১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অতঃপর নির্বাচনে এলেন

  • মুহম্মদ শফিকুর রহমান

অতঃপর আমাদের ‘আপোসহীন’ ম্যাডাম নির্বাচনে এলেন। হোক না স্থানীয় সরকার নির্বাচন তবু শেখ হাসিনার ফর্মুলা অনুযায়ী মনোনয়ন দান করলেন, মনোনীত প্রার্থীরা যথারীতি রিটার্নিং অফিসারের কাছে মনোনয়নপত্র জমাও দিলেন। এটি অত্যন্ত ইতিবাচক একটি দিক এবং দেরিতে হলেও খালেদা জিয়া যে বুঝতে পেরেছেন, এতদিন নির্বাচন বর্জন করে ভুল করেছেন সে জন্য তাকে ধন্যবাদ। ভুল স্বীকার করার মধ্যে কোন পরাজয় নেই। তবে একটু লজ্জার ব্যাপার আছে। লজ্জা নারীর ভূষণÑ এই নীতিবাক্যটি দেরিতে হলেও ম্যাডাম বুঝতে পেরেছেন। তবে অনেকে এই নীতিবাক্যটি বুঝতে পেরেও চুপ করে থাকেন। হয়ত দুর্বল চিত্তের কারণে। কিন্তু আমাদের ম্যাডাম দুর্বল চিত্তের নারী নন। ছেলে, বউ, নাতি-নাতনিদের লন্ডনে ফেলে রেখে নির্বাচন করতে দেশে ফিরে এলেন। এটাই নির্বাচনের শেষ ট্রেন। এ ট্রেন মিস করলে বাকি জীবনটা যে ঘরে বসেই কাটাতে হতো। পরবর্তী জেনারেশনের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

তার প্রয়াত স্বামী মিলিটারি জিয়াউর রহমান বলেছিলেন, ‘রাজনীতিকদের জন্য রাজনীতি কঠিন করে দেবেন।’ আরেকটি কথা বলেছিলেন, ‘মানি ইজ নো প্রোবলেম।’ খালেদা জিয়া এবং তদীয় পুত্রদ্বয় (অবশ্য একজন অকালে মারা গেছেন) নিজেরাই প্রথমটির শিকার হয়েছেন। সত্যি সত্যি চড়ষরঃরপং নবপড়সব াবৎু ফরভভরপঁষঃ ভড়ৎ কযধষবফধ ধহফ যবৎ ভধসরষু. নিজের সন্তানদের বিদেশে ফেলে রেখে একা জীবনযাপন করতে হচ্ছে। আজকের গ্লোবাল ভিলেজে এমন পরিস্থিতি হতেই পারে। পেটের ধান্ধায় বাবা এক দেশে, মা আরেক দেশে, ছেলেমেয়েরা অন্য দেশে এটা এখন স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু ম্যাডামের ব্যাপারটা স্বাভাবিক নয়। এ জন্য ছেলেরা দেশ থেকে পালিয়েছে পেটের ধান্ধায় নয়, দুর্নীতির মামলার আসামি হয়ে কারাজীবনের কষ্ট সহ্য হবে না বলে।

অবশ্য মিলিটারি জিয়া স্ত্রী-সন্তানদের একটা পথ দেখিয়ে দিয়ে গেছেন, তা হলো যত পার মাল কামাও। তাহলে পলিটিক্স ডিফিকাল্ট হলেও জীবন স্মুথ্লি কাটাতে পারবে। বাজারে প্রচলিত যে সব কথা চালু আছে তা হলো বড় ছেলে তারেক বউ-সন্তান নিয়ে লন্ডনে একটি অভিজাত এবং ব্যয়বহুল এলাকায় বাড়ি ভাড়া করে বসবাস করছেন। কেউ কেউ মনে করেন, বাড়ি কিনেছেন; কিন্তু এর কোন সমর্থন নেই। এ এলাকা এ জন্য পরিচিত যে, ক্ষমতাচ্যুত পাকিস্তানের পারভেজ মোশাররফের মতো গণধিক্কৃত রাষ্ট্রনায়করা দেশ থেকে পালিয়ে এ এলাকায় বসবাস করেছেন শুনেছি। অর্থের যোগান দেন গৌরী সেন। আমাদের তারেক বাবাজি তো নিজেই গৌরী সেন হয়ে দেশ থেকে পালিয়েছেন। শোনা যায়, জাগোয়ার জাতীয় একাধিক গাড়িও ব্যবহার করেন। ছোট ছেলে মারা গেছেন, তাই কিছু বলতে চাই না। তার স্ত্রী-সন্তানও সুখে আছেন শুনেছি। আমরাও চাই বাবাহারা পরিবারটি ভালই থাকুক।

আগেই বলেছি দেরিতে হলেও খালেদা জিয়া লোকলজ্জা ত্যাগ করে একটি সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তার এই সিদ্ধান্তের ফলে জাতি অন্তত কিছুদিনের জন্য হলেও পেট্রোলবোমার হাত থেকে রেহাই পাবে। একটি ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি থেকে জাতি রক্ষা পেতে যাচ্ছে। কি ভয়ঙ্কর ছিল সেসব দিন। রাস্তায় হাঁটছি, কখন কার গায়ে পেট্রোলবোমা পড়ে আগুন সারা গায়ে ছড়িয়ে পড়বে কে জানত। এভাবে দেড় শতাধিক মানুষ পেট্রোলবোমার আগুনে জীবন দিল। আহত হলো শত শত, গাড়ি পুড়ল হাজার। তারচেয়ে বড় কথা ১৬ কোটি হোক ১৭ কোটি হোক গোটা জনগোষ্ঠী দীর্ঘ সময় ধরে কি এক আতঙ্কে কাটিয়েছে পুরো ১৩ সাল আর ২০১৫-র ৯২ দিন। খালেদা জিয়ার নির্বাচনে অংশগ্রহণের মধ্যে গণতন্ত্রের কি হলো না হলো, তারচেয়েও বড় কথা দেশের মানুষ এ মুহূর্তের জন্য স্বস্তি পেল।

আরেকটি বিষয় হলো সিভিল সোস্যাইটির নামে সত্তরোর্ধ্ব বুড়ো লাল পাঞ্জাবি পরে টক-শোতে বসে আর কি নিয়ে চিল্লাবেন? ওরে বাপরে, কথা কথায় রহপষঁংরাব নির্বাচন রহপষঁংরাব নির্বাচন করতে করতে এতদিন গলা ফাটাচ্ছিলেন, টু-পাইস পকেটেও আসছি॥ খালেদা জিয়া এবার তাদের টু-পাইস কামানোর সুযোগটিও খর্ব করে দিলেন। টিভি চ্যানেলগুলোর প্রতি অনুরোধ থাকবে লাল পাঞ্জাবির সত্তরোর্ধ্ব সুশীল বাবুকে কোন না কোনভাবে হাজির করবেন। নইলে পাবলিকের হাসির খোরাক যে বন্ধ হয়ে যাবে? সার্কাসের চেয়ে সার্কাসের ক্লাউনরা মানুষকে বেশি আনন্দ দেয়। তার টক-শোর বাজার ধরে রাখার জন্য টিভি-অলারা শরৎ বাবুর শ্রীনাথ বহুরূপীর মতো লাল পাঞ্জাবির পেছনের দিকটায় একটা লম্বা লেজ লাগিয়ে দিতে পারেন। চলবে ভাল। বিজ্ঞাপনের মালও যথারীতি বাড়তে থাকবে। তবে হ্যাঁ লেজটা এমন দ্রব্য দিয়ে বানাতে হবে যাতে করে সহজে আগুন না ধরে এবং পেট্রোলবোমার বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার সুযোগ না পায়। কারণ বিশ্বাস তো করা যায় না, জ্বলন্ত লেজ নিয়ে এ বাড়ি থেকে ও বাড়ি লাফিয়ে গোটা দেশ না জ্বালিয়ে দেয়। কখন ম্যাডামের মতিগতি কোন্দিকে ধাবিত হয়। কতদিন নির্বাচন থেকে দূরে আছেন। নির্বাচন মানে তো তার কাছে ক্ষমতা। বিশাল কারুকার্যখচিত সোনালী সিংহাসন, কতদিন তা থেকে দূরে রয়েছেন। আর কত সহ্য করা যায়। লাল পাঞ্জাবি আর জিন্স পরা হালের ক্লিন শেভ শিবিরের ফাঁদে পা দিয়ে নির্বাচন না করে যে ভুল করেছেন তারই খেসারত দিতে হচ্ছে এখনও। একদিকে ক্ষমতার সোনার হরিণের দেখা নেই, আর এ জনমে কোনদিন দেখা পাবেন কিনা তারও কোন আশা-আশ্বাসের আলামত দেখা যাচ্ছে না।

আহারে কি ভুলটা না করলেন। শেখ হাসিনা দেশের প্রধানমন্ত্রী, তার ওপর জাতির পিতার কন্যা, বললেন, আসুন সবাই মিলে (অবশ্যই জামায়াত বাদ দিয়ে) সর্বদলীয় সরকার গঠন করি। আপনি যে যে মন্ত্রণালয় চাইবেন নিন, স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র কোন্টা পছন্দ নিন, তবু নির্বাচনে আসুন। শেখ হাসিনা প্রস্তাব দিলেন পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে। তার কানে গেল না। বরং আলোচনার জন্য ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিলেন। টেলিফোনে বললেন, আসুন বসি কথা বলি, সব ঠিক করে নির্বাচনে নামি। কিন্তু না, শুনলেন না, বরং যে ভাষায় যে স্বরে শেখ হাসিনাকে জবাব দিলেন তা গোটা জাতি শুনেছে। খালেদার সেই ঝাঁঝালো কণ্ঠস্বর একতরফা হুমকি শেখ হাসিনা অত্যন্ত শান্ত মেজাজে শ্রবণ করেছেন। কুঠারাঘাতের জবাব মুগুর দিয়ে দেননি। তারপরও ম্যাডামের আক্রোশ কমেনি। পেট্রোলবোমা মেরে আক্রোশ মেটাতে চেয়ে নিজেই জনরোষে পুড়লেন। পাঁচ শ’র ওপর পুলিং সেন্টার পুড়িয়েও নির্বাচন ঠেকাতে পারলেন না। নির্বাচন হয়ে গেল। তিনি নির্বাচনে অংশ নিলেন নেতিবাচকভাবে, অর্থাৎ ভোটে অংশ না নিয়ে ভোট বানচালের চেষ্টা করে ব্যর্থ হলেন। তার সন্ত্রাসী শিবির বাহিনী বলল, একবার হেরেছে তো কি হয়েছে, ‘একবার না পারিলে দেখ শতবার।’ নির্বাচনের বর্ষপূর্তিতে ২০১৫-র ৫ জানুয়ারি থেকে টানা ৯২ দিন হাজার হাজার পেট্রোলবোমা ফাটালেন, মানুষ মারলেন, গাড়ি পোড়ালেন, যাত্রীসহ বাস জ্বালিয়ে দিলেন; কিন্তু লগ্ন অশুভ, তিনি তথৈবচ।

শেখ হাসিনা এবার পৌরসভা নির্বাচনের ঘোষণা দিয়ে ম্যাডামকে আরেক দফা বিপদে ফেলে দিলেন। সব ট্রেন মিস করেছেন, এটা লাস্ট ট্রেন, এ ট্রেন মিস করলে আর পারে যাওয়া হবে না। তাই লন্ডন থেকে ছুটে এসে বললেন, ঘড়ঃযরহম রিষষ মড় ঁহপযধষষবহমবফ? এখন নিজেই দলের নির্বাচন মনিটরিং করছেন গুলশানের বাসভবনে বসে।

নির্বাচনে এবার তার একটি প্লাস পয়েন্টও আছে। এরই মধ্যে অর্থাৎ গত দুই বছরে (২০১৪-২০১৫) এমপি মন্ত্রী স্থানীয় নেতাদের (ক্ষমতাসীন) বেশির ভাগেরই যে ভাবমূর্তি গড়ে ওঠেছে, এমনকি কারও ২০০৮-এর নির্বাচনের পর থেকে কিছু নেতা-মন্ত্রী-এমপির স্থানীয় ভাবমূর্তি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, পৌরসভা নির্বাচন উপলক্ষে তারা যে পথ দিয়ে হাঁটবেন প্রতি পদক্ষেপে ১০০ করে ভোট কমবে। এর সমর্থন দেখা গেছে আওয়ামী লীগের নমিনেশন দেয়ার সময়। দলের পক্ষ থেকে প্রতিটি পৌর এলাকার জন্য প্রার্থীর নাম চাওয়া হয়েছিল স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতার কাছ থেকে। কিন্তু দেখা গেছে নমিনেশনের ক্ষেত্রে অনেক পৌরসভারই নেতাদের প্রার্থী নমিনেশন পাননি। পেয়েছেন শেখ হাসিনার নিজস্ব সোর্সের হিসাব-নিকাশ থেকে। কারণ সবার ‘আমলনামা’ নেত্রীর কাছে রয়েছে। নমিনেশন হয়েছে তারই ভিত্তিতে। আর সেই গণবিচ্ছিন্ন নেতারা এখন ধানম-ি ৩ নং-এর নেত্রীর কার্যালয়ে ঘুরঘুর করছেন নমিনেশন পাল্টাতে। তাতে করে ব্যর্থ হয়ে এখন প্রচারে নেমেছেন। নেত্রীর সঙ্গে দেখা করেছেন (?) নমিনেশন না পাল্টালেও প্রার্থীকে পরবর্তীতে ‘জেলা সভাপতি’ বানানোর আশ্বাস দিয়েছেন। শেখ হাসিনা রাজনীতিতে যেমন মেধাবী, তেমনি পলিটিক্যাল জোকস করেন অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে। যে জেলার অধীন পৌরসভার নমিনেশনের ব্যাপার কথাটি বলছিলেন তখন সেভাবে ঐ জেলা সভাপতি উপস্থিত ছিলেন। তার তো হৃদয় ভেঙ্গে চুর। বস্তুত এই সভাপতি তার দলবল নিয়ে অর্থাৎ লুট করে উপজেলা চেয়ারম্যান হয়েছেন তাকেসহ সমাজের ধিক্কৃত কিছু লোককে নিয়ে নমিনেশন পাল্টাতে যান। নেত্রীর নমিনেটেড প্রার্থীর বিরুদ্ধে যারা নমিনেশনের জন্য তদবির করতে গেছেন তাকে থানা সভাপতি হিসেবে পরিচয় করানো হয়। অথচ সে জেলা সভাপতির ঘোষণায় থানা সভাপতি, সেখানে কোন কাউন্সিল হয়নি, কাউন্সিলের তালিকাও তৃণমূল দেয়নি, বরং ঘরে বসে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ কমিটির নাম ঘোষণা করা হয়েছে। যে কারণে এই সব নেতার দল হোন্ডাবাহী গুন্ডা এবং পুলিশ প্রটেকশন ছাড়া ঘরের বাইরে যেতে পারে না। জেলা সভাপতির অবস্থা আরও করুণ। আগে-পাছে পুলিশ ভ্যান, মাঝে চলেন সরদার মহাশয়।

ঢাকা ॥ ১১ ডিসেম্বর ২০১৫

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও সভাপতি,

জাতীয় প্রেসক্লাব

নধষরংংযধভরয়@মসধরষ.পড়স