২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

দুই যুগ পরও বরিশালের অনেক দফতর খুলনায়

  • নগর উন্নয়নে ভাটা

খোকন আহম্মেদ হীরা, বরিশাল ॥ স্বাধীনতার ৪৪ বছরেও কাক্সিক্ষত উন্নয়ন হয়নি বরিশালসহ গোটা দক্ষিণাঞ্চলের। ফলে উন্নয়ন বরাদ্দে বৈষম্যের শিকার এ অঞ্চলে দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধি পেয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নদী ভাঙ্গনসহ একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হয়ে মানুষ ছুটছেন অন্যত্র।

সূত্রমতে, এ অঞ্চলে বিগত ৪৪ বছরেও তেমন কোনো শিল্প কল-কারখানা গড়ে ওঠেনি। দু’যুগ পূর্বে বরিশালকে বিভাগ ঘোষণা করা হলেও অনেক বিভাগীয় দপ্তর এখনো রয়েছে এ অঞ্চলের পূর্বের বিভাগ খুলনায়। এখানকার মানুষকে দু’যুগ পরেও ট্রেড ইউনিয়নের রেজিস্ট্রেশন, পেট্রোলপাম্প ও জ্বালানি তেল ক্রয়-বিক্রয়ের বিস্ফোরক লাইসেন্স অনুমোদন ও নবায়নের জন্য ছুটতে হচ্ছে খুলনায়। আমদানিকারকদের পণ্য শুল্কায়নের জন্য এখানকার ব্যবসায়ীরা এনবিআরের কর্মকর্তাদের কাছে বছরের পর বছর ঘুরে স্থানীয় ভ্যাট অফিসকে কাজে লাগিয়ে শুল্কায়ন করতে পারছেন না। তাদেরকে ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা পণ্য শুল্কায়নের জন্য পণ্যবাহী জাহাজ নিয়ে পুনরায় ছুটতে হচ্ছে খুলনায়।

ইতিহাসবিদ ড. সিরাজ উদ্দিন আহমেদ জানান, শুধু স্বাধীনতার পরবর্তী ৪৪ বছরই নয়; এর আগেও বরিশালবাসীর বঞ্চনার ইতিহাস দু’শ’ বছরেরও অধিক সময়ের। তিনি বলেন, ১৮৯৭ সালে তৎকালীন বাকেরগঞ্জ জেলা প্রতিষ্ঠিত হলেও কালেক্টরেটের মর্যাদা লাভ করে ১৯১৭ সালে। তখন জেলার আয়তন ছিল ৪ হাজার ২৪০ বর্গমাইল। লোকসংখ্যা ছিল ১৮ লাখ ৭৮ হাজার ১৪৪ জন। ১৯০১ সালের পূর্বে এখানে কোর্ট-কাচারী প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি। ১৯৬৯ সালের ৫ মে বগুড়া, কাউনিয়া, আলেকান্দা ও আমানতগঞ্জ নিয়ে যে টাউন কমিটির জন্ম হয় সেটিই পরবর্তীতে পৌরসভা এবং সেখান থেকে ২০০১ সালে সিটি কর্পোরেশনে রূপ নেয়। পৌরসভা প্রথম শ্রেণীতে উন্নীত হওয়ার সময় লোকসংখ্যা ছিল প্রায় দেড় লাখ। আয়তন ছিল ১০ বর্গমাইল। বর্তমানে সিটি কর্পোরেশনের লোকসংখ্যা প্রায় ৭ লাখ। আয়তন ৫৮ বর্গকিলোমিটার।

১৯৭৯ সালে ২৩ নবেম্বর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এখানে সার্কিট হাউসে মন্ত্রিপরিষদের সভায় বরিশালকে বিভাগ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা করেন। এরপর বিষয়টি ফাইল চাপা পড়ে যায়। ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ১৪ ডিসেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এখানকার এক জনসভায় বরিশালকে বিভাগ ঘোষণা করেন। ১৯৯৩ সালের ১ জানুয়ারি নগরসংলগ্ন ইছাকাঠীতে বিভাগীয় সদর দফতর প্রতিষ্ঠা করা হয়। সিটি কর্পোরেশন বিলটি পাস হয় ২০০১ সালে। ২০০২ সালে ২০ কিলোমিটার বর্ধিত এলাকা নিয়ে ৩০টি ওয়ার্ডের মাধ্যমে সিটি কর্পোরেশনের কার্যক্রম শুরু করা হয়। ২০০৬ সালের অক্টোবর মাসে মেট্রোপলিটন পুলিশের কার্যক্রম শুরু হয়। ৫ বছর তা ছিল একটি থানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। পরবর্তীতে নতুন ৩টি থানার কার্যক্রম চালু করা হয়।

বরিশাল শহরের রূপ-সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়ে এক সময় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বরিশালকে আখ্যায়িত করেছিলেন ‘প্রাচ্যের ভেনিস’ হিসেবে। শহরের সেই রূপ-সৌন্দর্য দিনে দিনে ম্লান হলেও প্রয়াত সিটি মেয়র শওকত হোসেন হিরনের ক্ষমতার ৫ বছর নগরীর ২৫ কিলোমিটার পুরনো এলাকায় আধুনিকতার ছোঁয়া দেয়া হয়েছিল। গত দুই বছরে তাতেও ভাটা লাগতে শুরু করেছে। সরকারদলীয় সিটি মেয়র নির্বাচিত না হওয়ায় আর্থিক সঙ্কটে নতুন প্রকল্প গ্রহণ তো দূরের কথা পুরনো কার্যক্রমও মুখ থুবড়ে পড়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, নগর উন্নয়নে স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে যে সামান্য বরাদ্দ এসেছে তারও যথাযথ ব্যবহার হয়নি। পৌরসভার আমলে বিএনপি সরকার এখানে সোডিয়াম বাতি ও সড়কের মোড়ে মোড়ে সিগন্যাল বাতি স্থাপন করেছিল। ওই বাতি অচল-সচল করার নানান টালবাহানায় ভাউচার দিয়ে লাখ লাখ টাকা বিভিন্ন সময়ে লোপাট করা হয়েছে। সেই সিগন্যাল বাতির এখন কোন অস্তিত্ব নেই এই নগরীতে। কাঙ্খিত উন্নয়ন না হওয়ার জন্য আর্থিক সঙ্কটের কথাই বলে আসছেন বর্তমান ও সাবেক মেয়রগণ। এ পর্যন্ত সিটি কর্পোরেশনের সকল মেয়রই দায়িত্ব পালনকালে প্রতিবছর বাজেট বক্তৃতায় একটি ট্রাক টার্মিনাল ও আধুনিক পার্ক নির্মাণের ঘোষণা দিলেও আজও তা বাস্তবায়িত হয়নি। পানি সংকট নিরসনের জন্য বহুল প্রত্যাশিত ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট নির্মাণের কাজ চলছে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শুরু থেকে। আজও শেষ কাজ চলমানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।

নগর উন্নয়ন সম্পর্কে সিটি মেয়র আহসান হাবিব কামাল জানান, বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের আয়তন ২৫ থেকে বেড়ে ৫৮ কিলোমিটার হয়েছে। আর সিলেট সিটি কর্পোরেশনের আয়তন মাত্র ২৬ কিলোমিটার। অথচ সরকারি বরাদ্দের সময় দুটি কর্পোরেশনকেই একই বাজেটের অনুদান দেয়া হয়। তিনি বলেন, সিটি কর্পোরেশনের শুরুতে যেসব সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে তা এখন বার বার সংস্কার করার জন্য ব্যয় বেড়েছে। একই সঙ্গে নতুন নতুন সড়ক, সেতু ও কালভার্টসহ নানান স্থাপনা নির্মাণ করা জরুরী হয়ে পড়েছে। ফলে নগর ভবনের ব্যয় বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। সেই তুলনায় সরকারী বরাদ্দ বা রাজস্ব বাড়েনি। ফলে স্বাভাবিক কারণেই কাক্সিক্ষত উন্নয়ন করা সম্ভব হচ্ছে না।