২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

এভাবে চলতে পারে না

অসহিষ্ণুতার মাত্রা দিন দিন বাড়তে থাকলে বিপত্তি দেখা দেবেই সমাজে, রাষ্ট্রে। দেশের মানুষ একদিকে আতঙ্কগ্রস্ত, অপরদিকে নির্মম হয়ে ওঠার পরিপ্রেক্ষিতে বিনষ্ট হবে শান্তি। মধ্যযুগীয় বর্বরতার নিদর্শন যদি এই একুশ শতকে প্রত্যক্ষ করতে হয়, তবে তো সুস্পষ্ট যে, মানুষ হাঁটছে সভ্যতার বিপরীতে, বিশেষত এই বাংলাদেশে। নিয়ম-নীতি, আইন কানুন মেনে চলাই যেখানে সভ্যতার মূল মাধ্যম, তা ভুলে গিয়ে আইনকে নিজের হাতে তুলে নেয়া কিংবা উপাসনালয়ে বোমাবাজি এবং ধর্মপালনকারীদের ওপর হামলা, গুলির ব্যবহার সভ্য সমাজের কাজ নয়। বরং সমাজকে অস্থির করে তুলতেই তা সহায়ক। এই চরম চিত্র শুধু দুঃখজনক, বেদনাদায়কই নয়, বরং তা আতঙ্ক এবং ভয়াবহ অশনিসঙ্কেত বলা যায়। মানুষের এই ক্রোধ, প্রতিহিংসাপরায়ণতা, আইন হাতে তুলে নেয়ার প্রবণতা অসহনীয়। যদিও এর নেপথ্যে কিছু কার্যকারণ অবশ্যই রয়েছে। মানুষ যখন বুঝতে পারে, খুনখারাবি বা অপরাধ করলে অনায়াসে পার পাওয়া যায়, বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয় না, দাঁড়ালেও দুর্বল চার্জশীটের কারণে মামলাও হয়ে পড়ে দুর্বল এবং বেকসুর খালাসের পথ সামনে এসে দাঁড়ায়, তখন অপরাধকেই সুকর্ম মনে করতে বাধ্য। সত্য ও ন্যায়ের পথ তখন দূরঅস্ত যেন। এক ধরনের হতাশা থেকেও মানুষ জড়িয়ে পড়ে অপরাধে। এই যে আড়াইহাজার উপজেলার পুরিন্দা বাজারে গণপিটুনিতে ডাকাত সন্দেহে আটজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হলো, তা অত্যন্ত মর্মান্তিক। গণপিটুনিতে মৃত্যু ঘটানো এক ধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-। এমনতর ঘটনা যে এই একটাই ঘটেছে তা নয়। দেশের আনাচে কানাচেও পিটিয়ে হত্যার প্রবণতা বাড়ছে। শিশুদের ক্ষেত্রে এটা বেশি। অবলীলায় পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে সিলেটের রাজনসহ অন্যত্রও। প্রতিনিয়ত এ ধরনের হত্যাকা-ের কারণ হিসেবে বলা যায়, প্রতিহিংসা, ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল, আর্থিক লেনদেন, পূর্ব শত্রুতা, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এবং থানা পুলিশ তথা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর গাফিলতি। শেষেরটির প্রকোপে আড়াইহাজার থানার মানুষ আইন হাতে তুলে নিয়েছে বলা যায়। দু’মাস আগেও পুরিন্দা বাজারে ডাকাতি হলেও তার কোন সুরাহা করা হয়নি। বাজারের নিরাপত্তার ব্যবস্থাও নেয়া হয়নি। সে কারণে মানুষ নিজেরাই প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে উঠেছে। আবার ময়মনসিংহের ত্রিশালে গাছের ডাল কাটাকে কেন্দ্র করে এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তুচ্ছ ঘটনায় জীবন হরণ ভয়াবহ বৈকি। এক হিসেবে দেখা গেছে, গত ৫ বছরে ৬১৯ জন গণপিটুনিতে মারা গেছে। গত বছর ১০৫ জন আর চলতি বছরে এ পর্যন্ত ১২৩ জন গণপিটুনিতে মারা গেছে। এই যে, মানুষ হত্যা করে মানুষকে অহেতুক কারণে- তা সভ্য সমাজের পরিচায়ক নয়। গণপিটুনিতে গড়ে ১৮২ জন নিহত হওয়ার মধ্যে স্পষ্ট হয় সমাজের অবনতি। মানুষের মধ্যে বর্বরতার ঘাঁটি গড়ে ওঠার চিহ্ন। আইন হাতে তুলে নেয়ার প্রবণতা রোধ করার জন্য যেন কেউ কোথাও নেই। আইন হাতে তুলে নেয়ার মতো অসভ্য সংস্কৃতির জন্য রাষ্ট্রের সুশাসনের দুর্বলতার প্রমাণ যেমন মিলছে, তেমনি মানবসভ্যতায় অমানুষ পশুদের পদচারণা বেড়েই চলছে। রাষ্ট্রের সুশাসন ধ্বংসের বহুবিদ কারণ থাকতে পারে। অপরাধ দমন যাদের কাজ, তারা যদি থাকে নিষ্ক্রিয়, কর্মে নিরুৎসাহী তবে অপরাধের মাত্রা বাড়তে থাকে। আর তা বাড়ছে বলেই বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের উপাসনালয়ে বোমাবাজি, গুলিবর্ষণ, হত্যা বাড়ছে। এমনকি বাসায় ঢুকে গুলি ও কুপিয়ে জখম করার ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনা দেশকে অস্থিতিশীল করার নামান্তর। দেশবাসী দেখেছে, অবরোধের নামে পেট্রোলবোমা মেরে দেড় শতাধিক জীবন্ত মানুষকে হত্যার বিচার হয় না। অপরাধীরা বক্তৃতা দিয়ে বেড়ায়, তখন হতাশা থেকে মানুষ আইন হাতে তুলে নেয়। সুতরাং আইনকে কার্যকর ও গতিশীল করে অপরাধ দমনের পাশাপাশি আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়াই হবে বাস্তবসম্মত। কারণ, দেশ এভাবে চলতে পারে না।