২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মুক্তিযুদ্ধ সাহিত্যে, সেলুলয়েডে শিল্প থেকে শিল্প

  • রহমান মতি

স্বাধীনতাহীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে

কে বাঁচিতে চায়?

দাসত্ব শৃঙ্খল বলো কে পরিবে পায় হে

কে পরিবে পায়।

কোটিকল্প দাস থাকা নরকের প্রায় হে,

নরকের প্রায়

দিনেকের স্বাধীনতা, স্বর্গ-সুখ তায় হে,

স্বর্গ-সুখ তায়।

-স্বাধীনতা, রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়

পরাধীনতা কেউই চায় না। পরাধীনতায় লজ্জা আছে তাই স্বাধীনতার গৌরব সবারই আরাধ্য। পথের শিশু, খাঁচার পাখি বা রূপকথার সুয়োরানী দুয়োরানী সবারই স্বাধীনতার জন্য হৃদয় কাঁদে। একটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অর্জন তার স্বাধীনতা আর সে অর্জন যদি সর্বশ্রেষ্ঠ ত্যাগ বা সংগ্রামের মাধ্যমে হয় তবে তা আরও বড় সম্মানের বিষয়। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্বাধীনতা একটি দীর্ঘ পথ-পরিক্রমার ফসল। এর বীজ সেই পলাশীর যুদ্ধ থেকেই শুরু“যখন নবাব সিরাজউদ্দৌলা ‘বাংলাদেশ’ নামে একটি স্বাধীন দেশের আকাক্সক্ষা লালন করতেন। নবাব জানতেন বাংলা ও বাঙালীর জন্য একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন দেশ দরকার যেখানে বাঙালীর জনপদ থাকবে, বসবাস থাকবে, হাসি-কান্নার দৈনন্দিন জীবনগাথা থাকবে। এভাবেই ইতিহাস দীর্ঘ একটি পথ পাড়ি দিয়ে যখন বিশ শতকে প্রবেশ করে তখনই ভাষা নিয়ে স্বতন্ত্র সংগ্রাম শুরু“হয়। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ছেষট্টির ছয় দফা কিংবা ঊনসত্তরের গণঅভ্যূত্থান সব আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতেই একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ আমাদের চূড়ান্ত একটি স্বাধীন রাষ্ট্র এনে দেয়। যে বীজটি বাঙালীরা উনিশ শতকেই মানসিকভাবে লালন করতেন তাকেই সংগ্রামের মাধ্যমে বিশ শতকের একাত্তরে পূর্ণতা দেয়া হয়।

সুদীর্ঘ এই স্বাধীনতা আন্দোলনকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছে দিতে কবি লিখেছেন কবিতা, গল্পকার লিখেছেন গল্প, ঔপন্যাসিক লিখেছেন উপন্যাস, নাট্যকার লিখেছেন নাটক আর এভাবেই চলচ্চিত্রকার নির্মাণ করেছেন চলচ্চিত্র। এক শিল্প থেকে আর এক শিল্পের অভিযোজনে এই মিশে যাওয়াকে এক একটি অবেগ বা ভালোবাসার প্রতিফলন বলতে হয়। কারণ যখন সাহিত্যিক তাঁর চেতনা বা দর্শন থেকে মুক্তিযুদ্ধকে তাঁর হৃদয়ে ধারণ করছেন তাঁর চেতনা বা দর্শনকে উপলব্ধি করার প্রয়াস থেকে একজন চলচ্চিত্রকার নির্মাণ করেন চলচ্চিত্র। লেখকের চেতনা নির্মাতার চেতনা হয়ে আরেকটা নতুন শিল্পের জন্ম দেয়। মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে জাতীয়ভাবেই আমাদের আবেগ আছে। সে আবেগ লেখক থেকে চলচ্চিত্র নির্মাতায় গড়ালে আমাদের মনকে স্পর্শ করে। এ রকম কিছু মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র নিয়ে দুটি কথা বলব আজ। এ চলচ্চিত্রগুলোতে লেখক থেকে চলচ্চিত্রে একটা গভীর স্পর্শ আছে। মুক্তিযুদ্ধকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছানোর জন্য এ চলচ্চিত্রগুলো চেতনা হিসেবে কাজ করে।

হাঙর নদী গ্রেনেড (১৯৯৭)

সেলিনা হোসেনের বিখ্যাত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস। এ উপন্যাসটি সত্যজিৎ রায়ের মতো বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্রকারকে মুগ্ধ করেছিল এবং তিনি এ চলচ্চিত্রটি নিজে বানাতে চেয়েছিলেন। পরে আমাদের দেশের অসাধারণ নির্মাতা চাষী নজরুল ইসলাম বানিয়েছিলেন। সেলিনা হোসেন তাঁর লেখনীর আবেগ বরাবরের মতো এ উপন্যাসেও গভীরভাবেই রেখেছিলেন। তিনি উপন্যাসের শেষের দিকে রইসকে পাকিস্তানি হানাদারের হাতে মায়ের উৎসর্গ হিসেবে বড় একটি সমালোচনার মধ্যেও পড়েছিলেন। যেখানে তাকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের একটা অভিযোগের মুখে পড়তে হয়েছিল। তিনি এর জবাবও দিয়েছেন চমৎকারভাবে। মা তাঁর দেশের জন্য সন্তানকে উৎসর্গ করেছে এবং মুক্তিযোদ্ধাকে বাঁচানোর জন্যই এটা করা হয়েছিল। এই জবাবটি সুযোগ্য। রইসের প্রতিবন্ধী স্বভাবে তার অক্ষমতাকে দেখানোর পাশাপাশি দেশের জন্য মায়ের সংগ্রামে অপর দুই ছেলেকে মুক্তিযুদ্ধে পাঠানোর ইচ্ছাও সংগ্রাম ছিল। হলদী গাঁয়ের বিবর্তন কিংবা মায়ের শৈশব, যৌবন, বিয়ে বা বিধবা হওয়ার পর নতুন সংগ্রাম এরপর শেষ জীবনে মুক্তিযুদ্ধ দেখার অভিজ্ঞতা এসব মিলিয়ে উপন্যাসের বুনিয়াদ শক্ত হয়েছে। উপন্যাস থেকে চলচ্চিত্রে চাষী নজরুল ইসলাম যেন আরও জীবন্ত করে হলদী গাঁয়ের বিবর্তনকে দেখালেন। তিনি হলদী গাঁয়ের সেই মাকে তার শৈশব, যৌবন ও বিয়ের পর কিছুদিন ভাল দিন গেলে সন্তান হওয়ার পরে যখন বোবাকালা সন্তান জন্ম নিল জীবনের সংগ্রামটি তখনই শুরু“হলো। দিনে দিনে সেই বোবাকালা রইসকে নিয়ে তার বেদনা বাড়তে থাকে। একসময় দেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু“হলে মায়ের জীবনে নতুন পরীক্ষা শুরু হয়। চলচ্চিত্রে গ্রামের জীবন ছবির মতো জীবন্ত। পরিবারটির বিবর্তনও ছবির মতোই পাল্টে যায়। মায়ের চরিত্রে সুচরিতা ছিল অসাধারণ। তার নববধূ বা মা হওয়ার পরে যে স্বাভাবিক জীবন ছিল তার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের সময় চুল পেকে যাওয়া বয়স্ক সুচরিতার তফাতটি জীবন্ত ছিল। সন্তানকে উৎসর্গ করতেই তার বাকি জীবন চলে যায়। সলিমকে মুক্তিযুদ্ধে পাঠানোর সময় মায়ের স্বাভাবিক আকুতি দেখে চোখে জল আসে। কলিমকে যখন বাড়ির উঠোনে হানাদাররা গুলি করে যায় সুচরিতার পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার অভিনয় যে কারও চোখ ভেজাবে। শেষের দিকে দুই মুক্তিযোদ্ধাকে বাঁচাতে মা সুচরিতা তার প্রতিবন্ধী ছেলে রইসের হাতে বন্দুক তুলে দেয়। কিন্তু রইস তো জানে না কীভাবে বন্দুক চালাতে হয় তাই হানাদারের হিংস্র এক্সপ্রেশনের সামনে সে তার স্বভাবসুলভ নিষ্পাপ মূর্তি নিয়ে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকে। হানাদাররা তাদের স্বাভাবিক কাজটি করে চলে যায়। আর সুচরিতাকে বলে ‘হে বুড়িয়া তু সাচ্চা পাকিস্তানি হ্যায়, তুঝে বহুত ইনাম মেলেগা’। পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শক্তি এভাবেই তাদের উপনিবেশ কায়েম করতে চাইত মানসিকভাবে। তারা মনে করত তাদের চেতনায় তখন অনেক মা এভাবে সন্তান বিসর্জন দিত কিন্তু মা তো মুক্তিযোদ্ধাকে বাঁচাতে সন্তানকে বিসর্জন দিয়েছে। তাই ছেলের লাশ রেখে মুক্তিযোদ্ধাদের বলে ‘যুদ্ধ ঐদিকে’। অরুণা বিশ্বাসের লিপে ‘শিকল ভাঙার গান গেয়ে যা প্রাণেরই একতারা’ গানটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রকাশ। পুরো চলচ্চিত্রটি আবেগী এবং গায়ে কাঁপন ধরিয়ে দেয়। যেন দর্শক প্রত্যেকেই তখন মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার একটি চেতনায় ডুবে যায়। উপন্যাস থেকে চলচ্চিত্রে এসে তাই এ শিল্প হয়ে ওঠে আরও আবেদনময়।

আগুনের পরশমণি (১৯৯৪)

হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস থেকে তাঁরই নির্মিত কালজয়ী চলচ্চিত্র। উপন্যাসটি মুক্তিযুদ্ধের বাস্তবতাকে উপন্যাসের ফরম্যাট অনুযায়ী একটি ‘পার্ট’ অংশ থেকে ‘ডিটেইল’ অংশের দিকে পাঠককে নিয়ে যায়। এখানে লেখক হুমাযূন আহমেদ এক্সপেরিমেন্ট করেন পার্ট থেকে ডিটেইলের সমগ্র অবস্থাকে সাসপেন্সের মাধ্যমে জীবন্ত করতে। আর চলচ্চিত্রকার হুমায়ূন আহমেদ এক্সপেরিমেন্ট করেন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের। সেখানে একটি বাড়ির মধ্যেই আটকে থাকা পরিবারের গুটিকয়েক সদস্য যে পরিস্থিতিকে সাক্ষী করে মুক্তিযুদ্ধকে দেখে যায় তার মধ্যে একসঙ্গে অনেককিছু মেলে। বাড়িটিতে আসা মুক্তিযোদ্ধা আসাদুজ্জামান নূরকে ঘিরে নতুন গল্প শুরু“হয় যা ঐ গল্পেরই একটি সম্প্রসারিত রূপ। বাড়ির বড় মেয়ে বিপাশা যখন জানতে পারে ছেলেটি মুক্তিযোদ্ধা তার অনুশোচনা হয় আগের রূঢ় ব্যবহারের জন্য। আর ছোট মেযে শিলা তো জেনেই গেছে সব। তাই ডিমের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধার ছবি এঁকে হাতে একটি পতাকা দিয়ে উপহার দেয় নূরকে। বন্ধ ঘড়ি, খাঁচায় বন্দী পাখি দেখিয়ে বলে ‘সেগুলো মুক্ত করা হবে দেশ স্বাধীন হলে’। এটাই তো এক্সপেরিমেন্ট যেখানে এই ক্ষুদ্রকে দিয়ে বৃহৎকে ধরার অসামান্য প্রয়াস আছে। আবুল হায়াতকে পাকিস্তানী হানাদাররা রাস্তায় আটকালে সরকারী কর্মচারী বলে পরিচয় দেন তিনি। তখন আইডি কার্ড দেখাতে বললে প্রথমে না পেয়ে পরে পান আর আসার সময় রিক্সাওয়ালার ওপর করা পাকবাহিনীর অত্যাচারে ব্যথিত হন। নিজের কলার আঁটিটি রিক্সাওয়ালার মুখের কাছে রেখে আসেন। এই মানবতাও চলচ্চিত্রকারের দেখানোর বিষয় ছিল। পরিস্থিতি বোঝানোর জন্য সালেহ আহমেদের চায়ের দোকানদারের চরিত্রটি চেতনার। উনি দোকানে ইয়াহিয়া খানের ছবি রাখেন ব্যবসা করা অস্তিত্ব রক্ষার জন্য। হানাদার চলে গেলে একদলা থু থু দি আবার পরিষ্কার করেন। এ চরিত্রে পাকিস্তানী শক্তির প্রতি ঘৃণা ও দেশের প্রতি ভালবাসা দুই-ই আছে গভীরভাবে। নূর জিপে করে একটা পাকিস্তানী মিছিলের সামনে দাঁড়ালে রাস্তার পাশের ভিক্ষুকও থু থু দেয়। এর মধ্যেই চেতনা আছে, আছে পরিস্থিতির সঙ্গে জীবন বাঁচানোর চেষ্টা। নূর গুলি খেয়ে বাসায় এলে তাকে বাঁচানোর সাধনায় যখন সবাই কাজ করে চলচ্চিত্রটি তখন আরও একটা মোড় পায়। মুক্তিযোদ্ধাকে ঘিরে পারিবারিক বা রাষ্ট্রীয় সম্মানের যে জায়গায় উপন্যাসটি কথা বলে ঐ একই জায়গায় চলচ্চিত্রটিও কথা বলে। তাই শেষ সিকোয়েন্সে ভোরের আলো দেখানোর জন্য বিপাশা ঘরের জানালা খুলে বলে ‘এত সুন্দর একটা সকাল আপনি দেখবেন না!’ এ আবেদন সর্বাত্মক।

একাত্তরের যীশু (১৯৯৩)

শাহরিয়ার কবিরের উপন্যাস থেকে নাসির উদ্দিন ইউসুফ নির্মিত অসাধারণ চলচ্চিত্র। উপন্যাসটি জেলেপাড়ার স্বাভাবিক জীবনযাত্রা নিয়ে শুরু হয় যেখানে জীবন ছিল ছন্দময়। গ্রামটি ছিল খ্রীস্টানপ্রধান। গির্জায় ঘণ্টা বাজাত ডেসমন্ড যিনি উপন্যাসের প্রধান চরিত্র। কেয়ারটেকার ডেসমন্ড গির্জায় তার দায়িত্ব ভালই পালন করছিল। একদিন গ্রামে যুদ্ধ চলে এলে অনেকেই দেশ ছেড়ে পালায়, অনেকে শহীদ হয়। শহরে যে মানুষগুলো যুদ্ধ করছিল তারা ঘটনাক্রমে এ গির্জায় এলে জেলেপাড়ার মাস্টার সবাইকে এক করে সেবা করতে বলে মুক্তিযোদ্ধাদের। গির্জা থেকে ওষুধ দেয়া হয়, খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। তাঁবু থেকে অনেকেই ভারতে চলে গেলে একটা বোবা মেয়ে রয়ে যায় আর তাকে ঘিরেই ডেসমন্ড যীশুর গল্প শোনায়। যে নিজেই যীশুর মতো মানবতা নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের আগলে রেখেছেন শেষের দিকে তিনিই জীবন বাঁচাতে এ্যাম্বুশে ধরা পড়ে পাকবাহিনীর কাছে মুক্তিযোদ্ধাদের চেতনার কথা অস্বীকার করে। বিবেক তাকে দংশন করে। ক্রশের সামনে দাঁড়িয়ে ডেসমন্ড তখন নিজেকে মনে মনে নানা প্রশ্নই করে। এরপরে আসে স্বাধীনতা। চলচ্চিত্রে হুমায়ুন ফরীদি ডেসমন্ডের চরিত্রে তাঁর শ্রেষ্ঠ অভিনয়শৈলী দেখান। ন্যাচারাল অভিনয়ের জায়গাগুলোকে যেমন বোবা মেয়েটিকে যীশুর গল্প শোনানো বা পাতার বাঁশি বাজিয়ে শোনানোর অভিনয়, মুক্তিযোদ্ধাদের দেখাশোনা করার অভিনয়, পাকবাহিনীর হাতে ধরা পড়ার পরে জীবন বাঁচানোর জন্য মিথ্যে বলার অভিনয় কিংবা ক্রশবিদ্ধ বালকের সামনে বসে তার হাহাকারের অভিনয় দেখে গা শিউরে ওঠে। নাসির উদ্দিন ইউসুফ বরাবরের মতোই মঞ্চের পরিশ্রম তার চলচ্চিত্রে রাখেন। তাই তার ফাদার চরিত্রের পিযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিনয়ে সে পরিশ্রম আছে, হুমায়ুন ফরীদির অভিনয়েও তাই। শেষের সিকোয়েন্স ফরীদি দেখতে পাচ্ছে স্বাধীনতা এসে গেছে, কিছু শিশু-কিশোরের হাতে পতাকা দেখে তার মুখ উজ্জ্বল হয়। মূলত সমগ্র মুক্তিযুদ্ধের বেদনামাখা স্মৃতির সঙ্গে স্বাধীনতার জন্য অপেক্ষমাণ ডেসমন্ডের চিত্রই এ চলচ্চিত্রটিতে জীবন্ত। উপন্যাস থেকে চলচ্চিত্র এখানেও মহিমা পেয়েছে শক্তিশালী অভিনয় আর নির্মাণের সরলতা থেকে।

মেঘের পরে মেঘ (২০০৪)

রাবেয়া খাতুনের উপন্যাস থেকে চাষী নজরুল ইসলামের চলচ্চিত্র। ‘মেঘের পরে মেঘ’ নামটি মূলত ক্রান্তিকালের পুনরাবৃত্তিকে দেখায় উপন্যাস ও চলচ্চিত্রে। মায়ের কাছে বাবার মুক্তিযোদ্ধা ও রাজাকার দুই ধরনের দ্বন্দ্ব নিয়ে রচিত উপন্যাস। শেষে ছেলের কাছে পরিষ্কার হয় মুক্তিযুদ্ধকালীন বাস্তবতাটি নির্মম ছিল। উপন্যাসের সঙ্গে চলচ্চিত্রের আবেদন চাষী নজরুল ইসলামের ঝানু নির্মাণেই সম্ভব হয়েছে। চাষী নজরুল ইসলাম তাঁর মতো করে নির্মাণ করেছেন যেখানে একটি পরিবার, বন্ধুত্ব, ত্যাগ, বীরত্ব সবই ফুটে উঠেছে। মাজেদ পরিস্থিতির স্বীকার হয়ে মিথ্যে বলে জীবন রক্ষা করতে চাইলে সে রাজাকারের পরিচিতি পায় এবং তাকে হত্যা করা হয়। মৃত্যুর আগে মাজেদ তার পরিবারকে বাঁচাতে একইরকম দেখতে সেজানকে যেতে বলে তারই গ্রামে। গ্রামে যাওয়ার পরে সেজান মাজেদের স্ত্রীকে রক্ষা করে গ্রাম্য ফতোয়াবাজদের হাত থেকে। এরপর মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী নতুন জীবন সংগ্রাম শুরু“হয়। সে জীবনে আলোর পরশ এলেও তা দীর্ঘ হয় না একসময় মাজেদের রাজাকার পরিচয় লোক মারফত জানাজানি হলে সেজানও রাজাকারের পরিচিতি পায় সে গ্রামে। অতঃপর সুযোগ বুঝে বিরুদ্ধবাদীরা সেজানকে ফাঁসিতে ঝোলায় গাছের ডালে।এ এক মর্মান্তিক ঘটনা।

চলচ্চিত্রের আবেদনকে দর্শকের কাছে পৌঁছে দিতে চাষী নজরুল ইসলাম অভিনয়শিল্পীদের ওপর আস্থা রাখতেন। তাঁর অভিনয়শিল্পীরা সেটি পারত ভালভাবেই। মাজেদ ও সেজান চরিত্রে রিয়াজকে অসাধারণ মানায়। রিয়াজের অভিনয়ের ন্যাচারালিটি তাই প্রমাণ করে। তার সঙ্গে পূর্ণিমার ইনোসেন্ট লুকের অভিনয়ে তার কাজটা সে যোগ্যভাবেই করেছে। চলচ্চিত্রের গুরুত্বপুর্ণ চরিত্রে রিয়াজের বন্ধু মাহফুজও সেজানকে সঙ্গ দেয়ার জন্য খুব ভাল নির্বাচনেএ চলচ্চিত্রের ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক সবচেয়ে উল্লেখযোগ্যদিক। মুক্তিযুদ্ধের অপারেশন দেখাতে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক যেমন শক্তিশালী তেমনি রিয়াজকে ফাঁসিতে ঝোলানো শেষ সিকোয়েন্সে মর্মস্পর্শী সে মিউজিক। ভয় ধরানো বা বুকে এসে লাগে এমন মিউজিক দিয়ে সিকোয়েন্সকে বাস্তসম্মত করানো হয়েছে। রিয়াজের চোখ দুটি বড় হয়ে আসে আর শহীদুল আলম সাচ্চু ও গ্রামবাসীর বীভৎস মুখগুলোকে ভয়ঙ্করভাবে তুলে ধরা হয়। পূর্ণিমাও তার শেষ সিকোয়েন্সে বৃদ্ধা বয়সে স্বামীর জন্য আকুলতা তুলে ধরাতে গাছের দিকে তাকিয়ে যখন এক্সপ্রেশন দিচ্ছিল সেটি ছিল অসাধারণ। অভিনয় আদায় করাতে পরিচালকের মুন্সিয়ানা আছে। চলচ্চিত্রটি মুক্তিযুদ্ধকে হৃদয়গ্রাহী করে এভাবেই।

গেরিলা (২০১১)

সৈয়দ শামসুল হকের উপন্যাস ‘নিষিদ্ধ লোবান’ থেকে নাসির উদ্দিন ইউসুফ নির্মিত অসাধারণ চলচ্চিত্র। উপন্যাসটি নারীর বীরত্ব ও আত্মদান করার একটি গল্প। বিলকিস তার জীবন সংগ্রামে স্বামীহারা হয়ে মুক্তিযুদ্ধে কাজ করা শুরু করে। প্রথমে সুনির্দিষ্ট একটা জায়গায় চলচ্চিত্রটি থাকলেও পরে বিলকিসের গ্রামে যাত্রা করার মাধ্যমে -এর বিস্তৃতি ঘটে। পাকবাহিনীর হাতে ধরা পড়ার আগে আপনজন হারানোর ব্যথা তাঁকে আঘাত করে। পাকবাহিনীর হাতে অসমম্মান হওয়ার আগে গ্রেনেডের আঘাতে নিজে আত্মাহুতি দিয়ে মিলিটারি ক্যাম্প উড়িয়ে দেয়।

এ গল্পের সঙ্গে চলচ্চিত্রটি যুক্ত হয় আরও কিছু এক্সপেরিমেন্টে। মুক্তিযুদ্ধের অন্যান্য অনেক চলচ্চিত্রে পাকবাহিনীর হিংস্রতার অনেক চিত্রই ততটা হিংস্র করে দেখানো হয় না। এখানে সে কাজটি করা হযেছে। মুক্তিযোদ্ধা বা সাধারণ মানুষকে জবাই করার বাস্তবতা যে হিংস্রভাবে ছিল তখন সে দৃশ্যগুলো এ চলচ্চিত্রে দেখানো হযেছে। স্টিল লাইফের চিত্রগুলো ছবির মতো ধরা দিয়েছে। জয়া আহসানের অনবদ্য অভিনয়ে বিলকিস চরিত্রটি জীবন্ত। স্বামীহারা হযে তসলিম সর্দারের (এটিএম শামসুজ্জামান) বাড়িতে থাকা আর চাকরি করার পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধে নারী অংশগ্রহণের বিষয়টি উপন্যাসের সঙ্গে চলচ্চিত্রটিতেও বিশেষ দিক। পাকবাহিনীর সঙ্গে হাসিখুশি ব্যবহার করে যখন তাদের পার্টিতে যায় জয়া আহসান ও তার সঙ্গী শম্পা রেজা তখন বোমা সেট করার পরে শম্পাকে রেখে চলে আসার সময় যে অভিনয় ছিল জযার তা অসাধারণ। এমন আত্মাহুতি বা ত্যাগ অনেক আছে নারীদের। এভাবে শেষ সিকোয়েন্সে পাকবাহিনীর শতাব্দী ওয়াদুদের সঙ্গে ফেস টু ফেস অভিনয়ে গ্রেনেড হাতে জয়া আহসানের অভিনয় জাদুকরী ছিল আর শতাব্দীর প্রথমদিকের নারীলোভী এবং সে মুহূর্তের মৃত্যুভয়ে ভীত অভিনয় ছিল দেখার মতো। গেরিলা বাহিনী যেভাবে মুক্তিযুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে অংশ নিত সে রকম অংশগ্রহণ মূলত এ চলচ্চিত্রে মানসিকভাবে চেতনা ধারণ করার মাধ্যমে সংগ্রামী হওয়ার কথা বলে।

মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্য সমগ্রভাবেই আমাদের জাতীয় শ্রেষ্ঠ ইতিহাসকে তুলে ধরে আর চলচ্চিত্রে সে ইতিহাস প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছে যায়। শিল্প থেকে শিল্প এভাবেই ঋণী করে যায়। তৈরি হয় পাঠক-দর্শক মেলবন্ধন।