১৫ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মহাসড়ক নির্বিঘ্ন করার কাজ চলছে জোরেশোরে

  • সমন্বয় করে সংস্কারে হাত দিয়েছে স্বরাষ্ট্র ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয়;###;দুর্ঘটনাপ্রবণ স্পটে রাস্তার বাঁক সোজা করা হচ্ছে ;###;সিসি ক্যামেরা বসছে ;###;ঢেলে সাজা হচ্ছে হাইওয়ে পুলিশ

গাফফার খান চৌধুরী ॥ মহাসড়কের দুই পাশের ১০ মিটার পর্যন্ত সব ধরনের স্থাপনা উচ্ছেদে উচ্চ আদালতের নির্দেশ কার্যকর হলে যানজট ও দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমে যাবে। পাশাপাশি সহাসড়কে ছিনতাইসহ যেকোন ধরনের অপরাধ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে। মহাসড়কে দুর্ঘটনা, ছিনতাই ও যানজট নিরসনে দুর্ঘটনাপ্রবণ মহাসড়কে সিসি ক্যামেরা বসানোর কাজ চলছে। পাশাপাশি ঢেলে সাজানো হচ্ছে হাইওয়ে পুলিশকে। হাইওয়ে পুলিশে ৬২২টি পদ সৃষ্টি করা হয়েছে।

দুর্ঘটনাপ্রবণ স্পটগুলোর রাস্তার বাঁক সোজা করার কাজ শুরু হয়েছে। দুর্ঘটনা কমাতে বৈধ চালক কর্তৃক যানবাহন চালানো নিশ্চিত করতে সম্মিলিতভাবে কাজ করে যাচ্ছে স্বরাষ্ট্র ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয়। দুর্ঘটনায় আহতদের সরকারীভাবে বিনামূল্যে বা যানবাহন মালিক কর্তৃক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা, যাত্রীদের বীমা এবং নিহতদের উপযুক্ত আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদান ছাড়াও দুর্ঘটনা বা যেকোন ধরনের অপরাধ সংঘটনের ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার তদন্ত হাইওয়ে পুলিশকে দিয়ে করার বিষয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হচ্ছে।

হাইওয়ে পুলিশের হিসেব অনুযায়ী সারাদেশে ১১ হাজার ৮০৬ কিলোমিটার মহাসড়ক রয়েছে। বিআরটিএ-র হিসেব মতে, সারাদেশে রেজিস্ট্রেশনকৃত প্রায় ২১ লাখ বিভিন্ন প্রকারের যানবাহন চলাচল করে থাকে। যদিও বাস্তবে এর পরিমাণ ২৫ লাখেরও বেশি। যা মহাসড়কের পরিমাণের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেশি। হাইওয়ে পুলিশের তথ্যমতে, দেশে বৈধ চালকের সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ। এছাড়া প্রায় ১১ লাখ অবৈধ চালক রয়েছে। অবৈধ চালকরা ভুয়া নাম ঠিকানা ব্যবহার করে লাইসেন্স নিয়ে থাকে। ভুয়া নাম ঠিকানায় লাইসেন্স ব্যবহার করার কারণে মহাসড়কে ছিনতাই বা দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার আসামি হিসেবে চালকদের আর গ্রেফতার করা সম্ভব হয় না। পরিমাণের তুলনায় অতিরিক্ত যানবাহন চলাচল, দ্রুতগতি ও দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকার কারণে মহাসড়কে দুর্ঘটনা বেশি ঘটে। দুর্ঘটনায় হতাহতের ঘটনাও তুলনামূলক বেশি হয়।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) এক্সিডেন্টাল রিসার্চ ইনস্টিটিউটের হিসেব অনুযায়ী, মহাসড়কে ২০৮টি ব্লাকস্পট (দুর্ঘটনা প্রবণ এলাকা) রয়েছে। ব্লাকস্পটের কারণে যানজট, দুর্ঘটনা ও নানা ধরনের অপরাধ বেশি সংঘটিত হয়ে থাকে। এক্সিডেন্টাল রিচার্স ইনস্টিটিউট ও হাইওয়ে পুলিশের হিসেব অনুযায়ী প্রতিবছর গড়ে সড়ক-মহাসড়কে দুর্ঘটনায় প্রায় ৫ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। আর গড়ে অন্তত ২০ হাজার মানুষ আহত হন। আহতদের মধ্যে গড়ে অন্তত ৫ হাজার জনকে চিরতরে পঙ্গুত্ববরণ করতে হয়। এদের মধ্যে শতকরা ৭৫ ভাগই সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি।

হাইওয়ে পুলিশ বলছে, মহাসড়কের এমন পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটাতে স্বরাষ্ট্র ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে নিয়ে একত্রে কাজ শুরু করেছে। ইতোমধ্যেই শতাধিক ব্লাকস্পট মেরামত অর্থাৎ বাঁক ঠিক করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ১১টি মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ ব্লাকস্পট সংস্কার করেছে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়। বাকিগুলো মেরামতের কাজ চলছে। যেসব ব্লাকস্পট ঠিক করা হয়নি সেখানে উজ্জ¦ল আলোর বিকিরণক্ষম বড় বড় সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে। তাতে লেখা রয়েছে, ‘দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা, সাবধানে চলাচল করুন।’ গতিসীমাও নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। এসব স্পষ্টগুলোতে পুলিশ এবং সড়ক ও জনপথের রেকার রাখা হয়েছে। কোন যানবাহন দুর্ঘটনায় পড়লে যাতে দ্রুত সরিয়ে নেয়া সম্ভব হয়। রাস্তায় যাতে নষ্ট যানবাহনের জন্য বাড়তি যানজট সৃষ্টি না হয়। এসব ব্লাকস্পটের রাস্তার বাঁক ও খানাখন্দ ঠিক করার কাজ চলছে।

মহাসড়কের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রায় ৫৭ কোটি ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে ৫০টি স্থায়ী আউটপোস্ট। ইতোমধ্যেই ৩২টির কাজ শেষ হয়েছে। এর মধ্যে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহযোগিতায়ই নির্মিত হয়েছে ১১টি। অন্যগুলোর নির্মাণ কাজ চলছে। ২০১৬ সালের জুনের মধ্যে আউটপোস্ট নির্মাণের কাজ শেষ হওয়ার কথা। ২০০৫ সালের ১১ জুন ভাল উদ্দেশ্য নিয়েই বাংলাদেশ পুলিশের হাইওয়ে বিভাগ চালু করা হলেও বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে নানা উপকরণ কেনার নামে রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকা রীতিমতো হরিলুট করা হয়েছে।

হাইওয়ে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মহাসড়কের দুর্ঘটনাপ্রবণ অনেক এলাকায় সিসি ক্যামেরা বসানোর কাজ চলছে। দুর্ঘটনাকবলিত যানবাহন, চালক ও দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে ধারণা পেতেই এমন ব্যবস্থা। মূলত সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ দেখে দুর্ঘটনা কবলিত যানবাহন ও তার চালককে সহজেই শনাক্ত করতেই এমন ব্যবস্থা। কারণ অধিকাংশ চালক ভুয়া হওয়ায় বেশিরভাগ দুর্ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার আসামি চালককে গ্রেফতার করা সম্ভব হয় না।

মহাসড়কের সার্বিক উন্নতির লক্ষ্যে স্থায়ী আউটপোস্টগুলোতে ২৮ থেকে ৩২ জন করে জনবল নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। আউটপোস্টের সংখ্যা ৭৮টি থেকে বাড়িয়ে একশ, জনবল ২ হাজার ৪২ জনের জায়গায় কমপক্ষে ৫ হাজার (১ হাজার ৮১৩ জন জনবলের চাহিদার প্রস্তাব দেয়া রয়েছে), ৯০টি যানবাহনের জায়গায় অন্তত ২০০টি, ৫টি রেকারের জায়গায় অন্তত ২০টি, কমপক্ষে ২শ’ সিসি ক্যামেরা, ১০টি এ্যাম্বুলেন্স, অতিরিক্ত দুর্ঘটনাপ্রবণ ৪০টি জায়গায় অন্তত ২শ’ স্পীডগান, ২শ’ এ্যালকোহল ডিটেক্টর (মাদকাসক্ত চালকদের শনাক্ত করার মেশিন) চাহিদার কথা বলা হয়েছে।

হাইওয়ে পুলিশের বর্তমানে কুমিল্লা, গাজীপুর, মাদারীপুর ও বগুড়া জেলা রয়েছে। এর বাইরে খুলনা, রংপুর, সিলেট ও চট্টগ্রাম হাইওয়ে জেলা করার কাজ চলছে। হাইওয়ে পুলিশ বলছে, তারা মামলা তদন্তের দায়িত্ব পায় না। মহাসড়কে থানা ও ফাঁড়ি থাকলেও যেকোন দুর্ঘটনা বা অপরাধের মামলা হয় সংশ্লিষ্ট জেলা থানাগুলোতে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তারা থানার কাজেই বেশি ব্যস্ত থাকেন। যে কারণে তদন্তকারী কর্মকর্তারা হাইওয়ের মামলাগুলোর তদন্ত করার জন্য যথেষ্ট সময় পান না। ফলে আসামিরাও খুব একটা ধরা পড়ে না।

এই মাত্রা পাওয়া