২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় জাগ্রত করতে হবে সাধারণ মানুষকে

মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় জাগ্রত করতে হবে সাধারণ মানুষকে
  • ছায়ানটে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে সনজীদা খাতুন

স্টাফ রিপোর্টার ॥ মহান বিজয় দিবসে ব্যাপক উৎসব অনুষ্ঠান থাকলেও, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অনুপস্থিত বলে মন্তব্য করেছেন বাঙালীর সাংস্কৃতিক আন্দোলন সংগ্রামের পুরোধা ব্যক্তিত্ব সন্জীদা খাতুন। সম্প্রতি মূল্যায়ন করে তিনি বলেছেন, মানুষের চরিত্র নাশ হয়ে গেছে। এ অবস্থায় শুধু মিলনায়তনের ভেতরে বসে কথা বললে হবে না। সংস্কৃতির শক্তি নিয়ে বাইরে বের হতে হবে। তৃণমূলের মানুষের কাছে পৌঁছতে হবে। তাঁদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সম্পর্কে জানাতে হবে। জাগাতে হবে মানুষকে। বাঙালীর যুদ্ধজয়ের মহান দিবস ১৬ ডিসেম্বর সামনে রেখে শুক্রবার সকালে ছায়ানট আয়োজিত মতবিনিময় অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন সংগঠনের সভাপতি।

সন্জীদা খাতুন বলেন, বিশেষ দিবসগুলো এখন কেবল উৎসবের হয়ে গেছে। উদাহরণ হিসেবে প্রথমেই আসে পহেলা বৈশাখের কথা। তিনি বলেন, বৈরী সময়ে আমরা পহেলা বৈশাখের আয়োজনটিকে বিশেষ জনপ্রিয় করেছিলাম। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল, এ দেশের মানুষ বুঝবে, আমরা বাঙালী। বাঙালিত্বের দিকে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য পহেলা বৈশাখকে আমরা এত গুরুত্ব দিয়েছি সেই সময়ে। শুধু বাঙালিত্ব নয়, আমাদের সাংস্কৃতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন ছিল। এই যে অধিকার প্রতিষ্ঠা, এটা কেন? নিজের প্রশ্নের নিজেই উত্তর দেন সন্জীদা খাতুন। বলেন, পাকিস্তান আমলে এটার প্রয়োজন হয়েছিল। তারা আমাদের কেবল বানাতে চাইত পাকিস্তানী মুসলমান। আর আমরা বলতাম, আমরা তো বাঙালী, আমাদের বাঙালিত্বের কথাটা কোথায় গেল? ওরা সেই কথা শুনতে চাইত না। যখন বুঝলাম, শোনানো সম্ভব নয়। তখনই করে দেখাতে শুরু করলাম। পহেলা বৈশাখ আমরা এই জন্যই করেছিলাম যে, আমরা সবাই এক হব। আমরা সবাই জানব, আমরা সবাই বাঙালী। বাঙালীর সংস্কৃতির অধিকার বাঙালীকে আদায় করে নিতে হবে।

এর পর বেদনার সুরটি বাজে চিরবিপ্লবীর কণ্ঠে। বলেন, পহেলা বৈশাখ আজ কেবলই যেন উৎসবের হয়ে গেছে। মানুষ দলে দলে পথে বেরোয়। নতুন কাপড় পরে আনন্দ করে। সেদিন কিছু বিশিষ্ট খাবার খায় প্রত্যেকে। খুবই আনন্দ হয়। তার পর কী করে? গালে জাতীয় পতাকা আঁকায়। বাউলের একতারা আঁকায়। এসব করে মনে করে খুব বাঙালী হয়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ওতে কি বাঙালিত্বের কিছু আছে?

আর মাত্র ক’দিন পর ১৬ ডিসেম্বর। এ প্রসঙ্গেই মতবিনিময়। অভিন্ন বক্তব্য তুলে ধরে সন্জীদা খাতুন বলেন, বিজয় দিবসটাও এখন একটা উৎসব হয়ে গেছে। সবাই বেড়ায়। নানা রকম আনন্দ করে। কিন্তু ১৬ ডিসেম্বর আসলে কী? আমরা সেদিন কী পেয়েছিলাম? সেটাকে কীভাবে ধরে রাখব? সবাই ভুলে গেছে। যদি বলি খারাপ শোনাবে, নষ্ট হয়ে গেছে। আজ এটা না বলে আমার উপায় নেই।

বর্তমানের বিজয় দিবসের চরিত্রটা ঠিক কেমন দেখেন? এমন প্রশ্নে সন্জীদা খাতুন আরও একটু পরিষ্কার করে বলেন, আমি বলছিলাম, এখন যেভাবে উদ্যাপন করা হচ্ছে তাতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অনুপস্থিত। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর আমরা কী পেয়েছি, জানি না। বাঙালী কাকে বলে, তা-ই বুঝি না। তিনি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছুড়ে বলেন, রাজনীতিকরা কি সংস্কৃতি বোঝেন? রাজনৈতিক দলগুলোর ছাত্রশাখা এসব দিবসে ধুমধাম বাজনার সঙ্গে নৃত্য শুরু করে দেয়। টিভিতে ধুমধাম সঙ্গীত বাজে। এগুলো কী বাঙালী সংস্কৃতি সমর্থন করে? আসলে সংস্কৃতি কাকে বলে আমরা বুঝি না। সমাজ পরিবর্তনে সংস্কৃতির গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, সংস্কৃতিটা জানা দরকার। জানানো দরকার।

সম্প্রতি নানা অঘটন সম্পর্কে তিনি বলেন, এখন চারপাশের মানুষ এ ওকে হত্যা করছে। নানা রকম সন্ত্রাসী কর্মকা- হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নির্বাসিত। অসাম্প্রদায়িকতা মার খাচ্ছে। এর পর বাঙালিত্ব নিয়ে সারাজীবন গর্ব করা সন্জীদা খাতুন বলেন, বলতে হয়ত বাধ্যই হন, এভাবে আমাদের চরিত্রটা নাশ হয়ে গেছে।

তবে, ৮৩ বছরের জীবনের প্রায় পুরোটাই সংগ্রাম করে কাটিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট এই রবীন্দ্রসঙ্গীতশিল্পী ও গবেষক। আর তাই হতাশ হতে নারাজ বরং এ অবস্থায় নতুন করে করণীয় নির্দেশ করেন তিনি। অতীতে ফিরে গিয়ে দুঃসহ স্মৃতি কুড়িয়ে আনেন। বলেন, ২০০১ সালে কী হয়েছিল? আমাদের বোমা ছুড়ে মারার চেষ্টা হয়েছিল। পারেনি ওরা। কিন্তু এই যে চেষ্টাটা এ থেকে আমরা বুঝেছিলাম, আমরা সব মানুষের কাছে পৌঁছতে পারিনি। অনেক মানুষ রয়ে গেছে যারা আমাদের শত্রু মনে করে। এই ব্যাপারটা বুঝতে পেরে আমরা আরও নানা কাজ করেছি। এখনও সব মানুষের কাছে পৌঁছার কোন বিকল্প নেই। আমাদের দরকার এখন সাধারণ মানুষকে জাগানোর চেষ্টা করা। এ প্রসঙ্গে কিছুটা আত্মসমালোচনাও করেন। বলেন, আমরা ভবনের ভেতরে বসে সংস্কৃতি চর্চা করি। এই উদ্দেশ্যেই কি ছায়ানট হয়েছিল? উত্তরে নিজেই বলেন, ছায়ানট প্রতিষ্ঠা হয়েছিল মানুষকে জাগানোর জন্য। মানুষের ভেতর সংস্কৃতির বোধ প্রতিষ্ঠা করার জন্যে। এই জিনিসটা করার জন্য আমরা অনেক কষ্ট স্বীকার করেছি। আমাদের মধ্যে অনেককে বদলি করে দিয়েছে পাকিস্তান সরকার। যাতে ঢাকায় সংস্কৃতি চর্চা না করতে পারি। আমাকে রংপুরে বদলি করেছিল। পুলিশকে জানিয়ে ঢাকায় আসতে হতো। কোন্ ঠিকানায় থাকব, বলতে হতো। এভাবে অনেক রকমের কা-কারখানা। মানসিক নির্যাতন। এসব থেকে বাঁচার জন্যই তো এত আয়োজন। এর পরও কোন কোন মানুষ আমাদের ভুল বোঝে। মনে করে, বাঙালীর চর্চাটা ভারতীয় কিছুর চর্চা অথচ আমরা জানি, অভিভাবকরা বাঙালী সংস্কৃতিকে ভালবাসে বলেই তাঁদের পরিবার থেকে ছেলেমেয়েদের ছায়ানটে পাঠান। গিটারের ব্যবসা করলে হুহু করে টাকা আসত, আমরা জানি। আমরা সেটা করব না। আমরা শুদ্ধ সংস্কৃতি চর্চার একটা ধারা বজায় রাখতে চাই এবং সাধারণ মানুষের কাছে আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার আশা রাখি। এরই অংশ হিসেবে আগামী ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে বড় অনুষ্ঠান আয়োজনের কথা জানান তিনি। বলেন, ওখানে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী পাব। তাঁদের সঙ্গে নিয়ে গানে কবিতায় বলব, মুক্তিযুদ্ধের কথা। প্রায় চার হাজার মানুষ ওখানে উপস্থিত হয়ে দেশের গান করবে। সবাই মিলে গাইব। বুকের ভেতরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাটুকু জাগানোর জন্য হবে এই অনুষ্ঠান। একই উদ্দেশ্যে ছায়ানট দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত যাবে বলে জানান তিনি। প্রগতিশীল চিন্তার সবাইকে দেশের প্রতি প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ার আহ্বান জানান তিনি। বর্তমানের সঙ্কট থেকে বাংলাদেশকে বাঁচাতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তৃণমূলে ছড়িয়ে দেয়ার পরামর্শ দেন।