২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নারিন্দার মেসে আগুনে পুড়ে মরল একজন, দগ্ধ দুই

  • অগ্নিসংযোগকারীদের শনাক্ত করেছে পুলিশ ॥ গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে

স্টাফ রিপোর্টার ॥ রাজধানীর ওয়ারী থানাধীন নারিন্দার একটি মেসে আগুনে পুড়ে একজনের মৃত্যু ও দুইজন মারাত্মক দগ্ধ হয়েছে। তাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে তাদের চিকিৎসা চলছে। নিহত সুমন মিয়া বাড়িটির নিচতলায় থাকা ফেমাস ডিজেল সার্ভিস নামের একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সাবেক কর্মচারী। বর্তমানে নিজেই ব্যবসা করছিলেন। আর দগ্ধ অপর দুজন ফেমাস ডিজেল সার্ভিসের কর্মচারী। এক সময় ফেমাস ডিজেল সার্ভিস ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রাজীব ও সোহাগ নামের দুই মাদকাসক্ত কর্মচারীকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে নিহত ব্যবসায়ী সুমন মিয়া আড়াই লাখ টাকা দিয়েছিলেন। সেই টাকা চাওয়ার সূত্রধরে রাজীব ও সোহাগ রাতে ঘরের বাইর থেকে তালা লাগিয়ে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনাটি ঘটায় বলে পুলিশ ও নিহত সুমনের পরিবারের অভিযোগ। অগ্নিসংযোগকারীদের শনাক্ত করে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

বুধবার দিবাগত রাত পৌনে চারটার দিকে রাজধানীর ওয়ারী থানাধীন ধোলাইখালের নারিন্দা সড়কের ২ নম্বর হাজী ম্যানশনের তৃতীয় তলা বাড়ির দ্বিতীয় তলায় মর্মান্তিক এ ঘটনাটি ঘটে। আগুনে সুমন মিয়া (৪০), সাকিব (২১) ও শহীদ (১৮) মারাত্মক দগ্ধ হয়। দগ্ধদের সকাল সাড়ে ৬টায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের আইসিইউতে ভর্তি করে পুলিশ। চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুপুরে সুমন মিয়ার মৃত্যু হয়।

সুমনের চাচা ইয়াসিন মিয়া জনকণ্ঠকে বলেন, সুমনের পিতার নাম ইসমাইল হোসেন (মৃত)। বাড়ি পুরান ঢাকার সিএমএম কোর্ট এলাকার রায়সাহেব বাজারে। সুমন তার স্ত্রী মিনারা বেগমকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি মুন্সীগঞ্জ জেলার টঙ্গীবাড়ি থানাধীন উত্শী ইউনিয়নের মীর্জানগর গ্রামে বসবাস করতেন। সুমনকে রায়সাহেব বাজার এলাকার কবরস্থানে দাফনের কথা। তিন ভাই এক বোনের মধ্যে সুমন দ্বিতীয় ছিল। নিহতের একমাত্র ছেলে সোহাগ মীর্জানগর গ্রামের স্কুল থেকে এবার জেএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। একমাত্র মেয়ে সেই গ্রামের একটি স্কুলের সোহানা সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রী।

সাকিবের বোনজামাই ফরহাদ খান জনকণ্ঠকে বলেন, সাকিবের পিতার নাম আলতাফ শিকদার। বাড়ি শরীয়তপুর জেলার ভেদরগঞ্জ থানাধীন লাকাতা গ্রামে। দুই ভাই এক বোনের মধ্যে সাকিব দ্বিতীয়।

শহীদের পিতা সুলাইমান জনকণ্ঠকে বলেন, তাদের বাড়ি নোয়াখালী জেলার সেনবাগ থানাধীন মৌতবী গ্রামে। তিন ছেলে এক মেয়ের মধ্যে শহীদ দ্বিতীয়।

হাজী ম্যানশন নামের বাড়িটি নারিন্দা ট্রাকস্ট্যান্ড লাগোয়া। বাড়ির নিচে ফেমাস ডিজেল সার্ভিস নামের একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। মূলত সেখানে গাড়ির জ্বালানি পাম্প মেরামতের কাজ হয়। সেখানে লেদ মেশিনও রয়েছে। বাড়িটিতে ওঠার সিঁড়ি রয়েছে। আগুনে কক্ষের দরজা জানালার কাঁচ ভেঙ্গে গেছে। কক্ষে তেমন কোন আসবাবপত্র ছিল না।

ফেমাস ডিজেল সার্ভিস নামের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটির মালিক রফিক মিয়া জনকণ্ঠকে বলেন, প্রায় ১৫ বছর ধরে এ ব্যবসা করছি। নিহত সুমন মিয়া ফেমাস ডিজেল সার্ভিসের কর্মচারী ছিল। তা প্রায় ৫ বছর আগের কথা। পরে নিজেই ধোলাইখালে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলে বসেন। তারপরও প্রতিদিনই সুমন ফেমাস ডিজেল সার্ভিসে যাতায়াত করতেন।

সুমন যখন ফেমাস ডিজেল সার্ভিসে চাকরি করত, তখন সুমনের সঙ্গে শরীয়তপুরের ছেলে রাজীব ও সোহাগও চাকরি করত। একত্রে চাকরি করার কারণে তাদের মধ্যে সুসর্ম্পক গড়ে ওঠে। রাজীব ও সোহাগ পিতার মতো সম্মান করতো সুমন মিয়াকে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে রাজীব ও সোহাগ মাদকাসক্ত ছিল। মাদক সেবনের কারণে প্রায়ই সুমন মিয়া শাসন করত রাজীব ও সোহাগকে। একবার তাদের পুলিশেও দিয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল তাদের নেশার পথ থেকে সরিয়ে ভাল পথে আনা। সুসর্ম্পকের সূত্রধরেই প্রায় ৫ বছর আগে সুমন মিয়া ব্যবসা শুরু করে রাজীব ও সোহাগকে সঙ্গে নিয়ে। তারা ধোলাইপাড়ে একটি যৌথ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালাচ্ছে। ব্যবসার পুঁজির ৩ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকার মধ্যে আড়াই লাখই সুমন মিয়ার।

সুমন পরিবারের সঙ্গে মুন্সীগঞ্জ থাকে। যে কারণে নিয়মিত ঢাকায় এসে ব্যবসা তদারকি করত পারছিল না। এজন্য সুমন তার দেয়া আড়াই লাখ টাকা ফেরত চায়। এ নিয়ে তাদের মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে দ্বন্দ্ব চলছিল। সেই দ্বন্দ্বের সূত্রধরেই রাজীব ও সোহাগ সুযোগ বুঝে সুমনকে পুড়িয়ে হত্যার উদ্দেশেই কক্ষের বাইরে তালা লাগিয়ে ভেতরে পেট্রোল বা গানপাউডার ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিতে পারে। ছেলের মতো ভালবেসে শেষ পর্যন্ত সোহাগ আর রাজীবের দেয়া আগুনে পুড়েই মরতে হলো সুমন মিযাকে। এমন অমানুষদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া জরুরী। নিহত সুমনের পরিবারও এমন অভিযোগ করেছেন। তারাও হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেছেন।

পুলিশ জানায়, উদ্ধারকালে ঘরের বাইরে ২টি তালা লাগানো ছিল। ঘরের জানালার কাঁচ ভাঙ্গা ছিল। বাইর থেকে সিঁড়ি বেয়ে কেউ উপরে উঠে জানালা ভেঙ্গে পেট্রোল বা গানপাউডার দিয়ে আগুন দিয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে পুলিশ। হত্যাকারী হিসেবে রাজীব ও সোহাগকে অন্যতম সন্দেহভাজন হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।

এ ব্যাপারে ওয়ারী বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মেহেদী হাসান জনকণ্ঠকে বলেন, এ ঘটনায় কোন মামলা হয়নি। তবে প্রক্রিয়া চলছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত আছে।