২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মৌলবাদী জঙ্গীরা সশস্ত্র সম্মুখ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ॥ বারকাত

  • ‘মৌলবাদের অর্থনীতিতে ২৩১ বেসরকারী সংস্থা, ট্রাস্ট ও ফাউন্ডেশন কাজ করছে’

স্টাফ রিপোর্টার ॥ বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. আবুল বারকাত বলেছেন, শিক্ষার সাম্প্রদায়িকীকরণ মৌলবাদের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। তিন দশকে প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেলেও মাদ্রাসা বেড়েছে ৮ গুণ। সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষার্থী দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেলেও দাখিল মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী বেড়েছে ১৩ গুণ। মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের মাথাপিছু রাষ্ট্রীয় ব্যয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে সাধারণ শিক্ষার্থীর তুলনায় বেশি। মাধ্যমিক পর্যায়ে ছাত্রছাত্রীর মাথাপিছু রাষ্ট্রীয় ব্যয় ৩ হাজার টাকা হলেও সরকারী মাদ্রাসা খাতে তা ৫ হাজার টাকা।

শনিবার রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে ‘বাংলাদেশে মৌলবাদের রাজনৈতিক অর্থনীতি ও জঙ্গীবাদ : মর্মার্থ ও করণীয়’ শীর্ষক জাতীয় সেমিনারে মূল প্রবন্ধ পাঠকালে তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির আয়োজনে এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেমিনারে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. আশরাফ উদ্দিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে প্রবন্ধের ওপর সূচনা বক্তব্য প্রদান করেন সমিতির সাধারণ সম্পাদক ড. জামাল উদ্দিন আহমেদ।

মূল প্রবন্ধ পাঠকালে ড. আবুল বারকাত বলেন, দেশে ১৩২টি চিহ্নিত জঙ্গী সংগঠন রয়েছে, যা সরকার ইতোমধ্যে নিষিদ্ধ করেছে। মৌলবাদের অর্থনীতিতে ২৩১টি বেসরকারী সংস্থা, ট্রাস্ট ও ফাউন্ডেশন কাজ করছে। এসব ট্রাস্ট ও ফাউন্ডেশন বিদেশে মুনাফা পাচার করছে। তিনি বলেন, ‘এসব ট্রাস্ট ও ফাউন্ডেশন মৌলবাদের অর্থনীতি দ্বারা অর্জিত মুনাফা পাচারের একটি কৌশলমাত্র।’

প্রবন্ধে সাম্প্রদায়িকতা-ধর্মভিত্তিক মৌলবাদ-মৌলবাদী জঙ্গিত্বের স্বরূপ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘ধর্মীয় মৌলবাদ হচ্ছে যুদ্ধংদেহী এক ধর্মপ্রীতি। এটা এমনই এক বিশ্বাস যা প্রতিনিয়ত আদর্শিক সংঘর্ষের জন্য তৈরি থাকার প্রেরণা জোগায়। বড় ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে এর অস্তিত্ব সুস্পষ্ট।’

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে দেশে মৌলবাদী অর্থনীতির বার্ষিক নিট মুনাফা ২ হাজার ৪৬৪ কোটি টাকা। আর বিগত চার দশকে তাদের পুঞ্জীভূত নিট মুনাফার পরিমাণ বর্তমান মূল্যে আনুমানিক প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা। যুদ্ধাপরাধের বিচার কাজ বাধাগ্রস্ত করতে লবিস্ট নিয়োগেই পাহাড়সম এ সম্পদের সিংহভাগ ব্যয় হচ্ছে। তিনি বলেন, দেশে সরকার ঘোষিত ১৩২টি জঙ্গী সংগঠন রয়েছে। নিষিদ্ধ ঘোষিত এই জঙ্গীগোষ্ঠী আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা সফলও হয়েছে। আর বর্তমানে তারা শরিয়াহভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনে সশস্ত্র সম্মুখ যুদ্ধের জন্যও প্রস্তুত রয়েছে।

মৌলবাদীদের অর্থ বাজেয়াফতের দাবি জানিয়ে বিশিষ্ট এই অর্থনীতিবিদ বলেন, জঙ্গীদের আয়ের উৎসমুখ বন্ধ করে সংশ্লিষ্ট সকল সম্পদ বাজেয়াফত করতে হবে। শুধু তাই নয়, বাজেয়াফতকৃত ওই সম্পদ ১৯৭১’র মহান মুক্তিযুদ্ধে যারা শহীদ হয়েছেন, পঙ্গুত্ববরণ করেছেন, অসচ্ছল জীবনযাপন করছেন তাদের মধ্যে বিলি বণ্টন করতে হবে। এছাড়া সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনসহ মানব উন্নয়নমূলক কর্মকা-ে ব্যয় করা যেতে পারে। জঙ্গীবাদ মোকাবেলায় গণসচেতনতা তৈরি ও জুমার নামাজে খুতবায় নজরদারি বাড়ানোর তাগিদ দেন তিনি।

প্রবন্ধকার তার প্রবন্ধের ‘ধর্ম ও ব্রেইন : ¯œায়ুতান্ত্রিক বা মনোজাগতিক ধর্ম দর্শনের যে বিষয়টি বোঝা জরুরী’ অনুচ্ছেদে ধর্মের সঙ্গে মানুষের ব্রেইনের সম্পর্ক খোঁজার চেষ্টা করেছেন। তিনি বলেন, ‘বিশ^ব্যাপী এ মুহূর্তে মোট ধর্মের সংখ্যা ১০ হাজারের অধিক। যে কোন ধর্মই হোক না কেন প্রত্যেক ধর্মই দৃঢ়ভাবে বিশ^াস করে যে ‘সত্য’ একটিই এবং সেটা ওই ধর্মেই নিহিত। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ ও মৌলবাদী জঙ্গিত্ব থেকে মুক্তি পাবার জন্য করণীয়সমূহ কি হবে? কি এবং কেমন হতে পারে উত্তরণের পথনির্দেশ? কী সে কারণ যা পৃথিবীতে এত মানুষকে ধর্ম পালনে উদ্বুদ্ধ করে? ধর্মের বিবর্তনগত সুবিধাসমূহ কী কী?’ তিনি এও উল্লেখ করেছেন অনেক ক্ষেত্রেই এসব প্রশ্নের উত্তর অমীমাংসিত।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, অর্থনীতি ও রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন, সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মভিত্তিক মৌলবাদ এবং সংশ্লিষ্ট জঙ্গীবাদ আর বিচারহীনতার সংস্কৃতি মিলেমিলে জনমানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে ক্রমবর্ধমান বঞ্চনা-বৈষম্য-অসমতা। এর সব কিছুই সুদীর্ঘ মুক্তি সংগ্রাম ও একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী- যা ওই চেতনার সঙ্গে সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী, উল্টো ও পুনর্মাত্রায় সাংঘর্ষিক। তাই আসুন সবাই মিলে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের ‘জয় বাংলা’ চেতনায় আরও একবার ভাবি আর ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে যা করা যুক্তিসঙ্গত সে পথে সক্রিয় অংশগ্রহণ করি।