১৩ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সরকারী হাসপাতালে অসন্তোষ, ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা ॥ আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কর্মচারী নিয়োগ

  • কর্মচারীদের মতে, এতে স্থায়ী দক্ষ জনবল সৃষ্টি হবে না ॥ ডিজি বলছেন, এতে চিকিৎসা কার্যক্রমে গতি বাড়বে

নিখিল মানখিন ॥ আউটসোর্সিংয়ের (বেসরকারী প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সরবরাহ) মাধ্যমে কর্মচারী নেয়ায় সরকারী হাসপাতালগুলোতে বিরাজ করছে অসন্তোষ। আউটসোর্সিং ও সরকারী কর্মচারীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে দূরত্ব। পরস্পরের ভুলত্রুটি ধরা এবং কাজে ব্যাঘাত ঘটাতে ব্যস্ত থাকে উভয়পক্ষ। এতে সরকারী হাসপাতালসমূহের স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। আর টেন্ডারের মাধ্যমে অনুমোদনপ্রাপ্ত বেসরকারী প্রতিষ্ঠান সরকারী হাসপাতালগুলোতে কর্মচারী সরবরাহ করে। এভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মচারীরা স্থায়ী নন। ফলে সরকারী হাসপাতালে স্থায়ী দক্ষ জনবল সৃষ্টির পথ বন্ধ হয়েছে। এমন অভিযোগ করেছেন অনেক সরকারী হাসপাতালের কর্মচারী-কর্মকর্তারা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সরকারী হাসপাতালে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী নিয়োগ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। হাসপাতালগুলোতে কর্মচারী সরবরাহ করছে বেসরকারী প্রতিষ্ঠান। আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে এখন এই দুই শ্রেণীর কর্মচারী নেয়া হচ্ছে। নতুন নতুন হাসপাতাল এবং বেশকিছু পুরনো হাসপাতালে ইতোমধ্যে এ পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। টেন্ডারের মাধ্যমে অনুমোদনপ্রাপ্ত বেসরকারী প্রতিষ্ঠান সরকারী হাসপাতালগুলাতে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী সরবরাহ করবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। সরকারী হাসপাতালগুলো দালালমুক্ত, মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ নিয়ন্ত্রণ ও দর্শনার্থীদের নিয়ন্ত্রণ করে স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা বজায় রাখতেই এ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

বিষয়টির সত্যতা স্বীকার করে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডাঃ দীন মোঃ নূরুল হক জনকণ্ঠকে জানান, রাজধানীসহ দেশের নতুন নতুন হাসপাতাল এবং বেশকিছু পুরনো হাসপাতালে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী নেয়ার এ নতুন পদ্ধতির বাস্তবায়ন ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। এতে হাসপাতালগুলোর স্বাভাবিক চিকিৎসা কার্যক্রমে গতি বাড়বে। কোন দুষ্ট চক্র অশুভ উদ্দেশ্যে ঐক্যবদ্ধ হয়ে হাসপাতালের স্বাভাবিক চিকিৎসা কার্যক্রম ব্যাহত করার সুযোগ পাবে না বলে জানান মহাপরিচালক।

সরকারী হাসপাতালে কর্মচারী নেয়ার এই পদ্ধতি চালুর প্রেক্ষাপট তুলে ধরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এরই মধ্যে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ২০০৯ সালের শেষ দিকে কর্মচারী নিয়োগের নামে প্রায় ৯ কোটি টাকার বাণিজ্য হয়েছে। এই নিয়োগে ‘ঘুষবাণিজ্য ও অনিয়ম’ প্রায় সব জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পর ২০১০ সালের ১৫ জানুয়ারি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বাসভবনে জরুরী সভা ডেকে নিয়োগসংক্রান্ত সার্বিক কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। গঠন করা হয় তদন্ত কমিটি। একই বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিক্যালের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় চরম অনিয়ম ও দুর্নীতির কথা উল্লেখ করে তদন্ত কমিটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে রিপোর্ট দাখিল করে। এরপরই মন্ত্রণালয় ওই নিয়োগ বাতিল করে দেয়। কিন্তু দুর্নীতিবাজরা এতই শক্তিশালী ছিল যে তারা নিয়োগ বাতিলের বিরুদ্ধে রিট আবেদন করে প্রায় চার বছর পর অর্থাৎ ২০১৩ সালের ২৭ নবেম্বর ২৮৭ জনকে ঢাকা মেডিক্যালে কাজে যোগদান করাতে বাধ্য করে। সূত্র আরও জানায়, নিয়োগকৃত ২৮৭ জনের মধ্যে অনেকেরই বয়স ৫০ থেকে ৬০ বছরের ওপর ছিল। জাল-জালিয়াতির এই নিয়োগে কোন নিয়মনীতিই মানা হয়নি। যারা নিয়োগের জন্য দরখাস্ত করেননি তারাও নিয়োগ পেয়েছেন। পরে বিষয়টি সামনে রেখেই সরকারী হাসপাতালে এই দুই শ্রেণীর নিয়োগ বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, সরকারী হাসপাতালে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী নিয়োগ বন্ধের আরেক কারণ হচ্ছে তারা কাজ না করলেও তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া যায় না। কারণ তাদের চাকরি বদলিযোগ্য নয়। এছাড়া কর্মচারী ইউনিয়নের কারণে তারা কাউকে তোয়াক্কা করে না।

সম্প্রতি এ বিষয়ে স্বাস্থ্য সচিব সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, সরকারী হাসপাতালে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের সরকারীভাবে নিয়োগ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কর্মচারীর চাহিদা মেটানো হবে। অবসরে যেতে যেতে এক সময় হাসপাতালে চতুর্থ ও তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারী আর থাকবে না বলে জানান স্বাস্থ্য সচিব।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আরও জানায়, সরকারীভাবে আর তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী নিয়োগ দেয়া হবে না। আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে তাদের নিয়োগ দেয়া হবে। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনে ডিসিদের জানিয়ে দেয়া হয়েছে। আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ দেয়া হলে হাসপাতালগুলোতে স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়বে। সরকারী হাসপাতালগুলো তিনটি বিষয়ের ওপর জোর দেয়া হয়েছে। এগুলো হলোÑ দালালমুক্ত, মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ এবং ভিজিটর নিয়ন্ত্রণ করা। দালালদের কারণে সাধারণ মানুষ চিকিৎসাসেবা নিতে এসে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। সরকারী হাসপাতাল থেকে রোগী ভাগিয়ে নেয়া হয় প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিকে। এতে সাধারণ রোগীরা চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হতে হচ্ছে। এদিকে মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভদের জন্য সময় এবং বার নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। এর বাইরে কোন রিপ্রেজেন্টেটিভ চিকিৎসকের কাছে যেতে পারবেন না। এদের কারণে চিকিৎসা কার্যক্রম ব্যাহত হয়। আর হাসপাতালে ভিজিটরের কারণে অনেক সময় চিকিৎসকরা রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিতে পারেন না।

এদিকে, অভিযোগ উঠেছে, আউটসোর্সিংয়ের (বেসরকারী প্রতিষ্ঠান সরবরাহকৃত) মাধ্যমে কর্মচারী নেয়ায় পরবর্তীতে সমস্যায় পড়বে সরকার। টেন্ডারের মাধ্যমে অনুমোদনপ্রাপ্ত বেসরকারী প্রতিষ্ঠান সরকারী হাসপাতালগুলোতে কর্মচারী সরবরাহ করে। জনবল সরবরাহে অনুমোদনপ্রাপ্ত বেসরকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত লাভের বাইরে কাজ করবে না। তারা অনেক সময় ভুয়া সার্টিফিকেট দেখিয়ে অশিক্ষিত ও অদক্ষ কর্মচারী সরবরাহ করে থাকে। আর সরকারীভাবে যে বেতন দেখানো হবে, তার অনেক টাকা কর্মচারীদের দেয়া হয়। কম বেতনে কর্মচারী পাওয়ার চেষ্টা করা হয়। এতে হাসপাতালগুলোতে কর্মচারীদের কাজের মান বজায় থাকবে না। এছাড়া এই পদ্ধতিতে যাদের নিয়োগ দেয়া হবে, তারা কেউ সরকারী হাসপাতালের স্থায়ী কর্মচারী হয়ে থাকবেন না। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অমিল দেখা দিলেই সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদেরও সরিয়ে দেয়া হবে। এতে সরকারী হাসপাতালগুলোতে স্থায়ী দক্ষ জনবল সৃষ্টি হবে না।