লিখে অপজিশান পলিটিক্যাল লিডার লেখে। সরকারের এক্সটারনাল পাবলিসিটি বিভাগ আছে তারাও কিন্তু এগুলো নিয়ে কোন প্রতিবাদ করে না।

দেশের অর্থনীতিকে তুলে ধরার জন্য সরকারী টাকা খরচ করে ঘুরে বেড়ানোর দরকার পড়ে না। তার বদলে বিদেশী সৎ সাংবাদিকদের নিয়ে এলেই তারা বাংলাদেশের প্রকৃত অবস্থান তুলে ধরবেন। সে প্রচার আরও বেশি গুরুত্ব পাবে। দেশকে নিয়ে সে প্রচার কেন হচ্ছে না, কেন দেশকে সেভাবে তুলে ধরা হচ্ছে না বিদেশে এর কিন্তু কোন সদুত্তর নেই।

তবে দেশের বিনিয়োগ বাড়ানো, অলস অর্থকে সচল করা অর্থাৎ অর্থনীতির এই বৃত্ত ভেঙ্গে এখন সামনে এগিয়ে যাবার সময়। কারণ বেশি দেরি হয়ে গেলে দেশ অন্য সঙ্কটে পড়ে যাবে। মনে রাখা দরকার এ মুহূর্তে ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সী মানুষের সংখ্যা দেশে ৫ কোটির বেশি। অন্যদিকে প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ সিনিয়র সিটিজেন হওয়ার পথে। তাই আগামী দশ বছর খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই তরুণ পাঁচ কোটিকে কাজে না লাগালে এরাও চল্লিশের পথে চলে যাবে। অন্যদিকে আরও পাঁচ কোটি বাড়তি সিনিয়র সিটিজেন। তখন এ ধরনের অর্থনীতি ওই ভার বইতে পারবে না।

swadeshroy@gmail.com

নির্বাচিত সংবাদ
এই মাত্রা পাওয়া