১৬ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সমাজে দক্ষতা

  • ওয়াহিদ নবি

বিলাতে লেখাপড়া করার সময় একবার দেশে এলে বাবার সঙ্গে দেশ সম্পর্কে আলোচনা হচ্ছিল। এক পর্যায়ে বিরক্তির সঙ্গে তিনি বলেছিলেন, ‘সবাই শুধু আমাদের দুর্নীতির কথাই বলে কিন্তু আমাদের যে তার চেয়েও বড় সমস্যা আছে সে কথা কেউ বলে না। অযোগ্যতা আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা।’ ৩ ডিসেম্বর সম্পাদকীয় পাতায় স্বদেশ রায়ের লেখা পড়ে বাবার কথা মনে পড়ে। সমাজের সব সমান তালে চলে না। স্বাধীনতার পর আমাদের অনেক কিছুই ভাল হয়েছে। সঙ্গীত এখন বহুল প্রচারিত। আগে পাকিস্তানের টেস্ট দলে কোন বাঙালী স্থান পেত না। এখন বাংলাদেশ নিজেই একটা টেস্ট দল। মধ্যবিত্তদের পরিবারে সন্তান সংখ্যা সীমিত। সংবাদপত্রের সংখ্যা স্বাধীনতার পরে বহুগুণ বেড়েছে। কিন্তু সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গুণগত মান বেড়েছে কি সব কিছুর?

স্বদেশ রায় শিক্ষার মানের কথা বলেছেন। এটা আমাদের দুশ্চিন্তার বড় কারণ। পাসের হার বাড়া আর গুণগতমান বাড়া এক নয়। শিক্ষার মান কমে গেলে সমাজের সব কিছুর মান কমে যাবে। দক্ষতা কর্পূরের মতো উবে যাবে সমাজ থেকে। মনে হয় শিক্ষাটা একটা পণ্যদ্রব্যে পরিণত হয়েছে। ব্যাঙের ছাতার মতো বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠছে। প্রাইভেট টিউশনের জয়জয়কার। প্রতিবছর প্রশ্নপত্র ফাঁস। অর্থবানরা বিদ্যার নামে সার্টিফিকেট কিনে নিচ্ছে। এরা সমাজের পরিচালক হবে। ভবিষ্যত প্রজন্ম এসব ‘সফল মানুষদের’ মডেল হিসেবে গ্রহণ করবে।

দক্ষতা অর্জনের জন্য প্রয়োজন মেধা, পরিশ্রম ও অধ্যবসায়। আমাদের সমাজে পরিশ্রম ও অধ্যবসায়কে সম্মানের চোখে দেখা হয় না। আমি অনেককেই বলতে শুনেছি আমার ছেলে বেশি পড়াশোনা করে না কিন্তু রেজাল্ট ভাল করে। অর্থাৎ মেধা জাতীয় একটা আধা বোঝা ধারণাকে বেশি সম্মান দেয়া হয়। সমাজের বিভিন্ন পরিবেশ দক্ষতা অর্জনে অন্তরায় আবার দক্ষতার অভাব বিভিন্ন দূষিত পরিবেশ সৃষ্টি করছে। এসব নিয়ে আলোচনা হওয়া বাঞ্ছনীয়। এখানে আমাদের বড় সমস্যা রয়েছে। আমাদের সমাজে আলোচনা জিনিসটা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। মনে হয় আমাদের রাগ জিনিসটা বেড়ে গেছে। যদি কোথাও মত না মেলে আমরা ক্ষেপে যাই। এমন অভ্যাস দূর করতে না পারলে আমাদের সমূহ সর্বনাশ। আমাদের সাধারণ মানুষদের এসব অনাকাক্সিক্ষত আচরণ প্রতিফলিত হয় ব্লগার হত্যায়। প্রতিফলিত হয় জাতির সর্বস্তরে কুরু পাণ্ডব মনোভাবে।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ‘গভর্নেন্স অব চায়না’ নামে গত বছর একটি বই লিখেছেন। তিনি লিখেছেন, সমাজে দারিদ্র্য নয় বৈষম্য আগ্রাসনের কারণ। স্বাধীনতার পরে বৈষম্য আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। কেউ কেউ রকেটের গতিতে ধনী হয়েছেন। এদের মনোবৃত্তি অস্বাস্থ্যকর। এদের কার্যকলাপ সমাজের জন্য ক্ষতিকর।

বদরুদ্দিন উমর এক প্রবন্ধে লিখেছিলেন, নিজের দেশকে নিজের দেশ বলে গ্রহণ করতে না পারলে জাতির জীবনে যে দুর্ভোগ নেমে আসে সেই দুর্ভোগ আমরা এড়াতে পারিনি। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কথা এটি। একটি প্রবন্ধে তিনি বিস্তারিত আলোচনা করতে পারেননি তবে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। এখানে আর একটি কথা মনে আসছে আর সেটি হচ্ছে যে পণ্ডিত ব্যক্তিদের সব কথার সঙ্গে আমরা একমত না হতে পারি তবে সেজন্য তাঁদের সব কথা কে আমরা যেন অবজ্ঞা না করি। নেহেরু তাঁর বইতে লেনিনের পাণ্ডিত্য সম্বন্ধে লিখতে গিয়ে লিখেছেন লেনিন বিরুদ্ধবাদীদের লেখা মনোযোগ সহকারে পড়তেন। বিখ্যাত আইরিশ লেখক সি, এস, লুইস তাঁর ‘ফোর লাভস’ বইতে লিখেছিলেন যে আমরা অবশ্যই আমাদের মাতৃভূমি নিয়ে গর্বিত কিন্তু এটা ঠিক যে আমাদের মাতৃভূমির ইতিহাসের সবকিছুই গৌরবের নয়। আমাদের ইতিহাসের এসব অংশ কেউ উল্লেখ করলে আমরা যেন রেগে না যাই। রমেশ চন্দ্র মজুমদারের মহামূল্যবান গ্রন্থ প্রাচীন, মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগের বাংলার ইতিহাস আমাদের অমূল্য জ্ঞান দান করে। কোন কোন ঐতিহাসিক সত্য যদি আমাদের ক্রোধের সঞ্চার করে তবে আমাদের বুঝতে হবে যে আমরা মানসিকভাবে যথেষ্ট পরিপক্ব হইনি। স্বদেশ বাবু ‘জ্ঞানভিত্তিক দক্ষতার’ কথা বলেছেন। এখানে আমাদের কমতির কারণ বুঝতে গেলে উইলিয়াম হান্টারের বই ‘দি ইন্ডিয়ান মুসলমান’ সাহায্য করবে। ঐতিহাসিক সত্য আমাদের বুঝতে হবে। ঐতিহাসিক সত্য আমাদের গ্রহণ করতে হবে। রেগে গেলে চলবে না। যদি আমাদের ঐতিহাসিক দুর্বলতা আমরা দূর না করি তবে আমরা দুর্বল থেকে যাব। আমাদের একটি সমস্যা হচ্ছে যে আমরা ধর্ম আর জাতীয়তা এই দুটি বিষয়কে এক করে একটা জগাখিচুড়ি তৈরি করে ফেলেছি। জাতীয়তা সম্পর্কে জানতে রেনারের মহামূল্যবান প্রবন্ধ আমাদের সাহায্য করবে। রবীন্দ্রনাথ ‘নেশন’ নামে যে প্রবন্ধ লিখেছিলেন তার ভিত্তি রেনারের প্রবন্ধ। আমরা ধর্ম আর জাতীয়তাবাদ সম্বন্ধে পরিষ্কার না হওয়ায় স্বার্থবাদী মহল আমাদের বিভ্রান্ত করেছে।

আমাদের প্রতারিত করেছে এবং এখনও প্রতারিত করেই চলেছে। মধ্যযুগে সৈয়দ সুলতান, বদিউদ্দিন প্রমুখের কবিতা পড়লেই আমরা বুঝতে পারব স্বার্থান্বেষীরা ধর্মের নামে ভাষা সম্বন্ধে আমাদের কত বিভ্রান্ত করেছে। এসবের একটি পরিণতি হচ্ছে এই যে আমাদের ইহকাল আর পরকালের সম্পর্কটাকে আমরা গুলিয়ে ফেলেছি। আমাদের ইহকালের কর্ম যে পরকালের ফলাফলের ভিত্তি এটা আমরা বুঝতে চাই না। ইহকালকে অবজ্ঞা করে এবং কোন কোন ক্ষেত্রে ইহকালে অন্যায় কাজ করে পরকালের জন্য মূর্খ ব্যক্তিদের প্রেসক্রিপশন অনুসরণ করি। এর একটা ফল হচ্ছে প্রকৃত জ্ঞান অর্জনে আমাদের অনীহা।

জ্ঞান অর্জনে ভাষার ভূমিকার কথা উল্লেখ করেছেন স্বদেশ বাবু। অবশ্যই যে যত বেশি ভাষা শিখবে সে তত জ্ঞানী হবে। তবে এ ব্যাপারে আমাদের বাস্তববাদী হতে হবে। যারা বিজ্ঞান পড়বে তাদের পক্ষে কয়টা ভাষা শেখা সম্ভব এটা আমাদের ভেবে দেখতে হবে। মাতৃভাষা অবশ্যই শিখতে হবে। আমাদের বাস্তবতায় ইংরেজী খুব ভাল করে শিখতে হবে। মানসিক ব্যাধির সবচেয়ে বড় পরীক্ষার পরীক্ষক হিসেবে দেখেছি যে আমার সহকর্মীরা যেসব পরীক্ষার্থী ভাষা সুন্দর করে বলে তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল। আমি বাংলাদেশের টিভির অনেক প্রোগ্রামে দেখি যে অংশগ্রহণকারী বাংলা ইংরেজী মিশিয়ে কথা বলেন। আমি তখন ভাবি এদের চিন্তাধারা পরিষ্কার নয়। আমার ভুল হতে পারে কিন্তু আমি তাই ভাবি।

আমাদের স্বতঃস্ফূর্ত শ্রদ্ধা কার প্রতি এই কথা আমাদের মনোভাবকে জানিয়ে দেয়। তাই আমাদের এ সম্বন্ধে ভাবা উচিত। মহাপুরুষরা কোন দেশেই ঘন ঘন আসেন না। রাজা রামমোহন রায় ছিলেন মহামানব। “নিজের হতভাগ্য দেশের দিকে চাহিয়া এমন কাজ নাই যাহা তিনি করেন নাই” কবিগুরুর এই উক্তিই বুঝিয়ে দেয় রামমোহন রায় কত বড় ছিলেন। ইংরেজ সরকার হিন্দু ধর্ম শিক্ষার জন্য একটি প্রতিষ্ঠান গড়তে চায়। দূরদর্শী রামমোহন গভর্নর জেনারেলের কাছে প্রতিবাদ করে চিঠি লিখেন। তিনি লিখেন আমরা শিখতে চাই বিজ্ঞান দর্শন ইত্যাদি আধুনিক বিষয়।

আমি চীনে দেখেছি সেদেশের জাতির পিতা সান ইয়েত সেনকে কত সম্মান দেখানো হয়। কিউবাতে দেখেছি জাতির পিতা জোশে মার্টিকে কত সম্মান দেখানো হয়। অথচ এঁরা কমিউনিস্ট নন। পার্শ্ববর্তী ভারতে গান্ধীর সম্মানে বিশাল স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়েছে। আর আমরা কি করেছি বা কি করছি? বিলাতে আমাদের বাংলাদেশের জাতির পিতার একটা মূর্তি স্থাপনের কথা ছিল। একটি রাজনৈতিক দলের চলমান বিক্ষোভের ফলে সেটি হয়নি। আসলে অন্যকে অসম্মান করে ভাল নজির স্থাপন করা যায় না।

আমাদের অজ্ঞানতার দুটি উদাহরণ দিয়ে শেষ করব। আমি স্বদেশ রায়কে বাবু বলে সম্বোধন করছি কারণ তিনি হিন্দু ধর্মাবলম্বী। এখন বাবু শব্দটির অর্থ ও উৎপত্তি সম্বন্ধে ভাবা যাক। ‘বা’ কথাটির অর্থ ‘সঙ্গে’। আর ‘বু’ কথাটির অর্থ হচ্ছে ‘সুগন্ধ’। আগেকার দিনে মুসলমান রাজদরবারে যে সকল মুসলমান অমাত্যবর্গ থাকতেন তাঁরা আতর ব্যবহার করতেন। এই জন্য তাঁদের ‘বাবু’ বলা হতো। সেই বাবু কথাটি আজ কিভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে! গরুর মাংস খাওয়া নিয়ে আবেগের শেষ নেই। এমনকি খুনোখুনি। রাহুল সংকৃত্তায়নের বিখ্যাত বই ‘ভল্গা থেকে গংগা’তে বেদের উদ্ধৃতি দিয়ে উল্লেখ করা আছে যে আগেকার দিনে কোন হিন্দু রাজার মান্যগণ্য অতিথি এলে তাকে কচি গরুর মাংস খাইয়ে আপ্যায়ন করা হতো।

লেখক : রয়াল কলেজ অব

সাইকিয়াট্রিস্টের একজন ফেলো