২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

৬০ মুক্তিযোদ্ধার কাছে ৪শ’ হানাদার হেরে যায়

বৃহত্তর পটুয়াখালী জেলায় পাকবাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের দীর্ঘস্থায়ী সন্মুখযুদ্ধ হয়েছিল গলাচিপা উপজেলার পানপট্টি গ্রামে। যা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ‘পানপট্টি যুদ্ধ’ নামে পরিচিত। এটি হয়েছিল একাত্তরের ১৮ নবেম্বর। নানা কারণে এ যুদ্ধ ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে। বিশেষ করে এ যুদ্ধ প্রমান করে মুক্তিযোদ্ধাদের অনন্য সাহসিকতা। যুদ্ধে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর পক্ষে নেতৃত্ব দিয়েছিল মেজর ইয়ামিন নামের এক পাঞ্জাবী। এই মেজর ইয়ামিন তৎকালীন পটুয়াখালীবাসীর কাছে ইতিহাসের নৃশংসতম খুনী, ধর্ষক, লুটপাটকারী। চরমতম ঘৃণিত ব্যক্তি। পটুয়াখালী সার্কিট হাউসে স্থায়ী ক্যাম্প বসিয়ে মেজর ইয়ামিন এমন কোন অপকর্ম নেই, যা করেনি। মেজর ইয়ামিনের নেতৃত্বে ৩৭৫ পাকসেনাসহ আরও কয়েক শ’ রাজাকার-আলবদর-আলশামস পানপট্টি যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। অপরদিকে মুক্তিযোদ্ধারা সংখ্যায় ছিল সর্বোচ্চ ৬০। যাদের বেশিরভাগের বয়স ছিল কুড়ির কোঠায়। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত স্থায়ী এ সন্মুখযুদ্ধে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বহু সদস্য হতাহত হয়েছিল। এর মধ্যে মুক্তিযোদ্ধারা ৩৫ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করেছিলেন। এর বিপরীতে মুক্তিযোদ্ধাদের কেউ বড় ধরনের আহত পর্যন্ত হয়নি। যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে সন্ধ্যার দিকে পরাজয় নিশ্চিত বুঝতে পেরে মেজর ইয়ামিন ঘনিষ্ঠ সঙ্গীদের নিয়ে স্পীডবোটে পালিয়ে যায়। তবে যাওয়ার আগ মুহূর্তে আরও সৈন্য নিয়ে আসছে, এমন আশ্বাস পাকবাহিনীর যুদ্ধরতদের কাছে বলে যায়। কিন্তু সে আশ্বাসে কাজ হয়নি। বরং মেজর ইয়ামিনের পলায়ন এবং একের পর এক লাশ দেখে পাকবাহিনীর মনোবল ভেঙে পড়ে। মুক্তিযোদ্ধা ও গ্রামবাসীর মুহুর্মুহু জয়বাংলা সেøাগান পাকবাহিনীর মনে আতঙ্ক ধরিয়ে দেয়। রাতের আঁধার জমিয়ে নামার আগেই পাকসেনা ও সহযোগীরা যুদ্ধের মাঠ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়। এ যুদ্ধের মধ্য দিয়ে পটুয়াখালী জেলায় মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয় এবং পাকসেনাদের পরাজয়ের সূচনা হয়। সাধারণ মানুষের মধ্যেও ফিরে আসে মনোবল।

মাত্র ৪০ প্রশিক্ষিত মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে কমান্ডার কে.এম. নূরুল হুদা একাত্তরের সেপ্টেম্বর মাসের শেষের দিকে পানপট্টি সাইক্লোন শেল্টারে পটুয়াখালী দখলের উদ্দেশে ঘাঁটি গেড়েছিলেন। সাইক্লোন শেল্টারটির অবস্থান গলাচিপা উপজেলা সদর থেকে ১০/১২ কিলোমিটার দক্ষিণে ছায়াঘেরা নিভৃত গ্রামে। কে. এম. নূরুল হুদা একাত্তরে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স পরিসংখ্যানের ছাত্র। ছিলেন ফজলুল হক হলের ছাত্রলীগের নির্বাচিত নাট্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক। পানপট্টি ক্যাম্পের সেকেন্ড ইন কমান্ড ছিলেন হাবিবুর রহমান শওকত। তিনিও সে সময় ছাত্র। ভারতে প্রশিক্ষণ নিয়ে তাঁরা যোগ দেন ৯ নম্বর সেক্টরে। পটুয়াখালী ও গলাচিপা থানা নিয়ে গঠিত জোনের জোনাল কমান্ডার হিসেবে কে. এম. নূরুল হুদা এবং সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে হাবিবুর রহমান শওকতকে নিয়োগ দেয়া হয়। পানপট্টি ক্যাম্প থেকে তারা গোটা জেলাব্যাপী যুদ্ধ তৎপরতা শুরু করেন। সে সময়ে পটুয়াখালী জেলা সদরে পাকসেনাদের বিশাল বাহিনী অবস্থান করছিল। মেজর ইয়ামিনের কাছে পানপট্টিতে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান করার খবর পৌঁছে যায়।

মুক্তিযোদ্ধাদের তৎপরতায় অতিষ্ঠ হয়ে মেজর ইয়ামিন তার সামরিক বাহিনী নিয়ে গলাচিপা সদর হয়ে পানপট্টি মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প আক্রমণের উদ্দেশে রওয়ানা দেয়। সাইক্লোন শেল্টারে আকস্মিক হামলা চালিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের নির্মূল করাই ছিল পাকসেনাদের ইচ্ছা। কিন্তু বিচ্ছুবাহিনীর সদস্যরা আগেভাগে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পাকবাহিনীর আক্রমনের খবর পৌঁছে দেন।

Ñশংকর লাল দাশ

গলাচিপা থেকে