১৯ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

এফ আর খান আইনস্টাইন অব স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং

এফ আর খান আইনস্টাইন অব স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং

নাজনীন আখতার ॥ সহিংসতা যে ধর্মের আকারেই হোক, যে রূপেই হোক, তা কখনও কারও কাম্য হতে পারে না। গুটিকয়েকের অপরাধের দায় বর্তাতে পারে না পুরো গোষ্ঠীর ওপর। বিশ্বকে রক্ষা করতে হলে জয় হতে হবে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানবতার। সাম্প্রতিক সময়ে জঙ্গী হামলার প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী রিপাবলিকান দলের ডোনাল্ড ট্রাম্প চান যুক্তরাষ্ট্রে যেন মুসলিমদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়। শত কোটি মুসলিম বসবাসকারী বিশ্বে উগ্র সন্ত্রাসবাদী সংগঠন ইসলামিক স্টেট বা আইএস দিয়েই ইসলাম ধর্ম বিচার্য হতে পারে না। তাই গণহারে মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে এ বিষোদ্গারকে গণতান্ত্রিক ধ্যান-ধারণার পরিপন্থী বলে মনে করছে স্বয়ং মার্কিনীরা। ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই চাওয়া যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী নিরীহ মুক্তমনা মুসলিমদের ওপর প্রচ- মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে বলে মনে করা হচ্ছে। তার এই মন্তব্যের সমালোচনা হচ্ছে সেদেশের গণমাধ্যমেও। দ্য গার্ডিয়ান লিখেছে, ট্রাম্পের চাওয়া অনুযায়ী মুসলিমরা নিষিদ্ধ হলে যুক্তরাষ্ট্র হতশ্রী দশায় পরিণত হবে।

মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক খ্যাতনামা সংবাদপত্র দ্য গার্ডিয়ানে ‘যে মুসলিমরা যুক্তরাষ্ট্রকে গড়ে তুলেছেÑ মস্তিষ্ক সার্জন থেকে শুরু করে র‌্যাপ গায়ক পর্যন্ত’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে যুগে যুগে কিভাবে মেধাবী মুসলিমরা নিরলস পরিশ্রমে আজকের যুক্তরাষ্ট্রকে গড়ে তুলতে সহায়তা করেছেন। সেখানে সবার আগে উঠে এসেছে বাংলাদেশী আমেরিকান এফ আর খানের নাম।

প্রতিবেদনে প্রশ্ন রেখে বলা হয়েছেÑ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য মুসলিমরা কী করেছে? এর জবাব দেয়ার জন্য যদি আপনার একমাত্র তথ্য উৎস হয়ে থাকে ডোনাল্ড ট্রাম্প, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমরা এর নাগরিকদের হত্যা করছে, মূল্যবোধ নষ্ট করার চেষ্টা করছেÑ এর চেয়ে বেশি কোন উত্তর আপনি দিতে পারবেন না। ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম প্রবেশ নিষিদ্ধ করতে চান। কিন্তু তিনি কী তার দেশের ইতিহাসে মুসলিমদের অনবদ্য অবদানের কথা জানেন না! কত সংখ্যক মুসলিম যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের কল্যাণে কাজ করেছেন তা কি তিনি জানেন না! অথচ তিনি মুসলিমদেরই দূরে সরিয়ে রাখতে চান। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অসাধারণ মুসলিম নাগরিকরা যেসব কাজ করেছেন ততটা ট্রাম্প নিজে তার দেশের জন্য করেননি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র সৃষ্টিতেই ভূমিকা রয়েছে মুসলিমদের। ১৭৭৫ এবং ১৭৮৩ সালের মধ্যে ব্রিটিশ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে বীরের মতো লড়েছিলেন যারা তাদের মধ্যে দুই মুসলিম বাম্পেট মোহাম্মদ ও ইউসুফ বিন আলীর নাম উঠে আসে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন তার সেনাবাহিনীতে মুসলিম বা অন্য ধর্ম ও গোত্রের বিষয়টিকে কখনও গুরুত্ব দেননি। তিনি সুষ্পষ্ট করে বলেছিলেন, আমেরিকার দেশপ্রেমিক হতে হলে কাউকে নির্দিষ্ট ধর্ম বা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হওয়ার কোন প্রয়োজন নেই। তিনি তার সেনাবাহিনীতে মুসলিমদের সম্মান দিয়েছিলেন। অথচ ট্রাম্প আমেরিকার সেই মূলনীতি থেকেই সরে এসেছেন মুসলিমদের বিরুদ্ধে মন্তব্য করে। মুসলিম অধ্যুষিত রাষ্ট্র মরক্কো ১৭৮৬ সালে প্রথম দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। পরবর্তীতে দুই দেশ পরষ্পরের প্রতি শান্তি ও সৌহার্দ্য রক্ষায় একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে, যা এখন পর্যন্ত মানবতা প্রকাশের দীর্ঘ ইতিহাস হিসেবে আজও কার্যকর রয়েছে।

প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের সুউচ্চ ভবন নির্মাণে ফজলুর রহমান খান বা এফ আর খানের অবদানের কথা তুলে ধরে বলা হয়Ñ এফ আর খানের মতো মুসলিম না থাকলে সুউচ্চ ভবন নির্মাণে যুক্তরাষ্ট্রকে সামনে তাকাতে হতো না! বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত আমেরিকান এফ আর খানকে বলা হয় ‘স্থাপনা প্রকৌশলের আইনস্টাইন’ [আইনস্টাইন অব স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং]। আকাশছোঁয়া উঁচু ভবন নির্মাণে নতুন কাঠামোগত পদ্ধতি উদ্ভাবনে তিনি ছিলেন সবচেয়ে অগ্রগামী। তার ফ্রেম টিউব কাঠামো পদ্ধতি উঁচু ভবন নির্মাণে বিপ্লব নিয়ে আসে। তিনি দেখান কিভাবে ব্রেসড ফ্রেম, শিয়ার ফ্রেমে উঁচু ভবন নির্মাণ সম্ভব। তার উদ্ভাবিত এই ফ্রেম টিউব পদ্ধতি অনুসরণ করেই পরবর্তী প্রজন্ম নির্মাণের ক্ষেত্রে রডের ব্যবহার কমিয়ে আকাশছোঁয়া উঁচু ভবন নির্মাণ শুরু করেন এবং আমেরিকার নগরকে নতুন এক ধরনের চেহারায় নিয়ে আসা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসলামী জঙ্গীরা ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ধ্বংস করে ফেলেছে। কিন্তু এফ আর খান ফ্রেম টিউব কাঠামো প্রক্রিয়া উদ্ভাবন না করলে টুইন টাওয়ার আবার আগের জায়গায় নির্মাণ করা সম্ভব হতো না। জন হ্যানকক টাওয়ারের মতো এক্স-ব্রেসিং, ফ্রেম টিউবে সিয়ার টাওয়ার নির্মাণও সম্ভব হতো না। এফ আর খানের নক্সা অনুসারেই শিকাগোতে ১০৮ তলা উঁচু সিয়ার টাওয়ার ১৯৭৩ সালে নির্মাণ করা হয়, যা পৃথিবীতে ২৫ বছর ধরে সবচেয়ে উঁচু ভবন হিসেবে ছিল। এফ আর খান ১৯২৯ সালের ৩ এপ্রিল ঢাকায় জন্ম নেন এবং মারা যান ১৯৮২ সালের ২৭ মার্চ সৌদি আরবের জেদ্দায় মাত্র ৫২ বছর বয়সে। শিকাগোর ইলিনয়সে তাকে সমাহিত করা হয়। মৃত্যুর সময়ে তার বিভিন্ন নথিপত্র শিকাগোর আর্ট ইনস্টিটিউটে এবং রিয়ার্সন ও বার্নহ্যাম লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত আছে। তার উদ্ভাবিত পদ্ধতি অনুসরণ করেই ভবিষ্যতের সব উঁচু ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। এর মধ্যে ২০০৯ সালে শিকাগোতে নির্মিত ট্রাম্প ইন্টারন্যাশনাল হোটেল এ্যান্ড টাওয়ারও রয়েছে। বাংলাদেশ, অস্ট্রেলিয়া ও সৌদি আরবেও তার নক্সায় বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। তার নক্সায় করা উল্লেখযোগ্য স্থাপনার মধ্যে রয়েছেÑ কলোরাডোয় যুক্তরাষ্ট্রের এয়ারফোর্স একাডেমি, শিকাগোতে ডিউইট-চেস্টনাট এ্যাপার্টমেন্টস, বার্নসউইক বিল্ডিং, জন হ্যানকক সেন্টার, অর্লিন্সে ওয়ান শেল স্কয়ার, মেলবোর্নে ১৪০ উইলিয়াম স্ট্রিট, শিকাগোতে সিয়ার/উইলস টাওয়ার, জেদ্দায় কিং আব্দুল আজিজ এয়ারপোর্ট, হজ্জ টার্মিনাল, কিং আব্দুল আজিজ ইউনিভার্সিটি, মিনিয়েপলিসে হুবার্ট এইচ হামফ্রি মেট্রোডম, শিকাগোতে ওয়ান ম্যাগনিফিসেন্ট মাইল এবং ওন্টারি সেন্টার। শেষের দুইটি তার মৃত্যুর পর নির্মাণ শেষ হয়। যুক্তরাষ্ট্র তার সম্মানে বিশেষ পুরস্কারও প্রদান করে।

ফোর্বস ম্যাগাজিন ‘আমেরিকার স্বপ্ন’ হিসেবে অটো পার্টস কোম্পানি ফ্লেক্স-এন-গেটের প্রধান বিশ্বের ৩৬০তম ধনী ৬৫ বছর বয়স্ক শাহিদ খানকে নিয়ে প্রচ্ছদ প্রতিবেদন তৈরি করে। পাকিস্তান বংশোদ্ভূত আমেরিকান এই ব্যক্তি মাত্র ১৬ বছর বয়সে বাসন মেজে ঘণ্টায় ১ দশমিক ২০ ডলার করে উপার্জন শুরু করেন। আর আজ তিনি ৪ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারের মালিক। আমেরিকার স্বপ্ন ব্যক্তি হিসেবেই শাহিদ খান বিশেষভাবে পরিচিত হন বিশ্বব্যাপী। ১৯৬৩ সালে ব্রেন টিউমার চিকিৎসায় ও ট্রমাটিক ব্রেন ইনজুরিতে বিশেষ চিকিৎসা পদ্ধতি উদ্ভাবনের জন্য পাকিস্তানী বংশোদ্ভূত আরেক আমেরিকান আইয়ুব ওমমায়ার নাম সম্মানের সঙ্গে উচ্চারণ করা হয়।

আমেরিকায় সিরিয়া অভিবাসী আর্নেস্ট হামওয়াই প্রথম আইসক্রিম কোন তৈরি করেন। এছাড়া বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখা মুসলিম আমেরিকানদের মধ্যে র‌্যাপ গায়ক রাকিম, হোয়াইট হাউসে হিলারি ক্লিনটনের স্টাফ হিসেবে কর্মরত হুমা আবেদিন, যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতি প্রসারে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখা ফারাহ পন্ডিথ, বর্ণবাদ ও দাসত্বের বিরুদ্ধে লড়াকু আমেরিকান মুসলিম ম্যালকম এক্স, ফেমটোকেমিস্ট্রির জনক, ১৯৯৯ সালে রসায়নে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত মিসরীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকান আহমেদ জিওয়ালির নাম লেখা হয়েছে প্রতিবেদনে।

দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনের এক জায়গায় মুসলিম আমেরিকানদের পক্ষে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের টুইট বার্তার কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছেÑ সান বার্নাডিনোতে মুসলিম দম্পতির বন্দুক হামলার পর বারাক ওবামা বলেছিলেন, ‘মুসলিম আমেরিকানরা আমাদের বন্ধু, আমাদের প্রতিবেশী, আমাদের সহকর্মী, আমাদের খেলাধুলার নায়ক। এবং হ্যাঁ, তারা আমাদের নারী ও পুরুষ, যারা এক ইউনিফর্মে আমাদের দেশের প্রতিরক্ষায় জীবন দিতে প্রস্তুত। এটা আমাদের মনে রাখতে হবে।’ এই বক্তব্যকে ব্যঙ্গ করে ট্রাম্প টুইট করেন এই লিখে যেÑ ‘ওবামা তার বক্তব্যে বলেছেন, মুসলিমরা আমাদের খেলাধুলার নায়ক। তিনি কোন খেলার কথা বলছেন এবং কার কথা বলছেন?’

প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্প বোধহয় ভুলে গেছেন খেলাধুলায় আমেরিকান মুসলিম এক নায়ককে তিনিও দেখেছেন। আর সে নায়ক হচ্ছেন বক্সিংয়ের মোহাম্মদ আলী। তিনি তিনবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। ট্রাম্প বোধহয় এবার মনে করতে পারছেন যে, তিনি ২০০৭ সালে মোহাম্মদ আলী পুরস্কার অনুষ্ঠানে মোহাম্মদ আলীর সঙ্গেই উপস্থিত ছিলেন। সেই সময় সেই নায়ক মোহাম্মদ আলীকে বন্ধু উল্লেখ করে ফেসবুকে একসঙ্গে ছবিও পোস্ট করেছিলেন। সবচেয়ে কনিষ্ঠ বক্সার হিসেবে খেতাব জেতা বিশ্বখ্যাত মাইক টাইসনের কথাও তাকে মনে করিয়ে দেয়া দরকার। এই নায়কদের মধ্যে বাস্কেটবল আইকন সাকিলা ও’নিল, কারিম আব্দুল জব্বার, মাইকেল জর্ডান, হাকিম ওলাজুউনও রয়েছেনÑ সেটাও মনে করিয়ে দেয়া দরকার।