১১ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

১০ লাখ শিক্ষার্থীর ব্যাংক হিসাবে ৮শ’ কোটি টাকা

রহিম শেখ ॥ সঞ্চয়ের মনোভাব নিয়ে বড়দের সঙ্গে স্কুলের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরাও ব্যাংকিং সেবার আওতায় আসছে। তাই সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ‘স্কুল ব্যাংকিং’ কার্যক্রম। মাত্র পাঁচ বছরে খুদে সঞ্চয়ীদের ব্যাংকে জমা পড়েছে প্রায় ৯শ’ কোটি টাকা। স্কুল ব্যাংকিং যাত্রা শুরুর প্রথম বছরে ২৯ হাজার ৮০ শিক্ষার্থী ব্যাংক এ্যাকাউন্ট খোলে। বর্তমানে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০ লাখ। শিশুদের আর্থিক সেবায় অন্তর্ভুক্তকরণ এবং স্কুল ব্যাংকিংয়ে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সম্প্রতি চাইল্ড এ্যান্ড ইউথ ফিন্যান্স ইন্টারন্যাশনাল (সিওয়াইএফআই) কর্তৃক প্রদত্ত ‘চাইল্ড এ্যান্ড ইউথ ফিন্যান্স ইন্টারন্যাশনাল কান্ট্রি এ্যাওয়ার্ড ২০১৫’ অর্জন করেছে বাংলাদেশ। এ পুরস্কার প্রাপ্তিতে বাংলাদেশ পেছনে ফেলেছে ভারত ও ফিজিকে।

জানা গেছে, ২০১০ সালের নবেম্বরে বাংলাদেশ ব্যাংক স্কুল ব্যাংকিংয়ের জন্য নিয়মাবলী জানিয়ে একটি সার্কুলার জারি করেছিল। উদ্দেশ্য ছিল সঞ্চয়ের মাধ্যমে স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের অর্থনৈতিক কর্মকা-ে অংশ নেয়ার সুযোগ তৈরি করে দেয়া। এর পরের চার বছরে এর বিস্তৃতি রীতিমতো বিস্ময়কর। কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্কুল ছাত্রছাত্রীদের হিসাব খুলতে একটা নীতিমালাও তৈরি করে দেয়। শুরুতে ১০ টাকা দিয়ে হিসাব খোলা হলেও পরে এ হিসাব খুলতে ১০০ টাকা জমা রাখতে বলা হয়। এসব হিসাব সাধারণ চলতি হিসাবেও রূপান্তরের সুযোগ আছে। কোন কোন ব্যাংক আলাদা কাউন্টার বা ডেস্ক খুলে ছাত্রছাত্রীদের জন্য এখন এ সেবা দিচ্ছে। এমনকি ব্যাংকগুলো কোন এক নির্ধারিত দিনে স্কুলে গিয়েও শিক্ষার্থীদের হিসাব খুলে দিচ্ছে। স্কুল ব্যাংকিংয়ে উদ্বুদ্ধ করার জন্য ক্যাম্পেন করেছে রাজধানীর বেশকিছু স্কুল ও বেসরকারী ব্যাংক। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে বেশ কয়েকটি বিভাগীয় শহরে স্কুল ব্যাংকিং সেমিনার ও ব্যাংক হিসাব খোলার মেলা আয়োজন করা হয়।

শিশুদের আর্থিক সেবায় অন্তর্ভুক্তকরণ এবং স্কুল ব্যাংকিংয়ে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সম্প্রতি চাইল্ড এ্যান্ড ইউথ ফিন্যান্স ইন্টারন্যাশনাল (সিওয়াইএফআই) কর্তৃক প্রদত্ত ‘চাইল্ড এ্যান্ড ইউথ ফিন্যান্স ইন্টারন্যাশনাল কান্ট্রি এ্যাওয়ার্ড ২০১৫’ অর্জন করেছে বাংলাদেশ। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের মধ্যে বাংলাদেশকে এ পুরস্কার প্রদান করা হয়। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের গবর্নর ড. আতিউর রহমান বলেন, এটি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আরেকটি মাইলফলক অর্জন, যা বাংলাদেশকে ‘আর্থিক অন্তর্ভুক্তির রোল মডেল’ হিসেবে পরিচিত করবে। তিনি আরও বলেন, এ পুরস্কার আমাদের উন্নয়নমুখী কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং ধারণায় নতুন দিগন্তের উন্মোচন করবে এবং প্রধানমন্ত্রীর রূপকল্পে যেমনটি উল্লেখ করা আছে সেই ধারার ব্যাপকভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও দারিদ্র্যমুক্ত সমাজ গড়ার পথে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। শিশুদের এ আমানত বিনিয়োগে এসে দেশের অর্থনীতিতেও অবদান রাখছে বলে মন্তব্য করেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান। শিশুদের কেবল আত্মনির্ভর করা বা ব্যাংক ও আর্থিক সেবার সঙ্গে তাদের পরিচিত করানো নয়, স্কুল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

জানা যায়, দেশের মোট জনসংখ্যার বড় একটা অংশ স্কুলশিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তুলতেই স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। স্কুল ব্যাংকিং বা স্টুডেন্ট ব্যাংকিংয়ের আওতায় ‘ইয়ং স্টার’ ‘ফিউচার স্টার’... ইত্যাদি উদ্দীপনাসূচক নামে ব্যাংকগুলো চালু করে আকর্ষণীয় স্কিম। অত্যন্ত সহজ শর্তে ওপেন করা শুরু হয় শিক্ষার্থীদের নিজের নামে ব্যাংক এ্যাকাউন্ট। এই স্কিমের আওতায় যে কোন শিক্ষার্থী এক কপি ছবি, স্কুলের আইডি কার্ড ও নামমাত্র টাকা দিয়ে যে কোন ব্যাংকের যে কোন শাখায় ওপেন করতে পারে সেভিংস ব্যাংক এ্যাকাউন্ট বা সঞ্চয়ী হিসাব। ছয় থেকে ১৮ বছরের কম বয়সী শিক্ষার্থীরা স্কুল ব্যাংকিং হিসাব খুলতে পারবে। ছাত্রছাত্রীর পক্ষে পিতা-মাতা বা আইনগত অভিভাবক হিসাবটি পরিচালনা করবেন। সাধারণ হিসাব খুলতে যেমন বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পাঠানো ফরম রয়েছে, সঙ্গে আছে একটি গ্রাহক পরিচিতি (কেওয়াইসি) ফরম। সেগুলো পূরণ করতে হবে। ছাত্রছাত্রীদের জন্ম নিবন্ধন সনদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচয়পত্র জমা দিতে হবে। স্কুলশিক্ষার্থীদের এসব হিসাবে যে কেউ টাকা জমা রাখতে পারে। কিন্তু টাকা তুলতে পারবে নমিনি হিসেবে থাকা বাবা অথবা মা। তবে স্বয়ংক্রিয় (অটোমেটেট টেলার মেশিন) লেনদেনের জন্য এটিএম কার্ডও নিতে পারে শিক্ষার্থী। তার জন্য অবশ্য নির্ধারিত পরিমাণ অর্থ সঞ্চয় রাখতে হবে শিক্ষার্থীকে। আর ১৮ বছর বয়স হলে সব শিক্ষার্থীই টাকা তুলতে পারবে। হিসাবগুলোয় সরকারী ফি ছাড়া অন্য কোন সেবা মাসুল ব্যাংকগুলো নেয় না। স্কুল ব্যাংকিংয়ে রয়েছে নানা সুবিধা।

স্কুলশিক্ষার্থীদের হিসাব থেকে বেতন-ফি পরিশোধও হচ্ছে। যেসব ব্যাংকে ইন্টারনেট ব্যাংকিং আছে, অভিভাবকেরা সেসব ব্যাংকে অনলাইনেই এসব হিসাব থেকে বেতন-ফি পরিশোধ করতে পারছেন। এটিএম কার্ডেও এটা পরিশোধ করা যাচ্ছে। ফলে দীর্ঘসারিতে দাঁড়িয়ে অভিভাবকদের স্কুলে বেতন-ফি দিতে হচ্ছে না। এ প্রসঙ্গে সোস্যাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ শফিকুর রহমান জনকণ্ঠকে বলেন, শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের ভবিষ্যত। তাই তাদের ব্যাংক হিসাব খোলাকে মূল ব্যাংকিং কার্যক্রম বলে মনে করা হচ্ছে। এজন্য স্কুল ব্যাংকিং হিসাব খোলাকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা যায়, বর্তমানে খুদে শিক্ষার্থীদের হিসাবের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০ লাখ। জুন শেষে এ সংখ্যা ছিল ৮ লাখ ৫২ হাজার । গত বছরের ডিসেম্বর শেষে এই সংখ্যা ছিল ৭ লাখ ৯৭ হাজার। চলতি বছরের সেপ্টম্বর শেষে খুদে সঞ্চয়ীদের ব্যাংকে জমা পড়েছে প্রায় ৮শ’ কোটি টাকা। চলতি বছরের জুন শেষে খুদে সঞ্চয়ীদের ব্যাংকে জমা পড়েছে প্রায় ৮শ’ কোটি টাকা। মার্চ পর্যন্ত খুদে সঞ্চয়ীদের ব্যাংকে জমা ছিল ৭৫৬ কোটি টাকা। গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত এসব হিসাবে জমা ছিল ৭১৭ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। এদিকে বেসরকারী ব্যাংকগুলোতে স্কুল ব্যাংকিং হিসাব খোলা ও জমার পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। স্কুল ব্যাংকিং হিসাব খুলতে নতুন ব্যাংকগুলোও এখন এগিয়ে আসছে। কেবল শহরে নয়, গ্রামেও স্কুল ব্যাংকিং জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বর শেষে গ্রামাঞ্চলের তুলনায় শহর এলাকায় বেশি হিসাব খোলা হয়েছে।