২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

যুক্তরাষ্ট্রে বছরে বন্দুক সন্ত্রাসের বলি ১১৩৮৫ জন

  • অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইন সংস্কারে মার্কিন কংগ্রেস নির্বিকার

শংকর কুমার দে ॥ বাংলাদেশের চেয়ে বন্দুক সন্ত্রাসের ঘটনা বেশি ঘটছে যুক্তরাষ্ট্রে। শুধু তাই নয়, বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে বন্দুকের ব্যবহার হচ্ছে সর্বাধিক। প্রতিবছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে কেবল বন্দুক সন্ত্রাসের বলি হচ্ছেন ১১৩৮৫ জন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে বন্ধুক সন্ত্রাস আইন সংস্কার করার জন্য কংগ্রেসকে অনুরোধ জানিয়ে অন্তত ১৫টি বিবৃতি দিয়েছেন। তারপরও যুক্তরাষ্ট্রে বন্দুক সন্ত্রাস কমছে না, বরং বেড়েই চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের বন্দুক সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলেও বাংলাদেশের সন্ত্রাস দমন ইস্যুতে দু’দিনের সফরে রবিবার বাংলাদেশে আসছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তিন সদস্যের প্রতিনিধি দল। তারা বিভিন্ন পদস্থ কর্মকর্তার সঙ্গে অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে বাংলাদেশের সন্ত্রাস, নিরাপত্তা বিষয়ে মতবিনিময় করবেন। এই খবর দিয়েছেন বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা।

গোয়েন্দা সংস্থার একজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার একটি প্রতিবন্ধী উন্নয়ন কেন্দ্রে বন্দুকধারীদের গুলিতে ১৪ জন নিহত হওয়ার ঘটনা মার্কিনী সমাজে অস্থিরতারই বহির্প্রকাশ ছাড়িয়ে বিশ্বব্যাপী আলোড়ন তুলেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিচার ও বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ক কাউন্সিলের তথ্যমতে, আমেরিকার বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে বছরে গড়ে বন্দুক সন্ত্রাসের বলি হচ্ছে ১১৩৮৫ জন। এই বার্ষিক গড় হিসাব ২০০১ সাল থেকে ২০১১ সালের মধ্যে। বিচার ও বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ক কাউন্সিল আরও বলেছেন, আলোচ্য বছরে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় ৫১৭ জন মারা গেছেন। অপরদিকে শুটিং ট্রেকার, গান ভায়োলেন্স আর্কাইভ’র তথ্যানুযায়ী, ২০১৫ সালের ১ অক্টোবর পর্যন্ত আমেরিকায় ২৯৪টি বন্দুক সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৪৫টি গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে স্কুলগুলোকে কেন্দ্র করে। এসব বন্দুক সন্ত্রাসে মারা গেছে ৯৯৫৬ জন। আহত হয়েছে ২০ হাজার। শুটিং ট্রেকার পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, ২০১২ সাল থেকে অক্টোবর ২০১৫ সাল পর্যন্ত মার্কিন

যুক্তরাষ্ট্রে ৯৯৪টি বন্দুক সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ২০০৬ সালের পর থেকে এ যাবত ২০০টি বন্দুক সন্ত্রাস রেকর্ড করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই।

খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যখন এই অবস্থা তখন তারা নিজ দেশের বন্দুক সন্ত্রাস দমনে সফলতার পরিচয় দিতে না পারলেও বাংলাদেশে আসছেন সন্ত্রাস দমন ও নিরাপত্তা বিধানের জন্য। রবিবার বাংলাদেশে আসছেন মার্কিন পররাষ্ট্র অধিদফতরের কাউন্সিলর ও রাষ্ট্রদূত থমাস শ্যানন, যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বিসওয়াল ও দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী মনপ্রীত সিং আনন্দÑ এই তিন সদস্যের মার্কিন প্রতিনিধি দল। এই তিন সদস্যের প্রতিনিধি দলটি বাংলাদেশের সন্ত্রাস দমন, নিরাপত্তা বৃদ্ধি, বাণিজ্য ও উন্নয়নের বিষয়ে বিভিন্ন পর্যায়ের পদস্থ ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলবেন।

বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থার রেকর্ড থেকে জানা যায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্য সানলাইট ফাউন্ডেশন নামে একটি প্রতিষ্ঠান বলেছে, রিপাবলিকানদের মধ্যে শতকরা ৮৮ ভাগ এবং ডেমোক্রাটদের মধ্যে ১১ ভাগ সদস্যই এদের কাছ থেকে নিয়মিত অনুদান পেয়ে থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনসহ বিভিন্ন নির্বাচনে এরা মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ব্যয় করে থাকেন। এই গ্রুপটিই জনমত নিয়ন্ত্রণে রাখার কারণেই অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইন সংস্কার করা যাচ্ছে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পিউ গবেষণা কেন্দ্র এক জরিপে দেখেছে, বেশিরভাগই আমেরিকান অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের চেয়ে অস্ত্র রাখার অধিকারকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। একের পর এক বন্দুক সন্ত্রাসের পরেও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইন সংস্কারের ব্যাপারে উদ্যোগী হচ্ছে না মার্কিন কংগ্রেস। তারা এ ব্যাপারে অনেকটাই নীরব। অস্ত্র ব্যবসায়ীদের লবী এ ব্যাপারে যথেষ্ট শক্তিশালী ও ক্ষমতাবান। এই ব্যবসায়ীরা সকলেই আমেরিকার ‘ন্যাশনাল রাইফেল এ্যাসোসিয়েশনের’ (এনআরএ) সদস্য। ৪৫ লাখ সদস্য রয়েছে এই এ্যাসোসিয়েশনে। ওয়াশিংটনের এরাই হচ্ছে সবচেয়ে সুবিধাভোগী বিত্তশালী গ্রুপ।

মার্কিন বিশ্লেষক মার্ক শিল্ডস’র মতে, ১৯৬৮ সালের পর থেকে আমেরিকার সঙ্গে সংঘটিত যুদ্ধগুলোতে যা না মানুষ মারা গেছে, তার চেয়ে বেশি মানুষ মরেছে বন্দুক সন্ত্রাসের শিকার হয়ে। পরিসংখ্যান বলছে, পৃথিবীর অন্য সব দেশের তুলনায় আমেরিকায় বন্দুকের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পিউ রিসার্চ সেন্টার সার্ভে’র মতে, দেশটিতে ২৭০ মিলিয়ন থেকে ৩১০ মিলিয়ন অস্ত্র রয়েছে সাধারণের হাতে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৩১৮.৯ মিলিয়ন জনসংখ্যার প্রায় সবার কাছেই অস্ত্র রয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বিবিসির উত্তর আমেরিকার সম্পাদক জন সোপেলকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে বলেছেন, তার শাসনামলে মার্কিন অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইন সংস্কার না হওয়াটা সবচেয়ে বড় হতাশার ব্যাপার। অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইন সংস্কার না হওয়ায় রাগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করে বিভিন্ন সময়ে বক্তব্য দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা জানান, যখন মার্কিন নাগরিকদের হাতে হাতে বন্দুক পৌঁছে যাওয়ায় ভয়টা বেশি পাচ্ছে আমেরিকা তখন বাংলাদেশে বৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্সের সংখ্যা হাজার দশেকের মতো, যার বৈধ বা অবৈধ ব্যবহার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও অনেক কম। বিশ্বের একাংশ যার দিকে ‘যুদ্ধবাজ’ বলে আঙুল তোলে, যার রণ হুঙ্কারে কাঁপে গোটা বিশ্ব, সেই আমেরিকা এখন তার নাগরিকদের হাতে হাতে ঘোরাফেরা করা বন্দুকে কার্যত বিপর্যস্ত, সন্ত্রস্ত্র! ক্যালিফোর্নিয়ার ঘটনার পর সেই ভয়-ভীতি এতটাই তুঙ্গে পৌঁছেছে যে, মার্কিন দৈনিক দ্য নিউইয়র্ক টাইমস সম্পাদকীয় লিখেছে মার্কিন সংবিধানের ‘বন্দুক আইন’ সংশোধনের দাবিতে। ক্যালিফোর্নিয়ার ঘটনার পর বলা হয়েছে, এমন ঘটনা তো একটা-দুটো নয়। একের পর এক ঘটেই চলেছে। যার শিকার হতে হয়েছে ক্যালিফোর্নিয়া, কলোরাডো, ওরেগন, সাউথ ক্যারোলিনা, ভার্জিনিয়া, কানেক্টিকাটের মতো বহু মার্কিন শহরের নিরীহ নাগরিকদের। দেশের অস্ত্র প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলোর ওপরেই ভরসা রেখে চলেছেন আমেরিকা। কারণ, বিদেশে অস্ত্র রফতানি করে ওই মার্কিন অস্ত্র প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলোই দেশের রাজকোষ ভরায়। আর মার্কিন নাগরিকদের হাতে হাতে বিনা বাধায় বন্দুক পৌঁছে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেলে ওই মার্কিন অস্ত্র প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলোর ব্যবসা ধাক্কা খায়।