২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জঙ্গীদের বিরুদ্ধে সঠিক পদক্ষেপ জরুরী

  • মমতাজ লতিফ

আইএসকে রুখতে বিমান হামলা শুরু করেছে রাশিয়া। ইতোমধ্যে আইএসের প্রধান ঘাঁটিগুলো ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্তু ও ধ্বংস হয়েছে। হামলায় বিপুলসংখ্যক আইএস যোদ্ধা প্রাণ হারিয়েছে! এর আগে, তুর্কী আর্মি যুদ্ধ করেছে তুর্কী ও সিরিয়া কুর্দীদের বিরুদ্ধে। ওদিকে ইরাকী জঙ্গীগোষ্ঠী যুদ্ধ করেছে শিয়া সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে এবং সিরিয়ার আসাদবিরোধী গোষ্ঠী যুদ্ধ করেছে আসাদের বিরুদ্ধে! এর মধ্যে পাশ্চাত্য দেশগুলো প্রত্যক্ষভাবে আইএস দমনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেনি, বরং তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদ ছিল আসাদবিরোধী শক্তিগুলোর প্রতি। বিশেষ করে অস্ত্র প্রশিক্ষণ দিয়ে সিরিয়ায় আসাদকে সাদ্দাম হোসেন ও গাদ্দাফির মতো উৎখাত করে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের তেল সম্পদের ওপর স্থায়ী কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠাই তাদের প্রধান লক্ষ্য। যা সম্প্রতি সংঘটিত দু’টি ঘটনায় পাশ্চাত্যের এই পরিকল্পনাকে আকস্মিকভাবে বিশাল সঙ্কটের মুখে ফেলে দিয়েছে! প্রথমটি, রাশিয়ার জোরালোভাবে তার ওপর ইউরোপ আরোপিত অর্থনৈতিক অবরোধ সত্ত্বেও সিরিয়ায় আইএস অবস্থানে হামলা শুরু করা। দ্বিতীয়টি, বিশ্বযুদ্ধে হিটলার ও নাজিবাহিনীর বিরুদ্ধে যেভাবে স্ট্যালিনের সোভিয়েত রাশিয়া লেনিনগ্রাডের যুদ্ধে মিত্রবাহিনী গঠন করে প্রতিরোধ গড়েছিলো, একই রকম পন্থায় রাশিয়া একাই জঙ্গী আইএসকে উৎখাত করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ গ্রহণ।

অন্যদিকে সিরিয়া থেকে তুরস্ক হয়ে ইতালির দ্বীপ পার হচ্ছে গৃহহারা, যুদ্ধাক্রান্ত মাতৃভূমিতে যে পরিস্থিতি লাখ লাখ মানুষের মৃত্যুর পর আরও লাখ লাখজনকে ইউরোপে অভিবাসী হতে বাধ্য করছে, তখন একটি আশঙ্কা আমাদের মতো সাধারণ জনকেও চিন্তিত করেছিল যে, এই লাখ লাখ মানুষের মধ্যে আইএস যোদ্ধারা ইউরোপ ঢুকে পড়ছে কি? তাদের চিহ্নিত করার কোন কৌশলের কথা ইউরোপের উন্নত দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কি ভেবেছে? বিশেষত যখন ফ্রান্স যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আইএসবিরোধী বিমান হামলার কথা প্রচার করেছিল। যদিও রাশিয়ান বিমান হামলার আগে এদের বাস্তবে আইএসের আস্তানার ওপর হামলা করতে দেখা যায়নি। বরং এরা আসাদের সেনাবাহিনীর ওপর হামলা করছিল বলে আসাদ এবং রাশিয়ার অভিযোগ ছিল! কুর্দী বাহিনী রাশিয়ার বিমান হামলার সহায়তায় আইএস অধিকৃত আলেপ্পোর বড় একটি বন্দর শিনজার পুনর্দখল করেছে।

ফ্রান্সে হামলার কথাই ধরা যাক। আইএস ইউরোপ থেকে বহু দূরে ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে, এটা কি ইউরোপকে অসতর্ক রেখেছিল? এত উন্নত প্রযুক্তির দেশে ছয়টি স্থানে হামলা হবার কোন আগাম তথ্য গোয়েন্দারা পায়নি, এটি কিভাবে সম্ভব? উন্নত এই মহাদেশে এক দেশ অন্য দেশের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্যবিনিময় করে থাকে বলে সবাই অবগত আছে, অথচ সবাই ফেল করল? হত্যাকারীরা রাজপথে গাড়ি থেকে নেমে হেঁটে, সেøাগান দিয়ে কনসার্ট হলে ঢুকেছে! তারপরও যদি তরুণরা একসঙ্গে এদের প্রতিরোধ করত, তাহলেও এত তরুণ-তরুণী নিহত হতো? অনেকেই ঘটনা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইমারজেন্সি পুলিশকে কল করতে পারত। যদিও পুলিশ এসেছে, তবু আরও দ্রুত আসতে পারত।

এবার আসা যাক বাংলাদেশের জঙ্গী উৎস, এর বিস্তার ও তা রোধে বাংলাদেশের সরকার, সিভিল সোসাইটি, বুদ্ধিজীবী ও তরুণ প্রজন্মের দায়িত্ব কর্তব্যের কথা। এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই, আমাদের নিরাপত্তা বাহিনীতে জামায়াত-বিএনপি সমর্থক থাকা সত্ত্বেও এদের অধিকাংশ নিরপেক্ষভাবে শত শত জঙ্গী-জিহাদি-সন্ত্রাসীদের গোলা বারুদ, চাপাতি-ছুরি, বোমা, গ্রেনেডসহ গ্রেফতার করছে! এদের দক্ষতায়, আন্তরিকতায় কোন ঘাটতি নেই। কিন্তু, নিম্ন আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট, বিচারক ও যেসব আইনজীবী এই রাষ্ট্রদ্রোহী জঙ্গী-সন্ত্রাসীদের জামিনে মুক্তি দেয়, তারাই প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্র বিরোধিতায় সক্রিয় অবদান রাখছে! এই জঙ্গীরা যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাভিত্তিক রাষ্ট্র ধ্বংস ও মুক্তিযুদ্ধপন্থী সরকার উৎখাতে প্রমাণসহ গ্রেফতার হচ্ছে, পুলিশ-র‌্যাব দিন-রাত পরিশ্রম করে এদের খুঁজে গ্রেফতার করছে। কিভাবে তারা জামিন লাভ করে? তাদের গ্রেফতার তো দেশ সরকার ও জাতিকে সুরক্ষিত রাখার জন্য অজামিনযোগ্য হবার কথা। যদি আইনে এমন বিধান না থাকে, তাহলে সে বিধান যোগ করে এদের গ্রেফতার আইনকে অজামিনযোগ্য করে অনেক শক্ত করতে হবে। রাষ্ট্রদ্রোহীরা কোন দেশে জামিন পায় না, অথচ বাংলাদেশে মনে হয় এদের গ্রেফতার করা ও জামিনে মুক্তি দেয়া একটা নিয়ে চোর-পুলিশ খেলা চলছে! যে কারণে জঙ্গীরা বার বার পুলিশের হাতে গ্রেফতার হচ্ছে, বার বার বিচারক-আইনজীবীদের সাহায্যে জামিনে বের হয়ে রাষ্ট্র ও এ সরকার ধ্বংসে নিয়োজিত হচ্ছে! এটি পুরোপুরি অগ্রহণযোগ্য, এটি চলতে পারে না। যে ব্যক্তি বা যাদের মাধ্যমে ওরা জামিন পায়,ওরাও সম্ভবত জঙ্গী-মিত্র!

আগেও বলেছি, আবার বলছি- দেশের সংবিধান অনুযায়ী দেশে এক শিক্ষা ধারা চালু থাকবে। ইংরেজী মাধ্যম ও একই শিক্ষাক্রম অনুসরণ করবে। তবে মাদ্রাসা যেহেতু বাংলা মাধ্যম, সেহেতু আলাদা মাদ্রাসা শিক্ষা থাকতে পারে না। প্রধানত মাদ্রাসাকে কেন্দ্র করে জামায়াত-হেফাজত জঙ্গী উৎপাদন করে থাকে এটা পুরোনো অভিযোগ। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষক জঙ্গী কর্মে ধরা পড়েছে, সেই সব মাদ্রাসা অচীরেই বন্ধ করে দিতে হবে। অন্য মাদ্রাসাগুলোকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলে রূপান্তরিত করে এক বিশাল দরিদ্রের সন্তানদের জঙ্গিত্ব শিক্ষা দিয়ে ব্যর্থ মানুষ করা চিরতরে বন্ধ করতে হবে। যেসব মাদ্রাসা শিক্ষক সন্তানদের মাদ্রাসায় পড়ায় না, তাদের ঐ সব মাদ্রাসাও বন্ধ করে দিতে হবে। কারণ, ঐ শিক্ষায় তাদেরও আস্থা নেই। বাংলাদেশে মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট হয়েছে, এখানে সব বড় ভাষাগোষ্ঠীর মাতৃভাষা শিক্ষা চলবে। কিন্তু আরবী বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রহসন যেন কোন সরকার না করে।

আরবী ভাষা ও ইসলাম যে এক জিনিস নয়- এটা বুঝতে হবে। স্মরণ রাখতে হবে, কুষ্টিয়ায় যে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে সেটিই ইসলাম ধর্ম তত্ত্ব সম্পর্কে অনার্স ও মাস্টার্স পাঠ দান করবে। তাছাড়া, আরবী একটি ভাষা ও সাহিত্য হিসেবে সব বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও আরবী ভাষাও সাহিত্য পড়ানো হবে। এছাড়া, ইসলামী ফাউন্ডেশন তো ইসলাম চর্চার কেন্দ্র, ইমাম প্রশিক্ষণ দানও তাদের কাজ।

জামায়াত নেতাদের মধ্যে যারা জঙ্গী উৎপাদন ও প্রশিক্ষণ, অর্থ সংগ্রহ কাজে অর্থদানে রত, তাদের রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় বিচার করতে হবে। দুদিন পর তারা আবার জামিন নিয়ে একই কাজে নিযুক্ত হবে- এটি জাতি বার বার দেখতে চায় না। তাছাড়া, ’৭১- এর যুদ্ধাপরাধী দল জামায়াত-শিবির-আলবদরের বিচার শুরু এখন সময়ের দাবি।

বন্দী জঙ্গী জিহাদি তরুণদের জন্য কারাগারে ভারতের বিনোবা ভাবের মতো ‘মনবদলে’র একটি আন্দোলন শুরু করা প্রয়োজন। এই জঙ্গীদের জন্য সব ধর্ম, মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে মুক্ত আলোচনা, কাব্য-সাহিত্য-নাটক-সঙ্গীত-চারু ও কারুকলা ইত্যাদির আয়োজন করা দরকার। এমন অনুষ্ঠান বিটিভিও আয়োজন করতে পারে। এ অনুষ্ঠানে মাদ্রাসা ছাত্রছাত্রীদের সম্পৃক্ত করা যেতে পারে, তাদের বাংলার লোকসঙ্গীত, লালন, শাহ আবদুল করিম, রাধারমনের সঙ্গীত শোনানো এবং বাংলার হাজার বছরের সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। বর্তমানে এমন কোন ব্যবস্থা নেই।

অর্থাৎ জঙ্গী জিহাদিরা জেলে বসে জঙ্গী কাজেরই চর্চা করছে! অথচ তাদের সুযোগ দেয়া উচিত মানবিক হয়ে ওঠার। তাহলে নিশ্চয় তাদের অনেকে জঙ্গীপথ পরিত্যাগ করে সুস্থ, স্বাভাবিক পথে আসার সুযোগ গ্রহণ করবে।

ইমামদের খুতবায় মুক্তিযুদ্ধ, দেশের স্বাধীনতায় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ সম্পর্কে বক্তব্য থাকা জরুরী। মাদ্রাসাগুলোতে মাতৃভাষা, গণিত, ইতিহাস, বিজ্ঞান, কম্পিউটার শেখাতে হবে, পাশে ধর্ম শিক্ষা থাকবে। বিনোদনের জন্য গান, নাটক, খেলার প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে হবে। বাঙালীর জন্য বাঙালীর খাদ্য ভাত, মাছ, পোশাক, ভাষা, গান, বাজনা, আম, কলা, লিচু- এসব নিয়ে তাদের মাতৃভূমি হচ্ছে বাংলাদেশ- এ বোধ ওদের মনে জাগাতে হবে। অন্য ধর্ম, সেসব ধর্মের মূল দর্শনও এদের জানাতে হবে। সবরকম উৎসব, পূজা, পার্বণে অংশ নিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে জঙ্গী জিহাদি হওয়া, খুন হত্যা করা যে ধর্ম হতে পারে না, এসব খুনী জঙ্গীদের প্রতিরোধ করে অন্যদের জীবন রক্ষা করতে মানবিক মূল্যবোধের চর্চা করতে ব্যবস্থা নিতে হবে। সব স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘মূল্যবোধ’ শিক্ষা দিতে হবে এবং এ বিষয়ে প্র্যাকটিক্যাল কাজও করাতে হবে। সমাজকে কাক্সিক্ষত রূপ দিতে সরকার ও সিভিল সোসাইটি, শিক্ষিত বুদ্ধিজীবী ও তরুণ প্রজন্মকে সমাজকে জঙ্গী মুক্ত করতে একযোগে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি জঙ্গী-জিহাদিদের সমাজে এক ঘরে করে তুলতে হবে, তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়-অর্থদাতা-প্রশিক্ষক-সবাইকে একঘরে করতে হবে এবং কঠোর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়ে সমাজ দেহ থেকে এদের মূলোৎপাটন করতে হবে।

এ সব কাজ করতে গিয়ে বাংলাদেশকে তার ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের চলমান বিচার ও দণ্ড দ্রুত কার্যকর করে একটি জঙ্গী উৎপাদনের প্রধান উৎস- যুদ্ধাপরাধী ও তাদের দলের তৎপরতা চিরতরে বন্ধ করতে হবে।

লেখক ঃ শিক্ষাবিদ ও গবেষক