২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

রাজধানীতে ভবন নির্মাণে তিন সংস্থার অনুমোদন বাধ্যতামূলক হচ্ছে

  • রাজউকের আপত্তি

মশিউর রহমান খান ॥ রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় আবাসিক বা বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণে সরকারের ৩ সংস্থার কাছ থেকে অনুমোদন নেয়া বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। এর ফলে এসব এলাকায় যে কোন আবাসিক ভবন নির্মাণের জন্য ভবনের মালিককে বা প্রতিষ্ঠানকে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ছাড়াও সিটি কর্পোরেশন ও ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) অনুমতি বাধ্যতামূলকভাবে নিতে হবে। সম্প্রতি ডিটিসিএ বোর্ডসভার বৈঠকে প্রস্তাবটি উত্থাপন করা হয়। এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সরকার অতি দ্রুত প্রজ্ঞাপন জারি করবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ আইন ২০১২-এর ধারা ৯-এর উপধারা (ঠ) অনুযায়ী ফি আরোপ করা হবে। তবে এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে আপত্তি রয়েছে রাজধানী ও আশপাশের এলাকার ভবন বা যে কোন স্থাপনা নির্মাণে নকশা অনুমোদনকারী একমাত্র প্রতিষ্ঠান রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক)। জানা গেছে, ভবন নির্মাণে এ পদ্ধতিতে যে কোন নকশা অনুমোদন করলে রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় পরিবহন ব্যবস্থা সমন্বয় করতে ও ট্রাফিক জ্যাম কমাতে এটি কাজ করবে। ঢাকা শহরে পরিবহন ব্যবস্থা সমন্বয়ের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের প্রধান দায়িত্ব ডিটিসিএর। আর সড়কের মালিকানা সিটি কর্পোরেশনের আওতায়। তাই ভবনের নকশা অনুমোদনে রাজউকের পাশাপাশি এ দুই সংস্থার অনুমোদনের চিন্তা করা হচ্ছে।

বর্তমান নিয়মানুযায়ী শুধু রাজউককে নির্ধারিত ফি প্রদান করতে হলেও এ সিদ্ধান্তের ফলে নতুন ২ সংস্থাকেও পৃথক পৃথক নির্ধারিত ফি প্রদান করতে হবে। এ ছাড়া নতুন যে কোন আবাসন প্রকল্প অনুমোদনে রাজউকের পাশাপাশি ডিটিসিএর অনুমোদন লাগবে। এ জন্য উভয় সংস্থাকে একরপ্রতি নির্ধারিত চার্জ দিতে হবে। এর বাইরে আবাসন প্রকল্প অনুমোদনে পরিবেশ অধিদফতর ও ঢাকা ওয়াসার অনুমোদন নিতে হবে। এ জন্যও পরিশোধ করতে হবে পৃথক ফি। ডিটিসিএ আনীত প্রস্তাবে বলা হয়েছে, নতুন আবাসিক ভবন নির্মাণের ফলে এর বাসিন্দার সংখ্যা বাড়বে। এতে বাড়বে শহরে ট্রাফিক সার্কুলেশন। আর বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের ফলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় গাড়ি চলাচল বাড়বে। এ জন্য সড়ক ব্যবহার ফি ও ট্রাফিক সার্কুলেশন বাবদ চার্জ সিটি কর্পোরেশন ও ডিটিসিএকে দিতে হবে।

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সাধারণত কোন এলাকায় বা নির্দিষ্ট রাস্তায় গাড়ির ধারণ ক্ষমতা কত, সে হিসাব রাখা হয় না। এ অবস্থায় একটি বহুতল ভবন বা প্রকল্পে কতগুলো গাড়ি ব্যবহার হয় এবং তার ফলে রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি যানজট হয় কিনা, তা বিবেচনায় নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ ছাড়া ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরাতে ও রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হলে বাড়তি খরচ গুনতে হয় সরকারী সংস্থাকে। এ জন্যই ক্ষতিপূরণ বা সেবামূল্য হিসেবে ‘ফি’ বা ‘কর’ আদায় করা হবে। অন্যান্য সেবা সংস্থা যেমন বিভিন্ন কারণে কর আদায় করে, তেমনি ডিটিসিএ কর আদায় করবে। এটি ট্রাফিক ইমপ্যাক্ট এ্যাসেসমেন্ট ফি হিসেবে বিবেচিত হবে। এ জন্য ট্রাফিক সার্কুলেশন এক্সিমিনি নামে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ আইন ২০১২-এর ধারা ৯-এর উপধারা (ঠ) অনুযায়ী এ ফি আরোপ করা হবে। উক্ত কমিটিই ফি আদায়ের প্রস্তাব করেছে।

ফি সম্পর্কে জানা গেছে, নতুন আবাসন প্রকল্প অনুমোদনের জন্য রাজউককে একরপ্রতি ৩ হাজার ও ডিটিসিএতে ১ হাজার টাকা ফি দিতে হবে। আর পরিবেশ অধিদফতরকে জমির মূল্য অনুপাতে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত পরিশোধ করতে হবে। একইভাবে ওয়াসাকে সর্বোচ্চ ৬৯ হাজার টাকা চার্জ দিতে হবে আবাসন প্রকল্পের অনুমোদন গ্রহণে। তবে আওতাভুক্ত না হওয়ায় নতুন আবাসন প্রকল্পে সিটি কর্পোরেশনের অনুমোদন লাগবে না। এ ছাড়া ৩০ হাজার বর্গমিটারের উর্ধে বহুতল ভবনের নকশা অনুমোদনে তিন সংস্থায় ফি লাগবে ৮ লাখ ২০ হাজার টাকা। এর মধ্যে রাজউকে ৩ লাখ ৩৫ হাজার, সিটি কর্পোরেশনে ৩ লাখ ৩৫ হাজার ও ডিটিসিএতে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা দিতে হবে। ২০ থেকে ৩০ হাজার বর্গমিটার পর্যন্ত ভবনের নকশা অনুমোদনে ফি দিতে হবে ৫ লাখ ১৪ হাজার টাকা। এর মধ্যে রাজউক ও সিটি কর্পোরেশন ২ লাখ ৭ হাজার টাকা করে ও ডিটিসিএ ১ লাখ টাকা পাবে।

এ ছাড়া ১৫ থেকে ২০ হাজার বর্গমিটার আকারের ভবনে নকশা অনুমোদনে ফি লাগবে ৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে রাজউক ও সিটি কর্পোরেশন পাবে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা করে ও ডিটিসিএ ৭০ হাজার টাকা। ১০ থেকে ১৫ হাজার বর্গমিটার ভবনের নকশা অনুমোদনে ফি হিসেবে তিন সংস্থা পাবে যথাক্রমে ১ লাখ ৫ হাজার, ১ লাখ ৫ হাজার ও ৫০ হাজার টাকা। অর্থাৎ মোট ফি দিতে হবে ২ লাখ ৬০ হাজার টাকা। আর ৫ থেকে ১০ হাজার বর্গমিটারের ভবনের নকশা অনুমোদনে ফি পরিশোধ করতে হবে ২ লাখ ৬ হাজার টাকা। এর মধ্যে রাজউক ও সিটি কর্পোরেশন পাবে ৮৩ হাজার টাকা করে ও ডিটিসিএ ৪০ হাজার টাকা। এর বাইরে তিন সংস্থায় চার থেকে পাঁচ হাজার বর্গমিটারের জন্য ১ লাখ ৪৪ হাজার টাকা, তিন থেকে চার হাজার বর্গমিটারে ৯৮ হাজার টাকা, দুই থেকে তিন হাজার বর্গমিটারে ৬২ হাজার টাকা, দেড় থেকে দুই হাজার বর্গমিটারে ২৭ হাজার টাকা ও এক থেকে দেড় হাজার বর্গমিটারের জন্য ২০ হাজার ৬০০ টাকা ফি দিতে হবে। ফি পরিশোধ করতে হবে এর চেয়ে কম আয়তনের ভবনের নকশা অনুমোদনেও।

ডিটিসিএ সূত্রে জানা গেছে, নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে ভবন ও প্রকল্পের ট্রাফিক সার্কুলেশন ফি নির্ধারণ নিয়ে ২০১৪ সালের ১৯ জুন ডিটিসিএর তৃতীয় বোর্ডসভায় প্রথম আলোচনা হয়। ওই বছরের ১ অক্টোবর পরিচালনা পর্ষদের চতুর্থ সভায় রাজউকসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ফি যাচাই করে তুলনামূলক বিবরণী উত্থাপন করা হলেও বিস্তারিত আলোচনা হয়নি। এরপর ডিটিসিএ এর নিজস্ব আয়ের উৎস তৈরিতে প্রস্তাবটি কার্যকরে মন্ত্রণালয় উদ্যোগী হয়। এরই ধারাবাহিকতায় গত মাসে অনুষ্ঠিত ডিটিসিএর সপ্তম বোর্ড সভায় ফির হারসহ প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। বিষয়টি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। সংস্থার অষ্টম বোর্ডসভায় এটি অনুমোদন দেয়া হবে বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে মতামত জানতে চাইলে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) চেয়ারম্যান জিএম জয়নাল আবেদীন জনকণ্ঠকে বলেন, এককালীন ডিআইটি থেকে শুরু করে বর্তমান রাজউক রাজধানীসহ আশপাশের নির্ধারিত এলাকায় যে কোন প্রকার ভবন বা স্থাপনা নির্মাণে যুগের পর যুগ ধরে সফলতার সঙ্গে নকশা অনুমোদন দিয়ে আসছে। সরকার নির্ধারিত ফির বিনিময়ে এ কাজে আমাদের নকশা অনুমোদনে অন্য কোন সংস্থার সাহায্য নেয়ার প্রয়োজন হয় না। এ ছাড়া সরকারের সর্বশেষ ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ২০০৮ অনুযায়ী রাজউকের এলাকায় যে কোন প্রকার একক বা একাধিক স্থাপনা নির্মাণের জন্য নকশা অনুমোদনের একমাত্র কর্তৃপক্ষ হিসেবে রাজউককে নির্ধারিত করে দেয়া হয়েছে। তবে প্রয়োজনের স্বার্থে সিটি কর্পোরেশন বা ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) যে কোন প্রকার সহায়তা চাইলে রাজউক কর্তৃপক্ষ তা করবে। ভবন নির্মাণে নকশা অনুমোদনের জন্য রাজউকের সঙ্গে অন্য সংস্থার অনুমতি প্রদান বাধ্যতামূলক করলে উন্নয়ন কাজ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।