২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নারিন্দায় পুড়িয়ে হত্যায় মামা-ভাগ্নেকে আসামি করে মামলা

গাফফার খান চৌধুরী ॥ পাওনা টাকার সূত্র ধরেই বুধবার দিবাগত রাতে বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে ঘরে আগুন দিয়ে রাজধানীর ওয়ারীর নারিন্দায় পুড়িয়ে হত্যা করা হয় ব্যবসায়ী সুমন মিয়াকে। আগুনে মারাত্মক দগ্ধ কর্মচারী সাকিব ও শহীদের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এ দু’জনের মধ্যে শহীদের অবস্থা অত্যন্ত গুরুতর। হত্যাকারী হিসেবে মামা সোহাগ ও তার ভাগ্নে রাজীবকে আসামি করে ওয়ারী থানায় নিহতের ছোট ভাই মামলা দায়ের করেছেন। দুই আসামিকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

ওয়ারীর ধোলাইখালের নারিন্দা সড়কের ২ নম্বর হাজী ম্যানশনের তৃতীয় তলা বাড়ির দ্বিতীয় তলায় মর্মান্তিক এ ঘটনাটি ঘটে। আগুনে সুমন মিয়া (৪০), সাকিব (২১) ও শহীদ (১৮) মারাত্মক দগ্ধ হয়। বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৩ জনের মধ্যে সুমন মিয়ার মৃত্যু হয়। অপর দু’জন আইসিইউতে চিকিৎসাধীন। চিকিৎসাধীনরা যে বাড়িতে ঘটনাটি ঘটে সেই বাড়ির নিচতলায় থাকা ফেমাস ডিজেল সার্ভিস নামের একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী।

ফেমাস ডিজেল সার্ভিসের মালিক মোহাম্মদ রফিক জনকণ্ঠকে বলেন, মূলত পাওনা টাকার সূত্র ধরে পরিকল্পিতভাবে মামা সোহাগ ও তার ভাগ্নে রাজীব ঘরের বাইরে তালা লাগিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। আর সেই আগুনে সুমনের মৃত্যু হয়। মরাত্মক দগ্ধ হয় তার দুই কর্মচারী শহীদ ও সাকিব।

তিনি বলেন, দীর্ঘদিন সুমন মিয়া, রাজীব ও সোহাগ তার দোকানের কর্মচারী ছিল। সোহাগ ও রাজীব সম্পর্কে মামা-ভাগ্নে। সোহাগ মামা আর রাজীব সোহাগের ভাগ্নে। একত্রে কাজের সুবাদে সুমন মিয়ার সঙ্গে মামা-ভাগ্নের খুবই সুসম্পর্ক হয়। মামা ভাগ্নে দু’জনই মাদকাসক্ত। মূল ঘটনার সূত্রপাত ৫ বছর আগে। নিহত সুমন মিয়া ৫ বছর আগে তার এখান থেকে চাকরি ছেড়ে দেন। নিজেই ব্যবসা করার চেষ্টা করেন। এ সময় মামা-ভাগ্নেকে পুরনো সম্পর্কের সুবাদে সঙ্গে নেন। সুমন মিয়া নিজেই আড়াই লাখ টাকা দেন। আর মামা-ভাগ্নে দু’জনে লাখ খানেক টাকা যোগাড় করে ধোলাইখালে ব্যবসা শুরু করে। দোকানের নাম দেয় সোহাগ ফুয়েল পাম্প।

চুক্তি অনুযায়ী, যেকোন সময় দাবি করলে সুমন মিয়াকে মূলধন আড়াই লাখ মামা-ভাগ্নে ফেরত দিতে বাধ্য থাকবে। আর যতদিন মূলধন ব্যবসায় থাকবে, ততদিন প্রতিমাসে সুমন মিয়াকে ৫ হাজার টাকা করে দেয়ার কথা। একবছর নিয়মিত মাসিক টাকা দিচ্ছিল।

গত ৪ বছর ধরে নির্ধারিত মাসিক টাকা দিচ্ছিল না। চার বছরে মাসিক হারের ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা পাওনা হয়। তার সঙ্গে মূলধন আড়াই লাখ টাকা। সবমিলিয়ে প্রায় ৫ লাখ টাকা সুমন মিয়া রাজীব ও সোহাগের কাছে পাওনা হয়। সুমন মিয়া মোবাইল ফোনে তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করতে পারছিল না। এ নিয়ে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। মাসখানেক আগে এ নিয়ে সুমন মিয়ার সঙ্গে রাজীব ও সোহাগের দেন দরবারও হয়। দেন দরবারের পরেও তারা টাকা পরিশোধ করছিল না। ইতোমধ্যেই মামা-ভাগ্নে তাদের ধোলাইখালের ব্যবসা বন্ধ করে দেয়। গোপনে তারা দোকান ভাড়া নেয়ার অগ্রিম ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা তুলে নেয়ার চেষ্টা করে। বিষয়টি বুঝতে পেরে সুমন মিয়া দোকানের অগ্রিম টাকাগুলো নিয়ে নেন। কারণ সুমন নিজেই অগ্রিম ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা দিয়ে দোকানটি নিয়েছিলেন। এতে চরম ক্ষিপ্ত হয় সোহাগ ও রাজীব। পাওনা টাকা পরিশোধ না করায় বন্ধ করে দেয়া দোকানের লেদ মেশিনটিও সুমন মিয়া নিজের হেফাজতে রেখে দেন। এসব কারণে মামা-ভাগ্নে চরম ক্ষিপ্ত ছিল সুমনের ওপর। এদিকে এসব ঘটনার মধ্যেই মামা-ভাগ্নে ও হাজী ম্যানশনের বাড়ির মালিকের ছেলে মাদকসহ ওয়ারী থানা পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়। রাজীব ও সোহাগ ফেমাস ডিজেল সার্ভিসে কাজ করার সুবাদে বাড়িটির মালিকের ছেলের সঙ্গে ভাল সম্পর্ক গড়ে ওঠে। মামা-ভাগ্নে ও বাড়ির মালিকের এক ছেলে মাদকাসক্ত। মূলত মাদকের সূত্রধরেই তাদের মধ্যে ভাল সম্পর্ক হয়।

মোহাম্মদ রফিক আরও বলেন, এক সপ্তাহ আগে তিনজন একত্রে পুলিশের হাতে মাদক সেবনের সময় গ্রেফতার হয়। গ্রেফতারের পর রাজীব ও সোহাগ ছাড়াও তাদের পরিবারের সবার ধারণা, টাকা পয়সা নিয়ে দ্বন্দ্বের সূত্র ধরেই সুমন মিয়া তাদের পুলিশ দিয়ে ধরিয়ে দিয়েছে। আসলে সুমন মিয়া এর আদ্যোপান্ত কিছুই জানেন না।

পুলিশে ধরার পর রাজীব ও সোহাগের পরিবার সুমন মিয়ার শরণাপন্ন হন। দুই পরিবারের তরফ থেকে সুমন মিয়ার যাবতীয় পাওনা পরিশোধ করে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়। রাজীব ও সোহাগও যাবতীয় পাওনা পরিশোধ করে দিতে সুমন মিয়াকে প্রতিশ্রুতি দেয়। সুমন মিয়া তাদের কথায় বিশ্বাস করে ৫০ হাজার টাকা খরচ করে মামা-ভাগ্নেকে ছাড়িয়ে আনেন। এরপর থেকেই মামা-ভাগ্নে লাপাত্তা। সর্বশেষ গত বুধবার ঘটনার দিন সুমন মিয়া মামা-ভাগ্নেকে ফোন করেন। ফোনে পাওনা টাকার বিষয়ে কথাবার্তা হয়। এ সময় মামা-ভাগ্নে সুমন মিয়ার কাছ থেকে কোন টাকা পয়সা নেয়নি বলে দাবি করে। এমনকি সুমন মিয়াই তাদের পুলিশ দিয়ে ধরিয়ে দিয়েছিল বলেও অভিযোগ করে। এসব বিষয় নিয়ে সুমন মিয়ার সঙ্গে মোবাইলে মামা-ভাগ্নের চরম ঝগড়া হয়। সেদিনই অগ্নিকা-ের ঘটনাটি ঘটে। রাজীব ও সোহাগই যে ঘরের বাইরে তালা দিয়ে সুমন মিয়াকে পুড়িয়ে হত্যা করেছে, সার্বিক বিষয় পর্যালোচনা করে তা প্রায় শতভাগ নিশ্চিত বলে ধরে নেয়া যায়। সাকিব ও শহীদ পরিস্থিতির শিকার মাত্র।

এ ঘটনায় সুমনের ছোট ভাই শাহাব উদ্দিন রাজন সোহাগ ও রাজীবকে আসামি করে ওয়ারী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।

পুলিশ জানায়, উদ্ধারকালে ঘরের বাইরে ২টি তালা লাগানো ছিল। ঘরের জানালার কাঁচ ভাঙ্গা ছিল। বাইরে থেকে সিঁড়ি বেয়ে কেউ ওপরে উঠে জানালা ভেঙ্গে পেট্রোল বা গানপাউডার দিয়ে আগুন দিয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে।

এ ব্যাপারে ওয়ারী বিভাগের উপ-কমিশনার সৈয়দ নুরুল ইসলাম জনকণ্ঠকে বলেন, মামলার এজাহারনামীয় দুই আসামি নিহত সুমন মিয়ার পূর্ব পরিচিত। আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে। আশা করছি, স্বল্প সময়ের মধ্যেই তাদের গ্রেফতার করা সম্ভব হবে।