২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

৮ ডাকাত নিহত ॥ আড়াইহাজারে বিক্ষুব্ধ জনতার গণপিটুনি

  • ডাকাতদের ব্যবহৃত ট্রাক জব্দ;###;মসজিদের মাইকে আহ্বান শুনে গ্রামবাসী এগিয়ে এসে ডাকাতদের ঘেরাও করে;###;ধরা পড়েছে ১২ জন

শংকর কুমার দে/খলিলুর রহমান ॥ ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জ জেলাধীন আড়াইহাজার উপজেলার সাত গ্রাম ইউনিয়নের পুরিন্দা বাজারের ভাই ভাই স্টোর নামক চালের আড়তে ডাকাতি করার সময়ে বিক্ষুব্ধ জনতার গণপিটুনিতে সন্দেহভাজন আট ডাকাত নিহত হয়েছে। গণপিটুনিতে আহত আরও অন্তত চারজনের অবস্থাও গুরুতর। বৃহস্পতিবার ভোরে অন্তত পঁচিশ জনের এক দল ডাকাত ট্রাকযোগে এসে ভাই ভাই স্টোরের চালের আড়তে ডাকাতির সময়ে মসজিদ থেকে মাইকযোগে ‘ডাকাত-ডাকাত’ বলে চিৎকার করলে গ্রামবাসী এসে ডাকাত দলকে ধাওয়া দেয়। নিরুপায় ডাকাত দলের সদস্যরা পার্শ¦বর্তী পুকুরে পড়ে গেলে সেখান থেকে ধরে এনে গণপিটুনি দিলে ঘটনাস্থলেই ডাকাত দলের সাতজন নিহত হয় এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও এক ডাকাতসহ আট ডাকাত নিহত হয়। ঘটনাস্থল থেকে সন্দেহভাজন ডাকাতদের ব্যবহার করা ট্রাকটি (ঢাকা মেট্রো-ট-১৮-৪৩১১) জব্দ করা হয়েছে। ডাকাতির ঘটনার খবর পেয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলার পুলিশ সুপার ড. খ. মহিদ উদ্দিন, পুলিশ সুপার (বি সার্কেল) মোঃ জহিরুল ইসলামসহ পুলিশ কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন, জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। এই ঘটনায় আড়াইহাজার থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার ড. খ. মহিদ উদ্দিন ডাকাতির ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বলেছেন, আটক হওয়া আহত ব্যক্তিরা পুলিশকে জানিয়েছে, তারা সংঘবদ্ধ ডাকাত দলের সদস্য। তাদের দলে অন্তত ২৫ জন ছিল। তাদের দলনেতার বাড়ি ময়মনসিংহের ত্রিশাল অঞ্চলে। আটক হওয়া ব্যক্তিরা ডাকাত দলের সদস্য এবং তারা ডাকাতি করতে এসেছিল- এই কথা স্বীকার করেছে। তিনি সাংবাদিকদের জানান, নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার একটি ডাকাতপ্রবণ এলাকা। এখানে আগে প্রায় প্রতিদিনই কোননা কোন বাড়িতে ডাকাতির ঘটনা ঘটত। তবে পুলিশ বেশ কয়েক ডাকাতকে গ্রেফতার করার কারণে এক-দেড় বছর ধরে ডাকাতির ঘটনা অনেক কমে এসেছে। প্রায় ১৫ দিন আগে আরও একটি চালের আড়তে ডাকাতির ঘটনা সংঘটিত হয়। এ জন্য মানুষ ডাকাতদের ওপর ক্ষুব্ধ ছিল। সংঘবদ্ধ আন্তঃজেলা ডাকাতদের একটি চক্র ঢাকায় একত্রিত হয়ে এ ডাকাতির চেষ্টা করে যাচ্ছিল। ডাকাতির ঘটনাটি পুলিশ তদন্ত করছে। এর পেছনে অন্য কোন কারণ আছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

পুলিশ ও এলাকাবাসীর সঙ্গে আলাপ হলে তারা জানান, বৃহস্পতিবার ভোর সাড়ে চারটার দিকে একদল লোক একটি মালবাহী ট্রাক নিয়ে আসে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশের আড়াইহাজার উপজেলাধীন পুরিন্দা বাজারে। ধারালো অস্ত্রের মুখে বাজারের নিরাপত্তা প্রহরী জামান, নিয়ত আলীকে ও মোতালেবের হাত-পা-মুখ বেঁধে ফেলে ডাকাত দলটি। এরপর ডাকাত দলটি গফুর ভূঁইয়ার চালের আড়তের তালা ভাঙে। চালের আড়ত থেকে তারা চাল তুলতে থাকে তাদের সঙ্গে নিয়ে আসা ট্রাকে। ট্রাকের প্রায় অর্ধেক পর্যন্ত চাল বোঝাই করে ফেলে ডাকাত দল। একপর্যায়ে নিরাপত্তা প্রহরী জামান তার বাঁধন খুলতে সক্ষম হন। তিনি পালিয়ে গিয়ে স্থানীয় লোকজনকে ডাকাতির খবর দেন। পুরিন্দা বাজার জামে মসজিদের মাইকে ডাকাত-ডাকাত বলে চিৎকার করে গ্রামবাসীসহ সবাইকে এগিয়ে আসার জন্য আহ্বান জানান। মাইকের ঘোষণা শুনে এলাকার লোকজন জড়ো হয়ে ডাকাতদের ঘেরাও ও ধাওয়া করে। এর মধ্যে ডাকাত দলের সদস্যরা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টার পর্যায়ে কয়েকজন পাশের পুকুরে পড়ে যায়। পুকুর থেকে তুলে বিক্ষুব্ধ জনতা পিটুনি দেয়। ঘটনাস্থলেই অন্তত সাত ডাকাত নিহত হয়।

নারায়ণগঞ্জের সহকারী পুলিশ সুপার (বি সার্কেল) মোঃ জহিরুল ইসলাম বলেছেন, গণপিটুনিতে ঘটনাস্থলে সাতজন এবং হাসপাতালে আরেকজন মারা যায়। তাদের নাম-পরিচয় প্রাথমিকভাবে জানা যায়নি। আহত চারজনের মধ্যে তিনজনের অবস্থা গুরুতর। পুলিশের প্রহরায় তাদের হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। আরেকজনকে থানায় রাখা হয়েছে।

ডাকাত দলের হাত থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম নিরাপত্তা প্রহরী জামান বলেন, আরেক প্রহরী মোতালেবের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছিলেন তিনি। ট্রাকযোগে আসা ব্যক্তিরা এসে তাদের বলেন, গফুরের দোকানের চাল নিয়ে আসা হয়েছে। প্রহরীদের সহযোগিতা চায় তারা। কথা বলার একপর্যায়ে তারা দুই প্রহরীকে বেঁধে ফেলে। এরপর তারা আড়তের তালা ভেঙ্গে চালভর্তি বস্তা তুলতে থাকে তাদের সঙ্গে আনা ট্রাকে। এ সময়ে কৌশলে হাত ও পায়ের বাঁধন খুলে মুক্ত হয়ে দৌড়ে গ্রামে চলে এসে এলাকাবাসীকে ডাকাতির খবর দেয়।

ডাকাতির ঘটনার পরে সরেজমিনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে দেখা যায়, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে অবস্থিত পুরিন্দা বাজারটি কয়েক শ’ দোকান আছে। এর মধ্যে ডাকাত দলটি পুরিন্দা বাজারে অবস্থিত চালের আড়ত ভাই ভাই স্টোর নামক দোকানটিকে বেছে নেয় ডাকাতির জন্য। ডাকাতি ও গণপিটুনিতে হতাহতের খবর শুনে পুরিন্দা বাজার ও আশপাশের এলাকায় শত শত লোক ভিড় জমিয়েছে।

ডাকাতির ঘটনাস্থল পুুরিন্দা বাজারটি যেই ইউনিয়নে অবস্থিত সেই সাতগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান অদুদ মাহমুদ বলেছেন, গণপিটুনির শিকার হয়েছেন এমন নয়জনকে উদ্ধার হতে দেখেছেন তিনি। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিরা জীবিত না মৃত তা বলতে পারছেন না। আনোয়ারের বাড়ির পুকুর থেকে তিনজন, মোল্লা মাঠ থেকে দুজন, ঢাকা প্রি-ক্যাডেট স্কুলের সামনে থেকে একজন, পাঁঠাওয়ালার বাড়ির সামনে থেকে একজন, পুরিন্দা বাজার এলাকা থেকে একজন ও বাগবাড়ি বাজার থেকে একজন উদ্ধার করার ঘটনা দেখেছেন বলে জানান ইউপি চেয়ারম্যান অদুদ মাহমুদ।

আড়াইহাজার থানার পুলিশ জানান, বৃহস্পতিবার সকালে ঘটনাস্থল থেকে সাতটি লাশ উদ্ধার করে নেয়া হয়েছে আড়াইহাজার থানায়। আরেকজন মারা গেছে হাসপাতালে। নিহত ব্যক্তিদের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির পর ময়নাতদন্তের জন্য লাশগুলো পাঠানো হয়েছে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের মর্গে। সন্দেহভাজন ডাকাতদের ব্যবহার করা ট্রাকটি (ঢাকা মেট্রো-ট-১৮-৪৩১১) জব্দ করা হয়েছে। ডাকাতির ঘটনায় আড়াইহাজার থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।

ধরা পড়ে ১২ জন, চার জনের পরিচয় ॥ নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের পুরিন্দা বাজারের চালের আড়তে ডাকাতি করার সময় ক্ষুব্ধ গ্রামবাসীর হাতে ধরা পড়ে ১২ জন। এর মধ্যে গণপিটুনিতে নিহত হয় ডাকাত দলের ৮ সদস্য। এ ঘটনায় আরও ৪ ডাকাত আহত হয়েছে। গ্রামবাসী সংঘবদ্ধ ডাকাত দলের ১২ সদস্যকে আটক করে গণপিটুনি দিলে ঘটনাস্থলেই ৭ জন ও আড়াইহাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও ১ জন মারা যায়। এ পর্যন্ত চার জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। আহত ৫ জনকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হলে দুপুরে রাজিব ওরফে রনি নামে এক ডাকাত চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়।

নিহত রনি ছিল ট্রাকের চালক রাজিব ওরফে রনি (৪০), তার পিতার নাম ওবায়দুল হক। সোনাগাজী ফেনীর সোনাগাজী থানার আলমপুর গ্রামে তার বাড়ি। তার স্ত্রী নাজমা তাকে শনাক্ত করে। নাজমা জানায়, রনি ট্রাক চালক। যে ট্রাকটি ডাকাতিতে ব্যবহৃত হয়েছে সেটির চালক ছিল রনি। ময়মনসিংহ জেলার কোতোয়ালি থানার মধ্যবারোবা আকুয়া গ্রামের রুবেল (২৫), জুয়েল ওরফে টিটু (৩০)ও শওকত (৩২)। আহতরা তাদের চারজনকে শনাক্ত করে নাম জানিয়েছে। আহত ডাকাতরা হলোÑ ময়মনসিংহ জেলার কোতোয়ালি থানার মিলন মিয়ার ছেলে সাব্বির (২৫), ছানা মিয়ার ছেলে সজিব (২৬), লতিফের ছেলে মানিক (৩২), চাঁদপুর সদরের ওসমান মিয়ার ছেলে লোকমান (২৮)। আহতদের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানান আড়াইহাজার থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আরিফুল হক।

মসজিদের মাইকে ডাকাত-ডাকাত ॥ ডাকাত দলটি ডাকাতি করার আগেই পুুরিন্দা বাজারের পাহারাদার জামান, মোতালিব, আউয়াল ও নিয়ত আলীকে হাত-পা-মুখ বেঁধে ফেলে তখন বাজারের মসজিদে নামাজ পড়তে আসেন মুসল্লিরা। ডাকাত দলটি হাজী গফুর ভুইয়ার মালিকানাধীন ভাই ভাই স্টোরের চালের আড়তের তালা ভেঙ্গে চালের বস্তা ডাকাতদের নিয়ে আসা ট্রাকে তুলতে থাকার সময়েই হাত-পায়ের বাঁধন খুলে পালিয়ে যায় নিরাপত্তা প্রহরী জামান। মসজিদে গিয়ে মুসল্লিদের কাছে খবর দিলে মসজিদ থেকে মাইকযোগে ডাকাত-ডাকাত পড়েছে বলে হৈ চৈ শুরু করেন। মাইকে মুসল্লিদের ডাক চিৎকারে বান্টি বাজার, বাগবাড়ী, ছনপাড়াসহ আশপাশের মসজিদ থেকেও ডাকাতির সংবাদ মাইকে প্রচার করতে থাকলে পুরিন্দাসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের কয়েক হাজার গ্রামবাসী লাঠিসোটা, গাছে ডাল ও ইটপাটকেলসহ বিভিন্ন দেশীও অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ডাকাতদের ধাওয়া করে। গ্রামবাসীর ধাওয়া খেয়ে ডাকাতদলের সদস্য দিগি¦দিক ছোটাছুটি করতে থাকে। গ্রামবাসীর দাওয়া খেয়ে ডাকাতরা পুকুরে, ঝোপঝাড়ে পালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু ডাকাতদের শেষ রক্ষা হয়নি।

যেভাবে ডাকাতদের হত্যা করা হয় ॥ আড়াইহাজারের বান্টি, বাগবাড়ি, ছনপাড়া ও পুরিন্দাসহ আশপাশের কয়েক হাজার জনতা ডাকাতদের ধাওয়া দেয়। ডাকাতরা ট্রাক ফেলে প্রায় এক কিলোমিটার দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করে। এ সময় তিন ডাকাত পাশের একটি পুকুরে জীবন বাঁচানের জন্য লাফিয়ে পড়ে। পরে উত্তেজিত জনতা ওই পুুকুরটির চারদিকে ঘিরে ফেলে। নিশ্বাস নেয়ার জন্য পানিতে লাফিয়ে পড়া ডাকাতরা মাথা উঁচু করলে এলাকাবাসী ডাকাদের প্রতি ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। এতে করে ২ ডাকাত পানিতে তলিয়ে যায় এবং এক ডাকাত সাঁতরিয়ে তীরে আসলে জনতা তাকেও পিটিয়ে হত্যা করে। অন্য ডাকাতরা বাঁশঝাড়, গাছের আড়ালে কিংবা ফাঁকফোকরে আশ্রয় নিয়ে উত্তেজিত এলাকাবাসী তাদেরও ধরে গণপিটুনি দিতে থাকে। উত্তেজিত জনতা পুরিন্দা বাজার থেকে ৩ জন, পুরিন্দা রোকন উদ্দিন মোল্লার মাঠ থেকে ৪ জন, পুরিন্দা আনোয়ার মেম্বারের পুকুর থেকে ৩ জন ও বাগবাড়ি থেকে ২ ডাকাতকে ধরে গণপিটুনি দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই ৭ ডাকাত নিহত হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ও ডুবুরি দল ঘটনাস্থলে ছুটে আসে। পরে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরিরা আনোয়ার মেম্বারের পুকুর থেকে ৩ জনের মৃতদেহ, পুরিন্দা বাজার থেকে ১ জন ও রোকনউদ্দিন মোল্লার মাঠ থেকে ৩ ডাকাতের মৃতদেহ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়।

পুরিন্দা বাজারের যেই দোকানে ডাকাতির চেষ্টা করা হয়েছে সেই ভাই ভাই স্টোরের মালিক হাজী আব্দুল গফুর জানান, তার দোকানসহ বিভিন্ন দোকানে ডাকাতি হচ্ছে খবর পেয়ে তিনি বাজারে আসেন। ততক্ষণে বাজারে কয়েক হাজার মানুষ এসে গেছে। তিনি এসে দেখেন একটি ট্রাকে তার আড়তের ষাট-সত্তর বস্তা চাল তোলা। এলাকাবাসী জানায় এ ট্রাক ডাকাতরা নিয়ে এসেছিল। এ সময় বাজারের বিভিন্ন স্থানে ডাকাতদের লাশ পড়েছিল। তিনি জানান, গত ১৫-১৬ দিন আগে বাঘবাড়ি এলাকায় তার নিকচ আত্মীয়ের চালের আড়ত থেকে ২শ’ বস্তা চাল ডাকাতি হয়েছিল। এ জন্য মানুষ ডাকাতদের ওপর ক্ষুব্ধ ছিল। সাত গ্রাম ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল ওয়াদুদ মাহমুদও জানিয়েছেন, ক’দিন আগে বাঘবাড়ি একটি চালের দোকানে কোন ডাকাতির ঘটনা ঘটলেও পুলিশ কোন ডাকাতকে গ্রেফতার করতে পারেনি। তাই ডাকাতদের প্রতি এলাকাবাসী ক্ষুব্ধ ছিল।

পুরিন্দা বাজারের দারোয়ান মকবুল জানান, ভোর চারটার দিকে একদল ডাকাত একটি ট্রাক নিয়ে বাজারে আসে। তারা প্রথমে বলে যে, ভাই ভাই স্টোরের জন্য চাল নিয়ে তারা এসেছে। এ সময় দারোয়ানরা সরল বিশ্বাসে তাদের বাজারের ভেতরে ঢুকতে দেয়। নেমেই তারা বাজারের দারোয়ান মকবুল, মোতালেব মিয়ার হাত ও পা বেঁধে ফেলে রাখে। অন্য পাশে বাজারের আরও তিন দারোয়ান জামান, আউয়াল ও নিয়ত আলীকে ধারাল অস্ত্র গলায় ধরে রাখে। একপর্যায়ে মকবুল নিজের হাত-পায়ের বাঁধন খুলে ফেলতে সক্ষম হয়। এরপর সে পালিয়ে গিয়ে বাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক বাচ্চু মিয়ার বাড়িতে গিয়ে ঘটনা জানায়। বাচ্চু মিয়া এলাকার মসজিদের ইমামকে বিষয়টি জানালে তিনি মাইকে বাজারে ডাকাত পড়েছে বলে ঘোষণা দেন। মাইকের ঘোষণায় কয়েক হাজার এলাকাবাসী এগিয়ে এসে ডাকাতদের ধাওয়া করে এবং গণপিটুনি দেয়।

আড়াইহাজার ডাকাত প্রবণ এলাকা ॥ নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলা এলাকাটি ডাকাতপ্রবণ এলাকা উল্লেখ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। আড়াইহাজারে বিভিন্ন এলাকায় প্রায়ই প্রতি রাতেই ডাকাতির ঘটনায় ঘটছে। স্থানীয় বাসিন্দা আলী আকবর জানান, প্রায়ই ডাকাতির ঘটনা ঘটলেও পুলিশ ডাকাতদের গ্রেফতার করতে পারছে না। এ কারণে আড়াইহাজারের জনতা ডাকাতির ঘটনায় ক্ষুব্ধ ছিল। মাইকে ডাকাত পড়েছে এ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে হাজার হাজার জনতা লাঠিসোটাসহ যেভাবে পেরেছে তাই নিয়ে ডাকাতদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। ফলে বৃহস্পতিবার ভোরে জনতার ক্ষুব্ধের বহির্প্রকাশ হিসেবে ডাকাতদের গণপিটুনি দিয়ে তাদের হত্যা করা হয়।

উৎসুক জনতার ভিড় ॥ ডাকাত নিহত হওয়ার খবর পেয়ে কয়েক হাজার উৎসুক জনতা ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে জড়ো হওয়ায় ভোরে থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত মহাসড়কে যানজটের সৃষ্টি হয়। পরে অতিরিক্ত পুলিশ এসে মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক করে। ডাকাত নিহত হওয়ার খবরে পেয়ে নারী-পুরুষসহ বিভিন্ন বয়সের লোকজন ঘটনাস্থলে এসে ভিড় করে। সকালে আড়াইহাজার থানা পুলিশ নিহতের লাশ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। সেখানেও উৎসুক জনতা ভিড় বেড়ে যায়।

আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে ॥ অপরাধ বিশেষজ্ঞরা গোয়েন্দা পুলিশ কর্মকর্তা সৈয়দ বজলুল করিম বলেন, মানুষজন কখন আইন তার নিজের হাতে তুলে নেয় যখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তথা প্রশাসনের কাছ থেকে বিচার না পেয়ে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। প্রায়ই দেখা যাচ্ছে, সংঘবদ্ধ ডাকাত দলের সদস্যসহ অপরাধীরা ধরা পড়ছে না, আবার ধরা পড়লেও জামিনে বের হয়ে এসে আবারও দোর্দন্ড হয়ে ডাকাতি করছেÑ এমন চিত্র যখন দেখা যায়, তখনই কেবল মানুষজন বিক্ষুব্ধ হয়, নিজের হাতে আইন তুলে নেয়। এটা আইনশ্ঙ্খৃলা পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণের জন্য খুবই বিপজ্জনক। বিক্ষুব্ধ জনতা যাতে আইন তার নিজের হাতে তুলে না নেয় সে জন্য অপরাধীদের গ্রেফতারপূর্বক বিচারের কাঠগড়ায় তুলে যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।