১৬ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মাথা উঁচু করে বলতে পারি আমরা মুক্তিযোদ্ধা

  • তিন বীরত্বগাথা

এই দেশ বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে বলতে পারে মুক্তিযুদ্ধের গর্বে আমরাই শ্রেষ্ঠ। ভারি অস্ত্রে সজ্জিত হানাদার পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মাত্র কয় মাসের ট্রেনিংয়ে যুদ্ধে নেমে তাদের পরাভূত করেছে বাংলার তরুণ দামাল ছেলেরা। যারা বীর মুক্তিযোদ্ধা। কখনও গেরিলা যুদ্ধ কখনও আকস্মিক হানাদারদের কবলে পড়ে নিজেদের বুদ্ধিমত্তায় সমুখ সমরে নেমেও বিজয়ী হয়েছে। এমন যুদ্ধেও পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে হতাহতে পরাজিত করে যারা বেঁচে যায়, তাদের যুদ্ধের আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে বন্দী করে বিচারের জন্য তুলে দিয়েছে কমান্ডারের কাছে। মুক্তিযুদ্ধকালে দখলদার পাকিস্তানী বাহিনীকে এই দেশে তাদের স্বাধীনতা দিবস (১৪ আগস্ট) পালন করতে দেয় নি। ওইদিন বোমা মেরে উড়িয়ে দিয়েছে পাক সেনাদের ছাউনি ও পাওয়ার স্টেশন। হানাদার পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর দোসর রাজাকারদের দখলে রেলওয়ে স্টেশনে দিনের বেলায় অস্ত্র ছাড়াই অভিযান চালিয়ে অস্ত্র ছিনিয়ে সেই অস্ত্রেই হানাদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে সেনা বহনকারী জিপ উড়িয়ে দিয়েছে। একদল মুক্তিযোদ্ধার অপারেশনের পর পরবর্তী দল সেনা ও রসদ পরিবহনের ট্রেন উড়িয়ে দিয়েছে। এমনই বীরত্বগাঁথা তিন মুক্তিযোদ্ধার অপারেশনের বর্ণনা।

মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালাম। বয়স ৬৫ পেরিয়েছে। ওই সময় তিনি সরকারী আযিযুল হক কলেজের ¯œাতক শিক্ষার্থী। জুনে ফাইনাল পরীক্ষা। বঙ্গবন্ধুর ডাকে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন। বগুড়ার যমুনা তীরের সারিয়াকান্দি উপজেলার বলাইল গ্রামে তাঁর বাড়ি। দলখদার পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর কবল থেকে দেশ মুক্ত করতে কয়েক তরুণ মিলে যমুনা পাড়ি দিয়ে চলে যান ভারতের মানিকারচরে। সেখানে রিক্রুট হচ্ছিল মুক্তি বাহিনী। গেরিলা ইউনিটে ভর্তি হয়ে এ-উইংয়ে ট্রেনিং নেন শিলিগুড়ির পানিঘাটায়। ট্রেনিং শেষে ১৭ সদস্যের গেরিলা টিম গঠিত হয়। কমান্ডার হন শের আলী আর সেকেন্ড ইন কমান্ডের দায়িত্ব পান সালাম। কুড়িগ্রামের রৌমারী হয়ে দেশে প্রবেশ করেন। গেরিলা কায়দায় যুদ্ধে সফল অপারেশনের পর খবর পান বগুড়ার গাবতলি এলাকায় হানাদার পাকিস্তানী সেনারা ঘাঁটি গেড়ে ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিচ্ছে। মানুষ হত্যা করছে। নারীদের লাঞ্ছিত ও নির্যাতন করছে। ধর্ষণ করছে। দেখতে পান পাকিস্তানী সেনারা লঞ্চে নদী তীর ধরে যাওয়ার সময় নির্বিচারে এলোপাথারি গুলিবর্ষণ করে গ্রামের লোকদের হত্যা করছে। তখন তারা কৌশলে যমুনায় নেমে ডুব সাঁতার দিয়ে তীরে উঠে পজিশন নেয়ার আগেই লঞ্চ চলে যায়। এই ঘটনার পর ক্যাম্প উড়িয়ে দেয়ার পরিকল্পনা করেন। নবেম্বরের প্রথম দিকে কামলা কিষানের ছদ্মবেশে তারা প্রবেশ করে গাবতলি গ্রামে। দুর্গাহাটার কাছে পাক হানাদার ক্যাম্প রেকি করার পর পরিকল্পনা করেন তিনি ও শের আলী। পরের দিনে দেখেন ১২/১৪ সশস্ত্র পাক সেনা গ্রামে প্রবেশের জন্য পথে নেমেছে। মুক্তিযোদ্ধারা কয়েক মিনিটের মধ্যে সমবেত করে তিনটি গ্রুপে ভাগ হয়ে জমির মধ্যে ছদ্মাবরণে এমন ভাবে অবস্থান নেয় যাতে দূর থেকে হাতের ইশারা দেখতে পায়। পরিকল্পনা অনুযায়ী অতর্কিত গ্রেনেড ছুঁড়েই পাক সেনাদের কিছু বুঝে ওঠার আগেই সরাসরি ফায়ার ওপেন করে ক্রলিং করে খোলা পথ দিয়ে বের হয়ে ঘিরে ফেলে। লক্ষ্যভেদী ফায়ার করলে পাকি সেনাদের ব্রাশ ফায়ার বিফলে যায়। জীবিত দুই পাক সেনা হাত উঁচিয়ে সারেন্ডার করলে পরাজিত সৈনিকের প্রিজনার নিয়মে বন্দী করে নৌকায় উঠিয়ে সানন্দবাড়ি ক্যাম্পে নিয়ে কমান্ডারের হাতে তুলে দেন তারা। আব্দুস সালাম বর্তমানে ঢাকায় এক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। স্ত্রী ও তিন ছেলে মুক্তিযোদ্ধার পরিবার হিসাবে গর্বিত।

বীর মুক্তিযোদ্ধা মাসুদ হোসেন আলমগীর নোবেল। বয়স ৬১ অতিক্রম করেছে। মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোকে তিনি বাঙালীর শ্রেষ্ঠ গৌরব বলে মনে করেন। আধুনিক অস্ত্রে প্রশিক্ষিত পাক সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রায় নিরস্ত্র হয়ে বিশ্বে আর কোন জাতি বিপ্লব কিংবা যুদ্ধ করেছে কি না তা মনে করতে পারেন না। বাঙালী যে বিনা অস্ত্রে শত্রুদের ক্যাম্পে হানা দিয়ে তাদেরই অস্ত্র নিয়ে পরাভূত করে বিজয়ী হয়েছে, তার উজ্জ্বল উদাহরণ তিনি। তখন তিনি সরকারী আযিযুল হক কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণীর শিক্ষার্থী। ২৫ মার্চের ক্র্যাক ডাউনের পর তিনি চলে যান ভারতের তরঙ্গপুর ক্যাম্পে। সেখানে মিলিত হন আহসান হাবিব ওয়ালেস, আরশাদ সাইয়িদসহ অনেকের সঙ্গে। গেরিলা ট্রেনিং নিয়ে প্রবেশ করেন পাকিস্তান দখলকৃত বাংলাদেশে। এক পর্যায়ে জানতে পারেন বগুড়ার সুখানপুকুর রেল স্টেশনে হানাদার পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তাদের এ দেশী দোসর রাজাকাররা অবস্থান নিয়ে গ্রামের পর গ্রামে নির্বিচারে অত্যাচার নির্যাতন করছে। মাসুদ হোসেন আলমগীর তার গ্রুপ কমান্ডার ওই সময়ে তৃতীয় বর্ষের মেডিক্যাল ছাত্র আহসান হাবিবকে বিষয়টি জানালে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত দেন গেরিলা এ্যাটাক এবং শত্রুর অস্ত্র দিয়েই ঘায়েল করার। সেকেন্ড ইন কমান্ড নোবেল পরিকল্পনা করে। ছদ্মবেশে সকলে আশ্রয় নেয় স্টেশনের কাছে শিহিপুর গ্রামে পরিচিতের বাড়িতে। তারপর প্রথা অনুযায়ী রেকি করে সিদ্ধান্ত নেয় দিনের বেলা স্টেশন আক্রমণের। ওরা মাত্র ৬ জন। প্রতেকে দু’টি করে গ্রেনেড কোমরে এঁটে নেয়। স্টেশন মাস্টারের রুম, সিগনাল ঘর ও পাশের গুদামে রাজাকাররা দিনের বেলায় বেশ আয়েশ করে অবস্থান নিয়ে আছে। গেরিলা কায়দায় পাট ও ধানের ক্ষেত দিয়ে ক্রলিং করে দুপুর বেলা অতর্কিত দুটি গ্রেনেডের বিস্ফোরণ ঘটানোর সঙ্গে সঙ্গে রাজাকাররা এলোমেলো হয়ে যায়। রাজাকাররা ফায়ার ওপেনের মুহুর্তে আরেক পাশ দিয়ে গেরিলা আক্রমণ করলে অস্ত্র ছেড়ে ওরা পালিয়ে যায়। ওদের অস্ত্র নিয়েই গুলি ছুঁড়লে রাজাকাররাও পাল্টা গুলি করতে থাকে। গুলি চালিয়ে পরাস্ত করে সব অস্ত্র ছিনিয়ে নেয়। মুক্ত করা হয় সুখানপুকুর রেল স্টেশন। এরপর রেলপথ ধরে এগিয়ে সাবগ্রাম এলাকায় পাক সেনাদের পথে মাইন বসিয়ে অপেক্ষায় থাকা। সেনাদের একটি জিপ অতিক্রমের সময় ডিটোনেটর দিয়ে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে উড়িয়ে দিয়ে সংগ্রহ করা হয় আধুনিক অস্ত্র। এই অপারেশন হয় দিনের বেলা। মুক্তিযোদ্ধাদের এমন বীরত্বে এলাকার মানুষ এতটাই আত্মবিশ্বাসী হয় যে, তারা বুঝেই ফেলে আর দেরি নেই। দেশ মুক্ত হতে আর দেরি হয়নি। নোবেল বর্তমানে ঢাকায় বহুজাতিক কোম্পানি এভারি বাংলাদেশ লিমিটেডের উর্ধতন কর্মকর্তা। স্ত্রী ও দুই কন্যা সন্তান নিজেদের ঘরের এই বীর মুক্তিযোদ্ধার গর্বে গর্বিত।

ডা. আরশাদ সায়ীদ। বয়স প্রায় ৬৩। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি দ্বিতীয় বর্ষের মেডিক্যাল শিক্ষার্থী। ভারতের তরঙ্গপুর ক্যাম্পে গেরিলা ট্রেনিং নিয়ে প্রবেশ করেন দেশে। অঙ্গীকার দেশকে মুক্ত করার। ৭ নস্বর সেক্টরের প্রথম সেক্টর কমান্ডার মেজর নাজমুল হক তাকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেন। প্রবাসী সরকারের নির্দেশে মেজর নাজমুল মুক্তিযুদ্ধের তালিকা প্রণয়নে নাম লিপিবদ্ধ করেন। ভলিউমে প্রথম নাম ছিল আহসান হাবিব ওয়ালেস, দ্বিতীয় ডা. আরশাদ সায়ীদ ও তৃতীয় মাসুদ হোসেন আলমগীর। তালিকা অনুযায়ী ডা. আরশাদ দ্বিতীয়। সেক্টর কমান্ডার নাজমুল মুক্তিযুদ্ধের সময় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হলে তার স্থলাভিষিক্ত হন মুক্তিযোদ্ধা নুরুজ্জামান। ৭১ এর আগস্ট মাসে বগুড়ার সাবগ্রামে সফল গেরিলা অপারেশনের পর গ্রুপ কমান্ডার আহসান হাবিব ওয়ালেস সিদ্ধান্ত নেন আরও একটি বড়সড় সফল অপারেশনের। ১৪ আগস্ট পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস। হানাদার পাকিস্তানীরা যেন তাদের স্বাধীনতা দিবস এই দেশে পালন করতে না পারে, তার পরিকল্পনা করা হয়। এই অপারেশনের দায়িত্ব বর্তায় আরশাদের ওপর। ঠিক করা হয় বগুড়া পাওয়ার হাউস থেকে যে মেইন লাইন বের হয়ে গেছে, এক্সপ্লোসিভ দিয়ে তা উড়িয়ে দিলে একদিকে বগুড়া অন্ধকার থাকবে, আরেকদিকে পাক সেনাসহ স্থানীয়রা জানবে মুক্তিবাহিনী শহরে ঢুকে পড়েছে। ওদের ১৪ আগস্টের অনুষ্ঠান প- হবে। অপারেশনটি বিপজ্জনক। পাওয়ার হাউসে পাক সেনাদের আছে কঠোর নজরদারী। চারদিকে সার্চ লাইট। সামনে ট্যাঙ্ক। পরিকল্পনা অনুযায়ী গ্রুপ করে আরশাদ, নোবেল ও সাইফুল বাজারের চটের ব্যাগে কাঠের আসবাবপত্রে লাগানো পুটিংয়ের মতো এক্সপ্লোসিভ রেখে ওপরে শাক সবজি দিয়ে ঢেকে রং মিস্ত্রির ছদ্মবেশে পথে নামে। ব্যাগে আরও ছিল সামান্য কাপড়চোপড়, যা দিয়ে কৌশলে ঢেকে দেয়া হয় ডিনামাইট ও ডেটোনেটর। গেরিলা অপারেশনের কায়দায় কোমরে গামছায় বেঁধে রাখে দু’টো করে গ্রেনেড। অনেকটা হাঁটা পথ পাড়ি দিয়ে রাত ৮টার দিকে বগুড়া পৌঁছে ওই সময়ে শহরের ভিতরে এবড়ো থেবড়ো পথ পেরিয়ে পাওয়ার হাউসের কাছাকাছি অবস্থানে গিয়ে দেখা গেল পাক সেনার এক কনভয় পার হচ্ছে। রাতের মেঘলা আকাশ ঘুটঘুটে অন্ধকার। হঠাৎ টর্চের আলোয় চমকে ওঠে সবাই। কিছুক্ষণের মধ্যেই টের পাওয়া গেল সামনে পিছনে ১০/১২ পাকিস্তানী মিলিশিয়া বাহিনী। আরশাদদের বাড়িতে অবাঙালিরা ভাড়া থাকায় আধোভাঙা উর্দু জানতেন। মিলিশিয়াদের প্রশ্নে ভাঙা উর্দুতে বললেন তারা রং মিস্ত্রি । কাজ শেষে ফিরতে দেরি হয়েছে। বাজারের ব্যাগ দেখে ওরা মনে করলো রং মিস্ত্রিই হবে। পাক সেনার কাছে নিয়ে যাওয়ার আগে কিছুক্ষণ বসতে দিলে আরশাদ, নোবেল ও সাইফুল ভাবলেন মারা তো পড়েছি। বুদ্ধির খেলা খেলে শেষ চেষ্টা করে দেখা যাক। ওদের অবস্থান পাওয়ার গ্রিডের মূল তারের কাছেই। কেবিন বক্স সেখানে। দেরি না করে এদিক ওদিক তাকিয়ে বের হওয়ার পথ দেখে নিয়ে সার্চ লাইটের কন্ট্রোল প্যানেল বরাবর গ্রেনেড চার্জ করে কারও কিছু বুঝে ওঠার আগেই ডিনামাইট বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দৌড়। পাশের ডোবার মধ্যে ক্রলিং করে এগোবার সময় গোঙানীর শব্দ পাওয়া গেল। অন্ধকারে পাক মিলিশিয়ারা ছুটোছুটি করতে থাকে। ততক্ষণে যা হবার তা হয়ে গেছে। হানাদারদের অনুষ্ঠান আর হয়নি। ডা. আরশাদ সায়ীদ বর্তমানে চিকিৎসক হিসাবে বগুড়া শহরে বাস করছেন। তার স্ত্রী ও দুই সন্তানের মুক্তিযুদ্ধের গর্ব ভরা মুখ।

Ñসমুদ্র হক, বগুড়া থেকে

নির্বাচিত সংবাদ