২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

যে নাট্যোৎসব তরুণদের

  • শেখ জাহিদ আজিম

মানুষ মাত্রই নিজেকে জাহির করতে ভালবাসে। শিল্পীর ক্ষেত্রে কথাটি আরও প্রবল। বিশেষত শিল্পী যদি হন নাটকের মানুষ, তবে তো কথাই নেই। কেননা নাটক মানেই প্রকাশ। তা জলজ্যান্ত দর্শক সম্মুখে। আর এই দর্শকের সম্মুখে নাটক উপস্থাপনের ক্ষেত্রে কিছু নাটকপ্রাণ মানুষের দরকার হয়। যাদের নাট্যভাষায় বিভিন্ন অভিধা দিয়ে থাকে। যারা অভিনেতা, ডিজাইনার, পোশাক-পরিকল্পক, নির্দেশক প্রভৃতি নামে পরিচিত। তবে এক কথায় বলতে গেলে নাট্যশিল্পী। আর বাংলাদেশে এ রকম নাট্যশিল্পী তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগ, অধুনা থিয়েটার এ্যান্ড পারফর্মেন্স স্টাডিজ বিভাগ নামে পরিচিত। যেহেতু প্রকাশের মধ্য দিয়েই নাটক ও নাট্যশিল্পীর পূর্ণতা। তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার এ্যান্ড পারফর্মেন্স স্টাডিজ বিভাগ গত দুই দশক ধরে সেই কাজটিই করে আসছে, বছরের বিভিন্ন সময় নাট্য মঞ্চায়নের মাধ্যমে। তবে গত দশ বছর ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) মিলনায়তনে কেন্দ্রীয় বার্ষিক নাট্যোৎসব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রতিবছরের ন্যায় এ বছরও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টাডিজ থিয়েটার এ্যান্ড পারফর্মেন্স বিভাগের প্রযোজনায় ৩-৮ ডিসেম্বর ১০ম কেন্দ্রীয় বার্ষিক নাট্যোৎসব অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। এ উৎসবের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হচ্ছে- এখানে প্রত্যেকটি নাটকের কুশীলবরা থিয়েটার এ্যান্ড পারফর্মেন্স স্টাডিজ বিভাগের নাট্য-শিক্ষার্থী। এবং প্রত্যেকটি নাটকের নির্দেশক স্নাতক শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। যারা বয়সে তরুণ মেধায় ধারালো। সবেমাত্র বৃহত্তর নাট্য জগতে পদার্পণ করতে যাচ্ছে। যার প্রথম পদক্ষেপই যেন এই নাট্যনির্দেশনা। যার মাধ্যমে নিজেকে জাহির করতে পারছে, নতুন পরিচয় দিয়ে তা হলো নাট্যনির্দেশক। হয়ত তার এই নির্দেশিত নাটকের পথ ধরেই ভবিষ্যতে দেশ তথা আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নাট্যব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠবে। জানা গেল এ বছর ১০ম কেন্দ্রীয় বার্ষিক নাট্যোৎসবে মোট সাতজন তরুণ নাট্য নির্দেশকের নাটক নিয়ে উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। নির্দেশকরা হচ্ছেন, কামরুল ইসলাম মারুফ, নাজমুল হুদা সাকির, সাইমা ফারজানা, সওগাতুল ইসলাম হিমেল, শাহারুল ইসলাম কাজল, ইশতিয়াক খান পাঠান এবং ধীমান চন্দ্র বর্মণ। তাদের নির্দেশিত সাতটি নাটক বিভাগীয় বাছাই প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে নির্বাচিত। উৎসবের নাটকগুলো হচ্ছে- ভস্ম, ডেথনক্স, কালের যাপনরঙ্গ, ৪.৪৮ সাইকোসিস, দ্য বেন্ট, ক্রেভ এ্যান্ড নট ক্রেভ এবং ব্রাত্য। এই সাতটি নাটক বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ২৪ জন শিক্ষার্থীদের নির্দেশিত ২৪টি নাটক থেকে নেয়া হয়েছে। যদিও প্রতিবছর প্রত্যেক শিক্ষার্থী নির্দেশকের নাটকই এই বার্ষিক নাট্যোৎসবে স্থান পায়। যার মাধ্যমে তরুণ নির্দেশকরা সাধারণ দর্শকের সঙ্গে পরিচিত হতে পারে। কিন্তু এ বছর নাটকের মানের দোহাই দিয়ে সাতটি নাটক বাছাই করে দর্শকের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে। এ জন্য অবশ্য বাদপড়া নাটকের বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী নাখোশ। তাদের অভিব্যক্তি তারা দর্শকের সামনে নিজের সৃষ্ট নাটকের মঞ্চায়ন না করতে পারায় তারা বুঝতে পারল না সাধারণ দর্শক প্রতিক্রিয়া এবং শিল্পী বঞ্চিত হলো তার সৃষ্ট শিল্পের প্রকাশ আনন্দ থেকে। তবে এটাও সত্য যে, অনেক নির্দেশকের নাটকই বিভিন্ন অসঙ্গতির কারণে যথার্থ মান অর্জন করতে ব্যর্থ হয়। যা বিভাগীয় দুর্নাম বয়ে আনে বলে অভিমত একজন তরুণ নির্দেশকের যার নাটক এই উৎসবে স্থান পেয়েছে। তবে অনেকের ভাষ্য মতে, এই নাটক বাছাই করাতে উৎসবে কিছুটা হলেও প্রভাব পড়েছে যার দরুন বিভাগীয় অনেক শিক্ষার্থী প্রাণোচ্ছল অংশগ্রহণ করেনি। কিন্তু এতে থিয়েটার এ্যান্ড পারফর্মেন্স স্টাডিজ বিভাগের উৎসবের কোন সমস্যা হয়নি।

কেননা প্রতিদিনই উৎসবে বিপুল পরিমাণ দর্শকের সমাগম হয়েছে। উৎসব হয়েছে শতভাগ সফল। এই উৎসবের মধ্যদিয়ে শিখল যেমন বিভাগীয় শিক্ষার্থীরা তেমনি সাধারণ দর্শকরা জানতে পারল বিভিন্ন আঙ্গিক ও রীতির নাটক সম্পর্কে, পেল নাট্যরসের বিভিন্ন স্বাদ। কারণ এ উৎসবে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন আঙ্গিকের নাটক মঞ্চায়িত হয়েছে। এমনকি মঞ্চায়িত নাটকগুলোর মধ্যে ‘ভস্ম’ নাটকটির নির্দেশনা দিয়েছেন কামরুল ইসলাম মারুফ যে নিজেই নাটকটির রচয়িতা। যা সৃজনশীল নাট্যকর্মীর সম্ভাবনার কথা বলে। ১০ম কেন্দ্রীয় বার্ষিক নাট্যোৎসব সম্পর্কে জানতে চাইলে থিয়েটার এ্যান্ড পারফর্মেন্স স্টাডিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আহমেদুল কবির বলেন, ‘আমাদের প্রচেষ্টা হচ্ছে- বিভাগের শিক্ষার্থীদের নাট্যবিষয়ক তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক শিক্ষাদানের মাধ্যমে একজন নাট্যকর্মী তথা সঠিক মানুষ হিসেবে প্রস্তুত করা। আর এই নাট্যোৎসব হচ্ছে- তারই প্রতিফলন।’ অর্থাৎ নাটকের মাধ্যমে মানুষের মানবিক গুণাবলীর যে যথার্থ প্রকাশ ঘটে তা প্রতিটি নাটকই জানান দেয়। যা উৎসবের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। সর্বোপরি এ নাট্যোৎসব ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণের উৎসব, যার মাধ্যমে সাধারণ শিক্ষার্থী যেমন পায় শিল্পরসের স্বাদ তেমনি পায় একজন রুচিশীল মানুষ হয়ে উঠার অনুপ্রেরণা। তাই বেঁচে থাক নাট্যোৎসব, বেঁচে থাক তরুণ নির্দেশকদের নাট্যনির্মাণের চেতনা। যে চেতনার পথ ধরে বাংলাদেশ সামনে এগিয়ে যাবে, একটি সংস্কৃতি-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ হিসেবে প্রকাশ পাবে সারা দুনিয়ায়, এমনি প্রত্যাশা এই বিজয়ের মাসে।