২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ভাল ফলের আশায় পৌর নির্বাচন মনিটর করছেন খালেদা জিয়া

  • প্রার্থীদের অবস্থা জেনে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা

শরীফুল ইসলাম ॥ আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীদের ভাল ফলের আশায় সর্বক্ষণিক মনিটর করছেন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। ২৩৫ পৌরসভার মধ্যে কোথায় দলীয় কোন প্রার্থীর কী অবস্থা, তা জেনে প্রয়োজনে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিচ্ছেন। কখনও কখনও স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলে দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। এবারই প্রথম দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হচ্ছে বিধায় এ নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে বিএনপি হাইকমান্ড। আর এ কারণেই পৌর নির্বাচন নিয়ে খালেদা জিয়া বেশি তৎপর হয়েছেন।

সূত্রমতে, আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনে ভাল ফলাফল অর্জন করার মধ্য দিয়ে বিএনপি চলমান নাজুক রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবেলা করে দলকে এগিয়ে নিতে চায়। এছাড়া দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের মনোবল চাঙ্গা করে নির্দলীয় সরকারের অধীনে পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দাবিতে আবার সরকারবিরোধী আন্দোলনে যেতে চায়। এজন্য দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের আটঘাট বেঁধে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন খালেদা জিয়া। ভোট শেষ না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে মাঠে থাকার নির্দেশও দিয়েছেন তিনি। সেই সঙ্গে নিজেই নিয়েছেন এ নির্বাচন সর্বক্ষণিক মনিটর করার দায়িত্ব।

এদিকে ১৩ ডিসেম্বর মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিনে সকল বিদ্রোহী প্রার্থীকে তাদের মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। যারা তার নির্দেশ অমান্য করবেন নির্বাচনের পর তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে সবাইকে ইতোমধ্যেই জানিয়ে দেয়া হয়েছে। এছাড়া ২০ দলীয় জোটের যে সব মেয়র প্রার্থীকে জোট থেকে সমর্থন দেয়া হবে তাদের পক্ষে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের একজোট হয়ে কাজ করার নির্দেশও দিয়েছেন খালেদা জিয়া।

জানা যায়, ২৩৫ পৌরসভায় বিএনপির ৩২ জন বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। এদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেয়ার ব্যাপারে কেন্দ্র থেকে স্থানীয় নেতাদের ওপর প্রচ- চাপ রয়েছে। দলের সাংগঠনিক সম্পাদক ও যুগ্মমহাসচিবরাও বিদ্রোহী প্রার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। আর যেসব পৌরসভায় বিএনপি বা জোটের শরিক দলের কোন প্রার্থী নেই সেখানে আওয়ামী লীগসহ অন্য কোন রাজনৈতিক দলের যোগ্য বিদ্রোহী মেয়রপ্রার্থী থাকলে তার পক্ষ নেয়ার জন্য কেন্দ্র থেকে স্থানীয় বিএনপি নেতাদের কাছে নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে।

জানা যায়, পৌর নির্বাচন উপলক্ষে মাঠপর্যায়ের সর্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখছেন খালেদা জিয়া। এ নির্বাচনে দলের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করছেন তিনি। কখনও কখনও তাদের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা পাঠাচ্ছেন। ইতোমধ্যেই সরাদেশে নির্বাচন পরিচালনা কার্যক্রম তদারকির জন্য সিনিয়র নেতাদের নিয়ে কয়েকটি টিমও গঠন করা হয়েছে। আর দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খানের নেতৃত্বে গঠিত একটি টিমকে একটি নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সর্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। আর আগেই দলীয় প্রার্থীদের প্রত্যয়নের দায়িত্ব পাওয়া যুগ্মমহাসচিব মোহাম্মদ শাহজাহানকে সব মেয়র প্রার্থীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তারা সব সময় খালেদা জিয়াকে এ নির্বাচনের খোঁজখবর জানাচ্ছেন।

সূত্রমতে, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন ভোটের দিন দুপুরের আগে বর্জন করলেও নির্বাচন শেষে দলীয় মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীরা অনেক ভোট পান। এ কারণে স্থানীয় নেতাকর্মীদের মতামত না নিয়ে বিএনপি কেন্দ্রীয়ভাবে ওই নির্বাচন বর্জন করার বিষয়টি তখন অনেকেই মেনে নিতে পারেননি। নির্বাচনের পর দলের কোন কোন নেতাকর্মী প্রকাশ্যেই এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এ জন্যই এবার যেন এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয় সে জন্য তৎপর রয়েছেন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াসহ সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা। এ কারণেই দলের নেতাকর্মীদের তিনি ভোট শেষ না হওয়া পর্যন্ত মাঠে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।

খালেদা জিয়াকে সর্বক্ষণিক পৌরসভা নির্বাচনের অগ্রগতি জানাতে যারা তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন তাদের মধ্যে রয়েছেনÑ দলের ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলন, চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সহসম্পাদক আসলাম চৌধুরী, বরিশাল বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মজিবর রহমান সরোয়ার, সিলেট বিভাগীয় সাংগঠনিক সহসম্পাদক ডাঃ সাখাওয়াত হোসেন জীবন, রংপুর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুল হাবিব দুলু, খুলনা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মশিউর রহমান, দলের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন, সহপ্রচার সম্পাদক এমরান সালেহ প্রিন্স প্রমুখ। এসব নেতার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন খালেদা জিয়া। আর তারা ঠিকমতো কাজ করছেন কিনা সেজন্য কয়েকজন যুগ্মমহাসচিব মোহাম্মদ শাহজাহানসহ কয়েকজন সিনিয়র নেতাকে তাদের পেছনে লাগিয়ে রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে।

সূত্র জানায়, খালেদা জিয়ার নির্দেশে আসন্ন পৌরসভা নির্বাচন উপলক্ষে সকল কেন্দ্রভিত্তিক নির্বাচন পরিচালনা কমিটি করার প্রস্তুতি চলছে। এ কমিটিতে বিএনপির পাশাপাশি ২০ দলীয় জোটের সকল রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। আর এসব কমিটি যাতে ঠিকভাবে কাজ করতে পারে, সে জন্য বিএনপির জেলাভিত্তিক আরেকটি মনিটরিং টিমও থাকছে বলে জানা গেছে।

জানা যায়, বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া লন্ডনে অবস্থানকালেই আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেন। এ বিষয়ে ছেলে তারেক রহমানও তার সঙ্গে একমত পোষণ করেন। তাই ২১ নবেম্বর লন্ডন থেকে দেশে ফিরেই খালেদা জিয়া পৌরসভা নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়া শুরু করেন। জেলা বিএনপির নেতাদের মধ্যে প্রথমে একটি প্রার্থী তালিকা এনে দলের কিছু কেন্দ্রীয় নেতার সঙ্গে বসে তিনি ২৩৫ পৌরসভার জন্য মেয়রপ্রার্থী চূড়ান্ত করেন। অবশ্য একেবারে শেষদিকে এসে কয়েকটি পৌরসভায় প্রার্থী পরিবর্তন করা হয়। আর দলীয় প্রার্থীদের প্রত্যয়নের ক্ষমতা দেন তার বিশ্বস্ত ও দলের যুগ্মমহাসচিব মোহাম্মদ শাহজাহানকে।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া প্রতিদিন তার গুলশানের বাসায় অবস্থানকালে তার ব্যক্তিগত সহকারীদের মাধ্যমে সারাদেশের পৌরসভা নির্বাচনের খোঁজখবর রাখেন। এছাড়া তার সামনে প্রতিদিনের দৈনিক পত্রিকার কাটিংও দেয়া হয়। এছাড়া সন্ধ্যার পর গুলশান কার্যালয়ে গিয়ে তিনি সিনিয়র নেতা ও পৌরসভা নির্বাচনের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের সঙ্গে কথা বলে সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত হন। আর তৃণমূল পর্যায় থেকেও মাঝেমধ্যে কোন কোন নেতা খালেদা জিয়ার সঙ্গে সরাসরি কথা বলে নির্বাচন পরিস্থিতি জানান। আবার কখনও কখনও তিনি নিজেই তৃণমূল পর্যায়ে ফোন করে নির্বাচনের খোঁজখবর নেন।

আসন্ন পৌরসভা নির্বাচন কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমান জনকণ্ঠকে বলেন, আমরা সারাদেশের দলীয় প্রার্থীদের ভাল ফলাফলের আশায় কেন্দ্রীয়ভাবে তৎপর রয়েছি। বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াও এ বিষয়ে আমাদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন এবং সর্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখছেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব) মাহবুবুর রহমান বলেন, আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনকে বিএনপি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে। এ জন্যই ভাল প্রার্থী দেয়ার পাশাপাশি তাদের বিজয়ী করার ব্যাপারে দল থেকে নানামুখী তৎপরতা চালানো হচ্ছে। বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া নিজেও এ নির্বাচন সর্বক্ষণিক মনিটর করছেন। আর তার নির্দেশে সারাদেশের সকল পৌরসভা নির্বাচন পরিচালনা কার্যক্রম তত্ত্বাবধান করছেন দলের আরও কয়েকজন সিনিয়র নেতা।