২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বীর মুক্তিযোদ্ধা আলী হোসেন জীবনযুদ্ধে ক্লান্ত শ্রান্ত

বীর মুক্তিযোদ্ধা আলী হোসেন জীবনযুদ্ধে ক্লান্ত শ্রান্ত

আরাফাত মুন্না ॥ আলী হোসেন। মাতৃভূমি রক্ষায় ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন মুক্তির সংগ্রামে। ’৭১-এ শক্ত হাতে রাইফেল চালিয়েছেন পাকিস্তানি হায়েনাদের বিরুদ্ধে। স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনলেও জীবন যুদ্ধে তিনি আজ বড্ড ক্লান্ত-শ্রান্ত। স্ত্রী ও তিন সন্তানের সংসারের ঘানি টানতে টানতে হতাশা ভর করেছে। ভুগছেন নানা ব্যাধিতে। জনকণ্ঠের কাছে আক্ষেপ করে মুক্তিযোদ্ধা আলী হোসেন জানালেন ভাল নেই তিনি। দেশ স্বাধীন হলে নিজের দেশে ভালভাবে বেঁচে থাকতে পারব। কিন্তু স্বাধীনতার এত কাল পর এসে চোখের জলে স্বপ্ন ভেসে গেছে।

রাজধানীর মুগদায় দুই রুমের ছোট বাসায় পরিবার নিয়ে ভাড়া থাকেন মুক্তিযোদ্ধা আলী হোসেন। মাসিক ৮ হাজার টাকা মুক্তিযোদ্ধা ভাতা আর মেয়ে টিউশনির টাকা দিয়েই চালাতে হয় সংসার। বাসা ভাড়া, ছেলে মেয়েদের পড়ালেখার খরচ চালাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন এই মুক্তিযোদ্ধা। সপ্তাহে ৬শ’ থেকে ৮শ’ টাকার ওষুধ লাগে নিজেরও। এক প্রকার দুরবস্থাই চলছে এই মুক্তিযোদ্ধার।

মুক্তিযোদ্ধা আলী হোসেন জানান, তিনি যুদ্ধ করেছেন ৯ নম্বর সেক্টরে মেজর জিয়াউদ্দিন জিয়ার অধীনে। পুরো যুদ্ধের সময়ে সম্মুখযুদ্ধেও অংশ নিয়েছেন। যুদ্ধের স্মৃতি বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের মে মাসের পরবর্তী কোন একটা সময়ে সন্ধ্যার পর হঠাৎ ক্যাম্পে খবর এলো স্মরণ খোলা থানা পাকিস্তানী সেনাবাহিনী দখল করে নিয়েছে। তখন আমাদের ক্যাম্প কমান্ডার আলাউদ্দিন ভাই সকলকে আদেশ দিলেন প্রস্তুত হতে। আমরা ক্যাম্প কমান্ডারের নির্দেশে স্মরণখোলা থানা চারদিক থেকে ঘিরে ফেলি। আলাউদ্দিন ভাই প্রথমে এলএমজি দিয়ে ফায়ারিং শুরু করেন। পরে আমরাও চারদিক থেকে গুলি চালাতে থাকি। আমার হাতে ওই সময় থ্রি নট থ্রি রাইফেল ছিল। তিনি বলেন, প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ মিনিট পর পাকিস্তানী আর্মি পালাতে থাকে। আমরাও আস্তে আস্তে থানার ভিতরে প্রবেশ করি। এই যুদ্ধে ক্যাম্প কমান্ডার আলাউদ্দিন ও আহাদ শহীদ হয়। পরে আমরা থানার ভিতরে গিয়ে ১৫ থেকে ২০ পাক আর্মির লাশ পাই। এরপর সুন্দরবন, আমরাগাছি, দক্ষিণ রাজপুরসহ বিভিন্ন স্থানে দায়িত্ব পালন করেছি। বাঙ্কারে থেকেছি অনেক দিন।

যুদ্ধে কেন গেলেন, এমন প্রশ্নের জবাবে এই মুক্তিযোদ্ধা বলেন, ওই সময় (১৯৭১) আমি আমার গ্রামের বাড়িতে (বরগুনা জেলার পাথরঘাটা উপজেলার মাদারতলি গ্রাম) কৃষি কাজ করতাম। বঙ্গবন্ধুর সাত মার্চের ভাষণের পর থেকে রক্ত টগবগ করতে থাকে। ওই সময় থেকেই সিদ্ধান্ত নেই দেশ স্বাধীন করতে প্রয়োজনে জীবন দেব। ২৬ মার্চের পর থেকেই বড় ভাইরা মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করতে থাকে। আমি ওই যুদ্ধে যোগ দেই। পরে সুন্দরবনে ট্রেনিং করে সরাসরি যুদ্ধে যোগদান করি। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর ডাকে যুদ্ধে গিয়েছি, মাতৃভূমিকে মুক্ত করতে।

নিজের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে মুক্তিযোদ্ধা মোঃ আলী হোসেন বলেন, ১৯৮৫-৮৬ সালে বিয়ে করার পর চার সন্তান হয়। দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। প্রথমে ছেলে, তারপর দুই মেয়ে এবং সব শেষে ছেলে। আমার বড় সন্তান ব্রেইন স্টোক করে মারা গেছে। অর্থের অভাবে তার চিকিৎসাও ঠিক করে করতে পারিনি। বড় মেয়ে বিয়ে দিয়েছি। ওই ঘরে নাতি-নাতনিও আছে। এখন ঘরে এক মেয়ে, এক ছেলে, স্ত্রী এবং আমি। তিনি বলেন, মেয়েটা অনার্সে পড়ে। ছেলেটাও কলেজে পড়ে। এদের পড়ালেখার খরচ চালিয়ে ঘর ভাড়া দিয়ে খাওয়ার জন্য তেমন টাকা থাকে না। তিনি আরও বলেন, আমি ছোট একটা ব্যবসা করতাম। এখন শারীরিক অসুস্থতার কারণে সেই ব্যবসাটাও আর করতে পারি না। মেয়েটা দুইটা টিউশনি করে। সেই টাকা আর আমার মুক্তিযোদ্ধা ভাতা দিয়ে সংসার চালাতে চায়।

এত কষ্ট করে কেন ঢাকা আছেন, গ্রামে কেন ফিরে যান না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গ্রামে যাওয়ারও কোন পথ নেই। গ্রামের বাড়িতে যেটুকু জমিজমা ছিল, তার সবই নদীতে ভেঙ্গে গেছে। এখন গ্রামে একটা ঘর তুলে থাকার মতোও জায়গা নেই। গ্রামের বাড়িতে থাকতে পারলেও হয়ত একটু ভালভাবে থাকতে পারতাম। তারও কোন উপায় নেই।

তিনি আরও বলেন, দেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছিলাম। দেশ স্বাধীন হলে নিজের দেশে ভালভাবে বেঁচে থাকতে পারব, এটাই ভেবেছিলাম। কিন্তু এখন বেঁচে থাকাই কষ্ট হয়ে গেছে। তিনি বলেন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সঙ্গে একবার দেখা করতে চাই। দেখা করার জন্য একাধিকবার চেষ্টাও করেছিলাম। দেখা করতে পারিনি। এখন জাতির জনকের কন্যার সঙ্গে দেখা করে নিজের সমস্যা জানাতে পারলে তিনিই হয়ত একটা ব্যবস্থা করে দিবেন, এটাই আশা।

নির্বাচিত সংবাদ