২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ছেলেবেলা ও ছাত্রজীবন

  • আবুল মাল আবদুল মুহিত

ঢাকায় ছাত্রজীবনের আরও কথা

(৯ ডিসেম্বরের পর)

ক্স আমাদের পরীক্ষা যখন চলছে সেই সময় ঢাকা শহরে বিংশ শতাব্দীর সম্ভবত সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। বিভিন্ন এলাকায় রাস্তাঘাটে কয়েক ফিট পানি জমে যায় এবং অনেক ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক টার্নারের আগ্রহে একটি ত্রাণ কমিটি গঠিত হয়। আমাদের পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরেই আমরা ত্রাণকার্যে লিপ্ত হই। আমাকে এই উদ্যোগে স্বেচ্ছাসেবীদের সমন্বয়কের দায়িত্ব দেয়া হয়। আমি ১১ আগস্ট রামকৃষ্ণ মিশন, নারীশিক্ষা মন্দির এবং নারায়ণগঞ্জে ত্রাণকার্য দেখতে যাই এবং ১২ তারিখে বিশ্ববিদ্যালয় স্বেচ্ছাসেবী দলের কার্যক্রম শুরু করি। আমরা ঠিক করলাম যে, আমাদের কাজটি হবে খুব নির্দিষ্ট। সাধারণত বন্যার পরপরই কলেরা-মহামারী যখন ঘটবে এই মহামারীকে কি করে প্রতিরোধ করা যায় সেইটি বিবেচনা করে আমরা ঠিক করলাম যে, সবাই ইনজেকশন দেয়ার প্রশিক্ষণ নেব। ঢাকার অধিবাসীদের অনুরোধ না-হয় কোন কোন ক্ষেত্রে জোর করে ইনজেকশন দেব। আমাদের স্বেচ্ছাসেবী দলে ছাত্রীরাও যোগ দিলেন। ঢাকা পৌরসভার স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তা ড. আহমেদ ইনজেকশন কিভাবে দিতে হয় সে সম্বন্ধে ১২ আগস্ট পৌরভবনে তার দফতরে প্রশিক্ষণ দিলেন। আমার ডায়েরিতে আছে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন সহপাঠী ফজলে বারী মালিক, অর্থনীতির মোজাম্মেল হোসেন, আমার সমসাময়িক পদার্থ বিজ্ঞানের জহুরুল ইসলাম, রাজনীতি বিভাগের বাদল সরকার, পদার্থ বিভাগের মোহাম্মদ আহসান, সমসাময়িক রাজনীতি বিভাগের ছাত্র মোকাম্মেল হক, সম্ভবত আবদুল মান্নান শিকদার এবং দু’জন ছাত্রী ঢাকার খালেদা ফেন্সী খানম এবং পাবনার রোজী বেগম। পরের দু’দিনে আমাদের দল আরও ভারি হয়ে যায়। তাতে যোগ দেয় পদার্থ বিভাগের শামসুজ্জোহা, রসায়ন বিভাগের মোয়াজ্জেম হোসেন, মৃত্তিকা বিভাগের সিরাজ হোসেন খান এবং রসায়ন বিভাগের আশরাফুল হক। আমরা পরের দিনই কাজ শুরু করলাম। সেদিন সম্ভবত লালবাগে কার্যক্রম শুরু করি এবং পরের দিন নাজিমুদ্দিন রোডে চলে যাই, যেখানে বিশেষ করে সাত রওজায় কোমর অথবা বুক পর্যন্ত পানি ছিল। আমরা একদিকে যেমন রাস্তাঘাটের লোকজনকে ইনজেকশন দিতে শুরু করলাম, ঠিক তেমনি ঘরে ঘরে গিয়েও ইনজেকশন দিতে লাগলাম। এই কার্যক্রম প্রায় বিশদিন বহাল রাখি। আমাদের স্বেচ্ছাসেবী দলও আস্তে আস্তে ভারি হতে থাকে। আমি এই স্বেচ্ছাসেবীদের একটি ফর্দ এক সময় তৈরি করতে সচেষ্ট হই। তাতে প্রায় ৭০ জনের নাম আছে, যেটি আমি এই অধ্যায় শেষে সংযোজন করেছি।

ক্স ঢাকা শহরে ত্রাণ কাজ যখন প্রায় শেষ হয়ে এলো তখন আমাদের শিক্ষক সৈয়দ আলী আশরাফ বললেন যে, ঢাকার বাইরেও আমাদের কার্যক্রম পরিচালনার চিন্তা-ভাবনা করতে পারি। তদনুযায়ী আমরা দুটি গ্রামে কিছুদিন কাজ করি। তার একটি হচ্ছে আগলা এবং অন্যটি হচ্ছে পারিল নওয়াদা। আগলায় আমরা অধ্যাপক আশরাফ স্যারের চাচার বাড়িতে ক্যাম্প করে ইনজেকশন দেয়া ছাড়াও কিছু ওষুধপত্র, চাল, ডাল ও লবণও বিতরণ করি। পারিল নওয়াদায় আমার সহপাঠী ডোরা মজিদের আব্বা পূর্ববাংলা সরকারে উচ্চপদস্থ কর্মচারী মোল্লা আবদুল মজিদের শ্বশুরবাড়িতে আস্তানা স্থাপন করে একই কাজ করি।

ক্স এ বছর জুলাই-আগস্টে আমার ¯œাতক (সম্মান) পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় এবং আমি তাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম মেধাবী ছাত্র হিসেবে সম্মানিত হই। আমাদের সঙ্গে রসায়ন শাস্ত্রের ছাত্র মোঃ ওমর আলী সকল ¯œাতক পরীক্ষার্থীর মধ্যে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে কালি নারায়ণ বৃত্তি লাভ করেন। কালি নারায়ণ বৃত্তির প্রায় সমান অন্য বৃত্তিটি আমি পাই। আমি বিজ্ঞান ছাড়া অন্য দুটি অনুষদ, কলা ও বাণিজ্য, সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে বিএ ¯œাতক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হই। ইংরেজীর ৮টি পরীক্ষায় পাই ৬২ শতাংশের বেশি এবং অর্থনীতি ও দর্শনের দুটি পরীক্ষায় পাই প্রায় ৭০ শতাংশ নম্বর।

ক্স বছরের শেষদিকে ৯ ডিসেম্বর সলিমুল্লাহ হলে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খানকে দেয়া হয় আজীবন সম্মাননা। তিনি একটি সন্ধ্যা প্রায় মধ্যরাত পর্যন্ত সব রকম বাদ্যযন্ত্রে তার দক্ষতার পরিচয় দিলেন। তিনি ছিলেন সারঙ্গীর আবিষ্কারক। তবলায় তার দক্ষতা দর্শকদের বিমোহিত করে।

ক্স ২৪ অক্টোবর মৃতপ্রায় বড়লাট তার জীবনের সবচেয়ে বড় অপকর্ম সাধন করেন এবং পাকিস্তান রাষ্ট্রটির ধ্বংস প্রক্রিয়ার সূচনা করেন। তিনি বেআইনীভাবে গোটা গণপরিষদটিই ভেঙ্গে দেন। তিনি দাবি করেন সংসদটি নিজেদের মেয়াদ বাড়িয়েই চলছে অথচ দেশের সংবিধান ছয় বছরেও প্রণয়ন করতে ব্যর্থ হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো যে, প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী বগুড়া কিন্তু তখন সংবিধানটি প্রণয়ন শেষ করে নিয়ে এসেছিলেন এবং ১৫ অক্টোবর তা ছাপাখানায় পাঠানো হয়। ২৫ ডিসেম্বর সংবিধান দিবস হিসেবে নির্ধারিতও হয়। গোলাম মোহাম্মদ এই সংবিধানটি গ্রহণ করতে প্রস্তুত ছিলেন না বলেই ভুয়া অজুহাতে গণপরিষদ ভেঙ্গে দেন। গণপরিষদ ভেঙ্গে দিয়ে কিন্তু মোহাম্মদ আলীকেই পুনরায় প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত করলেন এবং নিজের পছন্দমতো আরও কিছু নতুন মুখ নিয়োগ দিলেন। যেমন- কলকাতার নামকরা ব্যবসায়ী মীর্জা আহমদ হাসান ইস্পাহানী, প্রতিরক্ষা সচিব মেজর জেনারেল ইসকন্দর মীর্জা, সীমান্ত গান্ধী খান আবদুল গাফ্্ফার খান, সিন্ধু প্রদেশের নেতা গোলাম আলী তালপুর এবং বোম্বাই থেকে মহাজের হাজী ইব্রাহিম রহিমতুল্লাহ। কিছুদিন পর আরও কয়েকজন এই মন্ত্রিসভায় যোগ দেন। চলবে...