২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

গ্রামের বাড়িতে শিশু নীরবের দাফন

গ্রামের বাড়িতে শিশু নীরবের দাফন

স্টাফ রিপোর্টার ॥ পাঁচ বছরের শিশু নীরবের মর্মান্তিক মৃত্যুতে রাজধানীর কদমতলী থানাধীন পালপাড়া ও মাদারীপুরের কালকিনির বনগ্রামে নিহতের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। শত শত মানুষ ভিড় করেছেন নীরবদের ঢাকা ও গ্রামের বাড়িতে। কদমতলীতে বুধবারও এলাকাবাসী বিক্ষোভ করেছেন। ঘটনার জন্য দায়ীদের সর্বোচ্চ শাস্তিও দাবি করা হয়েছে নীরবের পরিবার ও এলাকাবাসীর তরফ থেকে। সকাল থেকেই শত শত মানুষ ভিড় করছিলেন নীরবের পড়ে যাওয়া স্যুয়ারেজের সেই চৌবাচ্চা ও বুড়িগঙ্গা নদী তীরের যেখান থেকে তার লাশ উদ্ধার হয়েছে, সেই জায়গা দুটি দেখার জন্য। অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি এড়াতে জায়গা দুটিতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। বুধবার পর্যন্ত ওয়াসা কর্তৃপক্ষ বা স্যুয়ারেজ লাইন নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের কাউকে ঘটনাস্থলে পাওয়া যায়নি।

এদিকে পানিতে ডুবেই শিশু ইসমাইল হোসেন নীরবের মৃত্যু হয়েছে। নীরবের পেটে ও মাথার ভেতরে পানি জমে ছিল। তবে পড়ার ঠিক কতক্ষণ পর মারা গেছে তা নিশ্চিত করতে পারেননি ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক। তবে চিকিৎসকদের ধারণা পড়ার ১০ থেকে ৩০ মিনিটের মধ্যেই নীরবের মৃত্যু হয়। স্যুয়ারেজ লাইনের পাইপ ভরে বর্জ্য ও পানি প্রচ- গতিতে যাচ্ছে। সেখানে পড়ে যাওয়ায় স্রোতে দ্রুত নীরবকে ভাটির দিকে নিয়ে যায়। পাইপের উপর দিকে কোন ফাঁকা না থাকায় কয়েক মিনিটের মধ্যেই নীরবের মর্মান্তিক মৃত্যু হয় বলে ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকর্মী ও স্থানীয়দের ধারণা। বুধবার রাতে মাদারীপুর জেলার কালকিনির গ্রামের বাড়িতে নীরবকে দাফন করা হয়। এ ঘটনায় নীরবের পরিবারের তরফ থেকে কোন মামলা দায়ের করা হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন নিহতের চাচা সোহরাব আলী। তবে পুলিশের তরফ থেকে একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে।

বুধবার সকালে নীরবের লাশের ময়নাতদন্ত শেষে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান কাজী আবু শামা সাংবাদিকদের জানান, পানিতে ডুবেই নীরবের মৃত্যু হয়েছে। শরীরে গভীর কোন ক্ষত চিহ্ন নেই। শুধু স্যুয়ারেজ লাইনের পানির স্রোতের কারণে পাইপের ভেতর দিয়ে গড়িয়ে যাওয়ায় পেট, কপাল ও মুখে কিছু জখম হয়েছে। মৃত্যুর একঘণ্টা আগে নীরব খেয়েছিল। শিশুটির পেটে নর্দমার কিছু পানিও পাওয়া গেছে। তবে স্যুয়ারেজ লাইনের ভেতরে পড়ার কতক্ষণ পরে শিশুটির মৃত্যু হয়েছে তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে ধারণা করা হচ্ছে, পড়ার ১০ থেকে ৩০ মিনিটের মধ্যেই নীরবের মৃত্যু হয়েছে। নীরবের ময়নাতদন্তকারী চার সদস্যের চিকিৎসক প্রতিনিধি দলে ছিলেন সহকারী অধ্যাপক ডা. এ কে এম শফিউজ্জমান, প্রভাষক ডা. প্রদীপ বিশ্বাস ও প্রভাষক ডা. সোহেল কবির। ময়নাতদন্তের আগে শিশুটির সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন কদমতলী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মফিজুর রহমান। প্রতিবেদনে শিশুটির সারাশরীরে জখমের চিহ্ন রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। ময়নাতদন্ত শেষে নীরবের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পিতা রেজাউল করিম ছেলের লাশ গ্রহণ করেন। পূত্রের লাশ হাতে নিয়েই কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। তার গগণবিদারী আর্তনাদে মেডিক্যালের পরিবেশ ভারি হয়ে আসে। নীরবের পিতা রেজাউল করিম জানান, বেলা ৩টার দিকে খাওয়া-দাওয়ার পর কিছুক্ষণ পড়াশোনা করে। এরপর খেলতে যায় সে। নীরবের চাচা সোহরাব আলী জানান, তাকে মাদারীপুরের কালকিনি থানাধীন বনগ্রামের বাড়িতে পারিবারিক কবরস্থানে দাদা আব্দুল করিমের কবরের পাশে দাফন করা হয়েছে।

শ্যামপুরের স্থানীয় সংসদ সদস্য সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা লাশ প্রথমে শ্যামপুরের বাসায় নেয়ার কথা বলেন। পরে সেখান থেকে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে পাঠানো হয়। দাফন ও অন্যান্য খরচের জন্য জেলা প্রশাসনের তরফ থেকে নগদ ২০ হাজার টাকা দেয়া হয়েছে। ডিএমপির ওয়ারী বিভাগের উপ-কমিশনার সৈয়দ নুরুল ইসলাম জানান, লাশ দাফনের পর শিশুটির পিতার সঙ্গে আলোচনাসাপেক্ষে মামলা দায়েরের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে।

মঙ্গলবার বিকেল চারটার দিকে রাজধানীর কদমতলী থানাধীন শ্যামপুরের নতুন কদমতলী এলাকার পালপাড়ায় ঘটনাটি ঘটে। নীরবের পিতা রেজাউল করিম নারায়ণগঞ্জ জেলার গাউছিয়াতে আরএফএল কোম্পানিতে চাকরি করেন। একমাত্র পূত্র নীরব। আর স্ত্রী নাজমা বেগম (২৭)। মাসিক ৩ হাজার টাকা ভাড়ায় পালপাড়ার সুরুজ মিয়ার ৭৮ নম্বর একতলা টিনশেড বাড়ির একটি কক্ষে ২ বছর যাবত বসবাস করছে পরিবারটি।

বাড়ির সামনেই ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ যাতায়াতের রেললাইন ঘেঁষা ছোট্ট খালের পাড়ে ত্রিভোজ আকৃতির একটি খেলার মাঠ। খালের পাড় দিয়ে ওয়াসার স্যুয়ারেজ লাইন। নতুন তৈরি করা লাইনে প্রায় ১৫ ফুট পর পর দুইটি চৌবাচ্চা। প্রথমটির ঢাকনা রয়েছে। নীরবদের বাসার কাছের চৌবাচ্চাটির অর্ধেক সিমেন্টের পাটাতন দিয়ে ঢাকা। বাকি প্রায় আড়াই ফুটের মতো ফাঁকা। সেখানে কোন ঢাকনা নেই।

বিকেলে প্রতিদিনের মতো নীবর পাশের বাড়ির সমবয়সী বন্ধু হৃদয় ও রাতুলের সঙ্গে সেই মাঠে দৌড়াদৌড়ি করছিল। একপর্যায়ে সে স্যুয়ারেজ লাইনে পড়ে যায়। স্যুয়ারেজ লাইনের ভেতরে প্রচ- গতিতে বর্জ্য ও বিভিন্ন কারখানার পানি যায়। এসব পানি ও বর্জ্য গিয়ে পড়ে বুড়িগঙ্গা নদীতে। প্রচুর স্রোতের কারণে নীরব আর পড়ে দাঁড়াতেই পারেনি। স্রোতের টানে পাইপের ভেতরে চলে যায় সে। ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকর্মীরা ভাটির দিকের ১০টি স্যুয়ারেজ লাইনের ইস্পাতের ঢাকনা কেঁটে নীরবকে উদ্ধারের চেষ্টা চালায়। কিন্তু নীরবের কোন হদিসই পায়নি। শেষ পর্যন্ত রাত ৮টা ২০ মিনিটে ঘটনাস্থল থেকে অন্তত এক কিলোমিটার ভাটির দিকে শ্যামপুর ইকোপার্ক এলাকায় বুড়িগঙ্গা নদীর তীর থেকে নীরবের লাশ উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরিরা। লাশটি স্যুয়ারেজ লাইনের শেষপ্রান্তের কাছেই বুড়িগঙ্গা নদীর তীর ঘেঁষে থাকা একটি বালু উত্তোলনকারী ড্রেজারের পাখায় আটকে ছিল। যেখান থেকে নীরবের লাশ উদ্ধার হয়, সেখানে গিয়ে স্যুয়ারেজ লাইনটি বুড়িগঙ্গা নদীর সঙ্গে মিশেছে। রাতেই লাশটি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে পাঠানো হয়।