২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ছেলেবেলা ও ছাত্রজীবন

  • আবুল মাল আবদুল মুহিত

ঢাকায় ছাত্রজীবনের আরও কথা

(১১ ডিসেম্বরের পর)

পাঞ্জাবের সৈয়দ আমির হোসেন, সীমান্ত এলাকার সরদার মুমতাজ আলী খান এবং পূর্ব বাংলার আবু হোসেন সরকার। সেনাধিনায়ক জেনারেল আইয়ুব অতিরিক্ত দায়িত্ব নিয়ে হলেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী। আশ্চর্যের বিষয় হলো হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ২০ ডিসেম্বর এই মন্ত্রিসভায় আইনমন্ত্রী হিসেবে যোগ দিলেন এবং তারই প্রচেষ্টায় পাকিস্তানের সংবিধান রচনার কাজ প্রায় সম্পন্ন হয়। পরে জানা গেল যে, সোহরাওয়ার্দীকে ধুরন্ধর গোলাম মোহাম্মদ নানা সুযোগ-সুবিধা প্রদানের অঙ্গীকার করে মন্ত্রিত্ব গ্রহণে সম্মতি আদায় করেন। অঙ্গীকার ছিল যে, পূর্ব বাংলায় আওয়ামী লীগের ওপর নির্যাতন বন্ধ করা হবে, শেখ মুজিবকে মুক্তি দেয়া হবে, সোহরাওয়ার্দীকে প্রধানমন্ত্রী করা হবে, ভাসানী মওলানাকে দেশে প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থা করা হবে, এক বছরের মধ্যে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। একমাত্র শেখ মুজিবকে মুক্তিদান ও ভাসানীর দেশে প্রত্যাবর্তনের সুযোগ করে দেয়া ছাড়া আর কোন অঙ্গীকারই গোলাম মোহাম্মদ রক্ষা করেননি। মন্ত্রিসভাকে ‘বুদ্ধিমত্তার সমাহার’ (ঈধনরহবঃ ড়ভ ঃধষবহঃং) নামে অভিহিত করা হয় এবং এর সদস্য ছিলেন ১৬ জন। যাদের মধ্যে ২ জন ছিলেন প্রতিমন্ত্রী। বড়লাটের গণপরিষদ ভেঙ্গে দেয়াকে চ্যালেঞ্জ করে স্পীকার তমিজুদ্দিন খান অনেক বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে সিন্ধু প্রদেশের চীফ কোর্টে একটি রিট মামলা করলেন। তিনি দাবি করলেন লাট বাহাদুরের পদক্ষেপ অবৈধ, গণপরিষদ বহাল আছে এবং তিনি স্পীকার আছেন। সিন্ধু চীফ কোর্ট তমিজুদ্দিনের পক্ষে রায় দেন এবং কেন্দ্রীয় সরকার তার বিরুদ্ধে পাকিস্তান সুপ্রীমকোর্টে আপীল করেন। কিভাবে তমিজুদ্দিন খানকে মামলা না করতে কেমন ব্যবস্থা নেয়া হয় পরবর্তীকালে আমি সে সম্বন্ধে অবহিত হই। তিনি যাতে কোন আর্থিক সহায়তা না পেতে পারেন সেজন্য অত্যন্ত নি¤œমানের কার্যক্রম চলে, তিনি যাতে আদালতে না যেতে পারেন সেজন্য নানা প্রতিবন্ধকতা দাঁড় করানো হয়, নানা রকম সুযোগ-সুবিধা দিয়েও তাকে নিবৃত্ত করার প্রচেষ্টা চলে। সুপ্রীমকোর্টে তখন বিচারপতি ছিলেন বেআইনীভাবে নিযুক্ত মোহাম্মদ মুনীর। তিনি ভাল উকিল হিসেবে বিখ্যাত ছিলেন এবং বিভাগ পূর্বকালে ১৯৪৬ সালে লাহোর হাইকোর্টে বিচারপতি নিযুক্ত হন। ১৯৪৯ সালে তিনি হন লাহোর হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি এবং ১৯৫৪ সালে তিনি পাকিস্তান সুপ্রীমকোর্টে সেখানকার জজদের ডিঙ্গিয়ে সরাসরি প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত হন। তিনি পাকিস্তানের সূচনালগ্নে গোলাম মোহাম্মদের বন্ধু হিসেবে ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান সরকারের প্রথম বেতন ও সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। এছাড়া ১৯৫৩ সালে বিতর্কিত লাহোর কাদিয়ানী দাঙ্গা কমিশনের চেয়ারম্যানও তিনি ছিলেন। এই মামলায় তিনি আসলে একটি রাজনৈতিক রায় দেন। তিনি বড়লাটের বেআইনী হুকুমকে যথাযথ নয় বলে ‘প্রয়োজনের তত্ত্বকথা’ (ফড়পঃৎরহব ড়ভ হবপবংংরঃু) বিবৃত করে তার পদক্ষেপের পক্ষে মত দেন। তবে একইসঙ্গে তিনি বড়লাটের স্বেচ্ছাচার নিয়ন্ত্রণেরও প্রয়োজন রয়েছে বলে জানান। বড়লাট বাহাদুর এক আইন মানবেন আর অন্যটি বাতিল করবেন সেই মতো ক্ষমতার অধিকারী নন। সর্বোপরি তিনি বলেন যে, সংসদের আইন প্রণয়নের অধিকার বড়লাট প্রয়োগ করতে পারবেন না। তাকে তাই নতুন করে গণপরিষদ তাড়াতাড়ি গঠন করতে হবে। এই সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে একটি ৮০ সদস্যের গণপরিষদ নির্বাচিত হলো। ১৯৫৫ সালের ২১ মার্চ মুনীরের রায় ঘোষিত হলো। পরবর্তী পদক্ষেপের দিক-নির্দেশনা ১০ মে সুপ্রীমকোর্ট প্রদান করলেন। তার মোদ্দা কথা হলো যে, সরকারের অবয়বে পরিবর্তন করা যাবে না অর্থাৎ সংসদীয় গণতন্ত্র কায়েম করতে হবে। গণপরিষদের নতুন সদস্য নির্বাচন করে তার কাজ সংবিধান ও আইন প্রণয়ন অব্যাহত রাখতে হবে। ১২ জুন নতুন ৮০ সদস্যের গণপরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো- ৪০ সদস্য পশ্চিম পাকিস্তান থেকে এবং ৪০ সদস্য পূর্ব বাংলা থেকে নির্বাচিত হলেন। ১৯৫৫ সালের জুলাই মাসে এই সংসদের অধিবেশন শুরু হলো রাওয়ালপিন্ডিতে। প্রথমেই নির্বাচিত দলগুলো পাঁচটি বিষয়ে বিখ্যাত মারী চুক্তি সম্পাদন করে। এই পাঁচটি বিষয় ছিল ১. পশ্চিম পাকিস্তানে এক প্রদেশ ২. দুইটি প্রদেশে- পূর্ব ও পশ্চিমে- পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন ৩. যুক্ত নির্বাচন ৪. উর্দু ও বাংলা হবে রাষ্ট্রভাষা ৫. শুধু প্রতিনিধিত্বে নয় বরং সর্ববিষয়ে জনপ্রশাসনে, ব্যবসা-বাণিজ্যে, অর্থনৈতিক সম্পদ ব্যবহারে ও প্রতিরক্ষা বাহিনীতে দুই অংশে সমতা। এই চুক্তি সম্পাদনের অব্যবহিত পরেই ১৯৫৫ সালের ৫ মার্চ অসুস্থ ও অর্ধউন্মাদ গোলাম মোহাম্মদকে বিতাড়ন করে জেনারেল ইসকান্দর মীর্জা হলেন নতুন বড়লাট। পাকিস্তানে তখন প্রথম দুই বড়লাট ছিলেন রাজনীতিবিদ- মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং খাজা নাজিমুদ্দিন। আর দ্বিতীয় দু’জন বড়লাট হলেন সরকারী আমলা- হিসাব বিভাগের কর্মকর্তা গোলাম মোহাম্মদ এবং সেনাবাহিনী ও ভারতীয় রাজনৈতিক সার্ভিসের ইসকান্দর মীর্জা। দু’জনই ছিলেন ভয়ঙ্কর ক্ষমতালোভী এবং ষড়যন্ত্রের রাজনীতিতে অতি দক্ষ।

চলবে...