২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মুদ্রা পাচারে জড়িতদের বিরুদ্ধে শীঘ্র ব্যবস্থা ॥ এনবিআর চেয়ারম্যান

অর্থনৈতিক রিপোর্টার ॥ দেশ থেকে মুদ্রা পাচারের উৎস অনুসন্ধান করতে গিয়ে যত গভীরে যাচ্ছি তত কুৎসিত চেহারা বের হচ্ছে। মুদ্রা পাচারের সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বের হয়ে আসছে। এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ আছে বলেও জানিয়েছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান নজিবুর রহমান। জড়িতদের বিষয়ে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান তিনি।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সম্মেলনকক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে উঠে আসে ২০১৩ সালে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১০০ কোটি মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বাণিজ্যের নামে এই অর্থ পাচার হয়।

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি (জিএফআই) বলছে, শুধু ২০১৩ সালেই অবৈধ পথে বাংলাদেশের বাইরে চলে গেছে ৯৬৬ কোটি ডলারের বেশি। বাংলাদেশী মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৭৫ হাজার কোটি টাকা।

‘ইলিসিট ফিন্যান্সিয়াল ফ্লোস ফ্রম ডেভেলপিং কান্ট্রিজ : ২০০৪-১৩’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদন বুধবার প্রকাশ করে জিএফআই। প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন জিএফআইয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ ডেভ কার ও অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্পেনজারস। অস্বচ্ছ ব্যবসায়িক লেনদেন বা মিসইনভয়েসিং, দুর্নীতি ও কর ফাঁকির মাধ্যমে এসব অর্থ পাচার হয়েছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান নজিবুর রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, সরকার বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে দেখছে। বিদ্যমান আইনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা হয়েছে। দুদক, পুলিশ, বাংলাদেশ ব্যাংক ও এনবিআরকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এনবিআরের কাস্টমস, আয়করসহ বিভিন্ন আঙ্গিকে ও কৌশল নির্ধারণ করে কাজ করছে। সবার সঙ্গে সমন্বিত কাজ করলে তা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। তিনি বলেন, মুদ্রা পাচারের সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে অনুসন্ধান চলছে। অনেকের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মুদ্রা পাচারের একটি আলামত খুঁজতে গিয়ে বাংলাদেশে একটি বিএমডব্লিউ গাড়ি আটক করা হয়েছে। মুদ্রা পাচার রোধে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ভূমিকা বেশি।

এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, চোরাচালান রোধে এনবিআরের চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে একটি ফোরাম করতে অর্থমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন। যেখানে বিভাগীয় কমিশনারগণ, কোস্টগার্ড, পুলিশ ও বিভিন্ন সংস্থা যুক্ত থাকবে। খুব শীঘ্রই এ ফোরাম গঠন করা হবে। তিনি বলেন, সবাইকে নিয়ে সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজ চলছে। তবে এই মুহূর্তে চোরাচালান নিয়ন্ত্রণের অবস্থা অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে অনেক সক্রিয় বলেও দাবি করেন তিনি। নজিবুর রহমান বলেন, ভয়ভীতি দূর করে আমরা রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা করছি। যতই ভয়ভীতি, হুমকি-ধমকি দেয়া হোক না কেন, রাজস্ব বোর্ড তার অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছবে। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে প্রথাগত বৃত্তের বাইরে গিয়েও কাজ করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। এজন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে সরকার ও বেসরকারী ব্যাংক, সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবদের সাহায্য চেয়েছেন তিনি। এছাড়া জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন ধর্মীয় নেতাদের কাজে লাগানোর পরিকল্পনা তুলে ধরেন তিনি। পাশাপাশি আগামী প্রজন্মের জন্য পাঠ্যক্রমে রাজস্ব ব্যবস্থা বিষয়ক পাঠ অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনার কথা জানান এনবিআর চেয়ারম্যান।

গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটির (জিএফআই) প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৪ থেকে ২০১৩ এক দশকে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পাচার হয়েছে ৫ হাজার ৫৮৭ কোটি ৭০ লাখ ডলার। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি পাচার হয়েছে ২০১৩ সালে, যার পরিমাণ ৯৬৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার। এর আগের বছর পাচার হয় ৭২২ কোটি ৫০ লাখ ডলার। এ হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে অবৈধ অর্থপ্রবাহ বেড়েছে ৩৩ শতাংশ। এছাড়া ২০০৮ ও ২০০৯ সালেও অবৈধভাবে বিপুল অর্থ দেশের বাইরে চলে গেছে। ওই দুই বছরে পাচার হয় যথাক্রমে ৬৪৪ কোটি ৩০ লাখ ও ৬১২ কোটি ৭০ লাখ ডলার।

প্রতিবেদনের তথ্যমতে, আলোচ্য দশকে অস্বচ্ছ বাণিজ্যিক লেনদেনের মাধ্যমে পাচার হয়েছে ৪ হাজার ৯১৩ কোটি ২০ লাখ ডলার। মূলত রফতানির ক্ষেত্রে এ অস্বচ্ছ লেনদেন হয়। এ প্রক্রিয়ায় প্রতি বছর গড়ে ৪৯১ কোটি ডলারের বেশি অর্থ দেশ থেকে চলে গেছে। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থ পাচার হয়েছে ২০১৩ সালে, যার পরিমাণ ৮৩৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার।

অন্যদিকে, ওই ১০ বছরে হট মানি আউটফ্লো বা ব্যালান্স অব পেমেন্টের মাধ্যমে পাচার হয়েছে ৬৭৪ কোটি ৫০ লাখ ডলার। সে হিসাবে গড়ে প্রতি বছর পাচার হয় ৬৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার। এক্ষেত্রেও সবচেয়ে বেশি অর্থ পাচার হয়েছে ২০১৩ সালে, যার পরিমাণ ১৩১ কোটি ১০ লাখ ডলার।

এদিকে, ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি ও মার্চে হঠাৎ করে শূন্য শুল্কের বিভিন্ন কাঁচামাল আমদানি কয়েক হাজার গুণ বেড়ে যায়। এরমধ্যে ছিল লোহার ট্যাঙ্ক, পিপা, ক্যান প্রভৃতি। যদিও এগুলোর চাহিদা বাড়েনি। তাই এর মাধ্যমে অর্থ পাচার হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে।

জিএফআই বলছে, ২০০৪-১৩ সময়কালে সবচেয়ে বেশি অর্থ পাচার হয়েছে চীন থেকে, যার পরিমাণ ১ লাখ ৩৯ হাজার ২২৭ কোটি ৬০ লাখ ডলার। দ্বিতীয় স্থানে আছে রাশিয়া, ১ লাখ ৪ হাজার ৯৭৭ কোটি ডলারের বেশি। শীর্ষ পাঁচে এরপর রয়েছে যথাক্রমে মেক্সিকো, ভারত ও মালয়েশিয়া। পাচার হওয়া এসব অর্থ জমা হয়েছে উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে এবং করের সুখস্বর্গ (ট্যাক্সেস হ্যাভেন) বলে পরিচিত বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলে।