২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মৌলবাদের অর্থনীতির ভয়াল থাবা

  • বছরে মুনাফা বেড়েছে ৪৬৪ কোটি টাকা ;###;ড. বারকাতের গবেষণা তথ্য

এমদাদুল হক তুহিন ॥ দেশে শক্তিশালী হচ্ছে মৌলবাদের অর্থনীতি। তারা বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করেই গড়ে তুলছে সম্পদের পাহাড়। জঙ্গীবাদ তোষণ ও চলমান যুদ্ধাপরাধের বিচারকাজ বাধাগ্রস্ত করতে লবিস্ট নিয়োগেও ব্যয় হচ্ছে ওই অর্থের সিংহভাগ। মাত্র এক বছরে দেশে মৌলবাদের রাজনৈতিক অর্থনীতির নিট মুনাফা বেড়েছে ৪৬৪ কোটি টাকা। বর্তমানে এ অর্থনীতির বার্ষিক নিট মুনাফা প্রায় ২ হাজার ৪৬৪ কোটি টাকা। আর পাহাড়সম এ সম্পদের সবটাই ব্যয় হচ্ছে ধর্ম ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। জঙ্গীবাদ তোষণে রাষ্ট্রের অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত করার এমন কোন হীন চেষ্টা নেই, যা তারা করছে না। দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করতে ব্লগার, প্রকাশক, পুলিশ ও শিশু হত্যার দলে সর্বশেষ সংযোজন ছিল বিদেশী নাগরিক হত্যা মিশন। এখনও তারা ইসলামী শরিয়াহভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনে সশস্ত্র সম্মুখ যুদ্ধের প্রস্তুতিতে রয়েছে। এমন তথ্যই উঠে এসেছে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবুল বারকাত রচিত নতুন এক প্রবন্ধে। তবে ওই প্রবন্ধে এটাও বলা হয়েছেÑ ‘মৌলবাদের অর্থনীতি ও সংশ্লিষ্ট জঙ্গীবাদ এ দেশে যতই শক্তিশালী হোক না কেন, ওই শক্তি ব্যবহার করে ধর্মের নামে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল সম্ভব হবে না।’

বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আবুল বারকাত জনকণ্ঠের একান্ত আলাপচারিতায় বলেন, দেশে মৌলবাদের রাজনৈতিক অর্থনীতি একটি নতুন ধারণা। বর্তমান পরিস্থিতিতে এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে জঙ্গীবাদ। ২০১৩ সালে হেফাজতের উত্থানের মধ্য দিয়ে জঙ্গীত্বের সর্বশেষ প্রকাশ্যরূপ দেখতে পেয়েছে বাংলাদেশ। প্রবন্ধের তথ্যের আলোকে তিনি আরও বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে মৌলবাদের রাজনৈতিক অর্থনীতির বার্ষিক নিট মুনাফা ২ হাজার ৪৬৪ কোটি টাকা। এ মুনাফার সর্বোচ্চ ২৭ শতাংশ আসে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে, যার মধ্যে রয়েছে ব্যাংক, বীমা, লিজিং কোম্পানি ইত্যাদি। পরের অবস্থানে আছে বেসরকারী সংস্থা। এ খাত থেকে ১৮ দশমিক ৮ শতাংশ মুনাফা অর্জিত হয়। এছাড়া বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থেকে ১০ দশমিক ৮ শতাংশ, ওষুধ শিল্প ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারসহ স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান থেকে ১০ দশমিক ৪ শতাংশ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ৯ দশমিক ২ শতাংশ, রিয়েল এস্টেট ব্যবসা থেকে আসে ৮ দশমিক ৫ শতাংশ, সংবাদমাধ্যম ও তথ্য প্রযুক্তি খাত থেকে ৭ দশমিক ৮ শতাংশ এবং পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবসা থেকে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ মুনাফা আসে।

এমনকি মৌলবাদী অর্থনীতির বিগত চার দশকে পুঞ্জীভূত নিট মুনাফার পরিমাণ বর্তমান মূল্যে আনুমানিক প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা বলে মনে করেন এ অর্থনীতিবিদ। তাই দ্রুত এসব আয়ের উৎসমুখ বন্ধ করে দেয়ার পরামর্শ দিলেন তিনি। অন্যদিকে এর আগে ২০১৩ সালে তার প্রকাশিত এক প্রবন্ধে তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশে মৌলবাদের বার্ষিক নিট মুনাফা ২ হাজার কোটি টাকা। আর নতুন ২০১৪ সালের তথ্যে বলা হয়েছে, বর্তমানে বার্ষিক নিট মুনাফার পরিমাণ ২ হাজার ৪৬৪ কোটি টাকা। সে হিসেবে মাত্র এক বছরে তাদের মুনাফা বেড়েছে ৪৬৪ কোটি টাকা।

তার মতে, ধর্মকে বর্ম হিসেবে ব্যবহার করে একটি গোষ্ঠী প্রকৃতপক্ষে জঙ্গীবাদ তোষণ করছে। তাদের মূল লক্ষ্য রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করা। জঙ্গীবাদ তোষণে রষ্ট্রের অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত করে বহির্বিশ্বে দেশের সুনাম বিনষ্ট করার এমন কোন পন্থা নেই, যা তারা বেছে নিচ্ছে না। তাই যুদ্ধাপরাধী ও জঙ্গীগোষ্ঠীর সকল সম্পদ বাজেয়াফত করে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ পরিবার, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে বণ্টনের তাগিদ দেন তিনি।

মুক্তিযোদ্ধা আবুল বারকাত ছাড়া দেশের অন্য কোন অর্থনীতিবিদ ‘মৌলবাদের রাজনৈতিক অর্থনীতি’ বিষয়ে অর্থনৈতিক চলকের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিতে সক্ষম হননি। বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির জাতীয় সেমিনার-’১৫ উপলক্ষে ‘বাংলাদেশে মৌলবাদের রাজনৈতিক অর্থনীতি ও জঙ্গীবাদ : মর্মার্থ ও করণীয়’ শীর্ষক নতুন এই প্রবন্ধটি রচনা করেছেন তিনি, যা আজ শনিবার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন সেমিনার হলে উপস্থাপিত হবে। এর আগে ২০১৩ সালে একই বিষয়ে ‘বাংলাদেশে মৌলবাদের রাজনৈতিক-অর্থনীতি’ শীর্ষক আরেকটি প্রবন্ধ রচনা করেছিলেন তিনি। তবে এবার নতুন করে যুক্ত হয়েছে একাধিক অনুচ্ছেদ আর নতুন নতুন ধারণা। বিশদভাবে আলোচিত হয়েছে জঙ্গীবাদ, মৌলবাদের রাজনৈতিক অর্থনীতির মর্মার্থ এবং করণীয় প্রসঙ্গেও।

প্রবন্ধকারের মতে, দেশে মৌলবাদের রাজনৈতিক অর্থনীতি নতুন এক ধারণা। নতুন এ ধারণার সঙ্গে তিনি বর্তমানের জঙ্গীবাদকেও যুক্ত করেছেন। তার মতে, প্রকৃতপক্ষে মৌলবাদের অর্থনীতি ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িক রাজনীতির এক ঘনীভূত প্রকাশ, যা অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিরুদ্ধে সর্বদা কার্যশীল। এ এমন এক অর্থনীতি, যার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ’৭১-এর পরাজিত শক্তি, যা ’৭২-এর সংবিধানের মূল চেতনাবিরোধী। তিনি বলেন, ‘জনকল্যাণমুখী বিকাশ-আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নে ব্যর্থতা এবং অসাম্প্রদায়িক-গণতান্ত্রিক মানস কাঠামো সৃষ্টির ব্যর্থতা থেকেই পুষ্ট মৌলবাদ ও তার অর্থনীতি।’ প্রবন্ধে তিনি আরও বলেন, এ ব্যর্থতাই মৌলবাদের অর্থনীতির উৎপাদন ও পুনরুৎপাদনের প্রধান ভিত্তি। আর এভাবেই সৃষ্টি হয় জঙ্গীত্ব, যার চূড়ান্ত রূপ প্রায়শই লক্ষণীয়।

নতুন এই প্রবন্ধে তিনি উল্লেখ করেন, “৩০০% মুনাফা প্রাপ্তির সম্ভাবনায় ফাঁসির আশঙ্কা জেনেও এমন কোন অপরাধ নেই যার ঝুঁকি ‘পুঁজি’ নেবে না। সাম্রাজ্যবাদের বিকাশের সঙ্গে মৌলবাদ-সাম্প্রদায়িকতার রাজনৈতিক-অর্থনীতির উত্থান ও বিকাশ যেমন সাযুজ্যপূর্ণ তেমনি সাম্রাজ্যবাদের অধিকতর বিকাশের স্বার্থে সুনির্দিষ্ট ধরনের মৌলবাদ বাধার কারণ হলে তা প্রতিস্থাপিত হবে অন্য রূপের সাম্প্রদায়িকতা দিয়ে এটাও লক্ষণীয়।” তার মতে, ধর্মভিত্তিক মৌলবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে যোগসূত্র রয়েছে। এর জন্য দুটি বিষয়কে গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করার কথা উল্লেখ করেন তিনি। বিষয় দুটি হলো, ডলার অর্থনীতির বিপর্যয় ও যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা।

প্রবন্ধে অধ্যাপক আবুল বারকাত বলেন, দেশে ১৩২ চিহ্নিত জঙ্গী সংগঠন রয়েছে, যা সরকার ইতোমধ্যে নিষিদ্ধ করেছে। মৌলবাদের অর্থনীতিতে ২৩১ বেসরকারী সংস্থা, ট্রাস্ট ও ফাউন্ডেশন কাজ করছে। এসব ট্রাস্ট ও ফাউন্ডেশন বিদেশে মুনাফা পাচার করছে বলে অভিমত তার। তিনি বলেন, ‘এসব ট্রাস্ট ও ফাউন্ডেশন মৌলবাদের অর্থনীতি দ্বারা অর্জিত মুনাফা পাচারের একটি কৌশলমাত্র।’ সংস্থাসমূহ আর যাই করুক তাদের কাজের মূল উদ্দেশ্য মুনাফা পাচার। মৌলবাদী অর্থনীতির বিগত চার দশকে পুঞ্জীভূত নিট মুনাফার পরিমাণ বর্তমান মূল্যে আনুমানিক প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা। যে অর্থের বড় অংশটিই ব্যয় হচ্ছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাধাগ্রস্ত করতে বিদেশী লবিস্ট নিয়োগে। এছাড়া ওই অর্থ জঙ্গীবাদ সংশ্লিষ্ট পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, নতুন ক্যাডার বাহিনী গঠনেও ব্যয় হচ্ছে বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।

দেশে ইসলামী জঙ্গীবাদ দাওয়া স্তর অতিক্রম করে সম্মুখ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত রয়েছে উল্লেখ করে প্রবন্ধে তিনি বলেন, এদেশে ইসলামী জঙ্গীবাদ ‘দাওয়া’ স্তর পার হয়েছে, অতিক্রম করেছে দ্বিতীয় স্তর ‘ইদাদ’, এখন তাদের অবস্থান জিহাদের তৃতীয় ও চতুর্থ স্তরের মধ্যবর্তী কোন পর্যায়ে, অর্থাৎ ‘রিবাত’ ও ‘কিলাল’-এর মাঝে কোন এক পর্যায়ে। তবে সবকিছু বিচার বিশ্লেষণে আমি মনে করি তাদের জিহাদী অবস্থানের সর্বশেষ পর্যায় ‘কিলাল’-এর কাছাকাছি অর্থাৎ তারা ইসলামী শরিয়াহভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনে সশস্ত্র সম্মুখ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত।

তবে একই সঙ্গে তিনি এটাও বলেছেন, ‘মৌলবাদের অর্থনীতি ও সংশ্লিষ্ট জঙ্গীবাদ এদেশে যতই শক্তিশালী হোক না কেন, ওই শক্তি ব্যবহার করে ধর্মের নামে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল সম্ভব হবে না।’ তাই মৌলবাদের মহাবিপর্যয় রোধে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের পথ অনুসরণ করা প্রয়োজন বলেই অভিমত তার। ফলে সরকারকে ‘ক্ষতি হ্রাসের কৌশল’ ও ‘ঝুঁকি হ্রাসের কৌশল’ বাস্তবায়ন করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

মৌলবাদের রাজনৈতিক অর্থনীতি ও জঙ্গীগোষ্ঠী কর্তৃক বড় ধরনের কোন নাশকতা ঘটতে পারে উল্লেখ করে ক্ষতি হ্রাসের কৌশল সম্পর্কে করণীয় প্রসঙ্গে জনকণ্ঠকে তিনি বলেন, অতি দ্রুততম সময়ে সকল মানবতাবিরোধী ও যুদ্ধাপরাধের বিচার কাজ শেষ করতে হবে। একই সময়ে জঙ্গী অর্থায়নের উৎস সম্পর্কে সরকারের কাছে যে তথ্য আছে তা গণমাধ্যমে প্রকাশ ও প্রচার করতে হবে। সেই সঙ্গে জঙ্গীদের আয়ের উৎসমুখ বন্ধ করে সংশ্লিষ্ট সকল সম্পদ বাজেয়াফত করা ও বাজেয়াফতকৃত সম্পদ একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধে যারা শহীদ হয়েছেন, পঙ্গুত্ববরণ করেছেন, অসচ্ছল জীবনযাপন করছেন তাদের মধ্যে বণ্টন করতে হবে। এছাড়াও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনসহ মানব উন্নয়নমূলক কর্মকা-ে ওই অর্থ ব্যয় করা যেতে পারে বলেও তার অভিমত।