২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

‘পাক্কা শিকারি রনি’

‘পাক্কা শিকারি রনি’

মোঃ মামুন রশীদ ॥ আচমকা কোন আগমন নয়, হঠাৎ আবির্ভাবও ঘটেনি। অনেক পরীক্ষা দিয়েই নিজেকে চেনাতে শুরু করেছেন তরুণ পেসার আবু হায়দার রনি। তার জন্য সৌভাগ্যই বলতে হবে, কারণ মাশরাফি বিন মর্তুজার মতো এক অধিনায়ক পেয়েছেন। চলতি বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগে (বিপিএল) রনির জ্বলে ওঠার পেছনে কি বাংলাদেশের সবচেয়ে সম্মান ও মর্যাদা পাওয়া ক্রিকেটার মাশরাফির অবদানটাকেও ছোট করলে চলবে না। আর সে জন্যই একের পর এক বিস্ময়ের জন্ম দিয়েই চলেছেন তরুণ উদীয়মান এ বাঁহাতি পেসার। শনিবার কোয়ালিফায়ার ম্যাচেও রনির ‘ফায়ার’ অর্থাৎ আগুন দেখা গেল। বয়সভিত্তিক ক্রিকেটগুলো খেলে নিজেকে প্রমাণের পর এবার আন্তর্জাতিক পর্যায়ের নামীদামী তারকাদের বিরুদ্ধে বল করছেন। রংপুর রাইডার্সের বিরুদ্ধে আবারও আগুন ঝরিয়েছেন, নিয়েছেন ২৮ রানে ৪ উইকেট। ফলে চলতি আসরে এখন সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন উইকেট শিকারের দিক থেকে তিনি। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের হয়ে ১১ ম্যাচে মাত্র ১৯ বছর বয়সী নেত্রকোনার পেসারের সংগ্রহে এখন ২১ উইকেট। ইতোমধ্যেই সবাই বলতে শুরু করেছেন রনি হচ্ছেন ‘নেত্রকোনা এক্সপ্রেস!’

বিপিএলের আগে পর্যন্ত তরুণ বাঁহাতি পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে নিয়েই বুঁদ ছিলেন দেশের ক্রিকেট অনুরাগীরা। তরুণ এ পেসার ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেও বিস্ময় ছড়িয়েছেন, নাম কামিয়েছেন ‘সাতক্ষীরা এক্সপ্রেস’ হিসেবে। তবে মুস্তাফিজের যেন হঠাৎই আবির্ভাব ঘটেছিল। রনির ক্ষেত্রে বিষয়টা এমন নয়। তাহলে এ বাঁহাতি পেসার এতদিন কোথায় ছিলেন? নেত্রকোনার আঞ্জুমান আইডিয়াল সরকারী বালক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় ২০০৭ সালেই ক্রিকেট খেলা শুরু করেছিলেন। তখন সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র রনি। স্কুল টুর্নামেন্টগুলোয় ভাল করার পর নেত্রকোনার অনুর্ধ-১৪, ১৫ দলের হয়ে খেলেছেন এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ অনুর্ধ-১৭ ও ১৯ দলে খেলার সুযোগ পেয়ে যান ভাল বোলিংয়ের জন্য। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) বয়সভিত্তিক দলগুলোর অন্যতম নির্ভরযোগ্য পেসার হিসেবেই খেলেছেন রনি। বাংলাদেশ অনুর্ধ-১৭, অনুর্ধ-১৯ দলে খেলেছেন। ২০১২ সালের জুনে এসিসি অনর্ধ-১৯ টুর্নামেন্টে কাতারের বিপক্ষে নিজের গতির ঝড়ে যে আগুন আছে সেটাও ছড়িয়ে দিয়ে সব ছারখার করে দিয়েছিলেন। সে ম্যাচে ১৩৫ বলে ২০৯ রান করেছিলেন সৌম্য সরকার এবং ওই ম্যাচেই ৫.৪ ওভার বোলিং করে ১০ রানে ৯ উইকেট নিয়েছিলেন ১৬ বছর বয়সী রনি। পরের বছর একই টুর্নামেন্টে মালয়েশিয়ার বিপক্ষে বোলিং ফিগার ছিল ৮-৪-৮-৫! গত যুব বিশ্বকাপেও খেলেছেন দলের অপরিহার্য সদস্য হিসেবে। বয়সভিত্তিক ক্রিকেটের দিকে যাদের নজর ছিল তারা রনি, রনি নামটা জপতে শুরু করেছিলেন। তাছাড়া গত প্রিমিয়ার ডিভিশন ক্রিকেট লীগে প্রথমবার খেলেই ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিংয়ের হয়ে ১১ ম্যাচে নিয়েছেন ১৭ উইকেট। এমন ভয়ঙ্কর বোলারই তো চাই বাংলাদেশ দলে। কারণ দীর্ঘদিন জাতীয় দলে বাঁহাতি পেসারের অভাব। সেই ঘাটতি পুষিয়ে দিয়েছিলেন মুস্তাফিজ! ওয়ানডে অভিষেক সিরিজেই বিশ্বরেকর্ড গড়ে। তিনি ইতোমধ্যেই পুরো বিশ্ব ক্রিকেটেই ভয়ঙ্কর ‘কাটারের’ জন্য গবেষণার বিষয় হয়ে গেছেন। রনিও দেখিয়েছেন ‘কাটার’ দেয়াতে পারদর্শিতা আছে তার।

বিপিএলের আগে কোন টি২০ ক্রিকেট খেলার অভিজ্ঞতা নেই রনির। এবারের আসরে উদ্বোধনী দিনেই ঢাকা ডায়নামাইটসের বিরুদ্ধে দুর্দান্ত বোলিং করেন অভিষেক টি২০ ক্রিকেটে। ৪ ওভারে মাত্র ১৭ রান দিয়ে ২ উইকেট, যার প্রথম উইকেটটাই কিংবদন্তি শ্রীলঙ্কান ব্যাটসম্যান কুমার সাঙ্গাকারার! উদ্ভাসিত এক সূচনাই বলা চলে। এরপরও রনির দিকে নজর ছিল না কারও। কিন্তু মাশরাফিই তাকে লাইমলাইটে এনেছেন। ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে রনির মতো তরুণ বোলারের ওপর আস্থা রেখে তার হাতে বল তুলে দিয়ে। অধিনায়কের আস্থার প্রতিদানও দিয়েছেন রনি। সিলেট সুপার স্টারসের বিরুদ্ধে ২৮ রান দিয়ে ৪ উইকেট নিয়ে ধসিয়ে দিয়েছিলেন। এরপর নিয়মিতই উইকেট নিয়েছেন। শেষ ওভারে যখন টানটান উত্তেজনা, জয়-পরাজয়ের সিদ্ধান্ত হবে তখনও অন্য বিদেশী বোলারদের ভিড়েও বল করতে এসেছেন রনি। সবসময়ই দারুণ আত্মবিশ্বাস নিয়েই বোলিং করেছেন এ তরুণ বাঁহাতি। একের পর এক বিস্ময় ছড়িয়ে গেছেন।

শনিবার গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ মাশরাফির দলের। রংপুর রাইডার্সের বিরুদ্ধে জিতলেই দুঃশ্চিন্তার সমাপ্তি, সরাসরি ফাইনালে সবার আগে। এ ম্যাচেও রনির আগুন বোলিংয়ের সামনে জ্বলে-পুড়ে খাক হলো রাইডার্সের ব্যাটিং লাইন-আপ। একাই ৪টি উইকেট শিকার করলেন আবার। এবার আগের চেয়েও ভয়ঙ্কর ছিলেন। ৩ ওভারে মাত্র ১৯ রান দিয়েই নিয়েছেন ৪ উইকেট। টি২০ ক্রিকেটে ক্যারিয়ারসেরা। এবার তিনি ফিরিয়েছেন সৌম্য সরকার, লেন্ডল সিমন্স, থিসারা পেরেরা ও আরাফাত সানিকে। চলতি বিপিএলে রনির মোট শিকার সংখ্যা মাত্র ১৩.৩৮ গড়ে ২১ উইকেট। সবার ওপরে এখন অবস্থান তার। ১৭ উইকেট করে নিয়ে যৌথভাবে দুইয়ে আছেন সাকিব আল হাসান ও থিসারা পেরেরা। অথচ বিপিএল শুরুর এক মাস আগেও রনি বলেছিলেন, ‘ভাল প্রস্তুতি আছে কারণ হাই পারফর্মেন্স ক্যাম্পে কাটিয়েছি। আমার লক্ষ্য থাকবে একাদশে জায়গা করে নেয়া।’ বলটা ছোড়ার সময় একটু দ্রুতই ছেড়ে দেন রনি। তার বোলিং এ্যাকশন বিশ্লেষণ করে অনেকে তার মধ্যে ভারতীয় পেসারদ্বয় জহির খান ও আশীষ নেহরার সংমিশ্রণও দেখছেন। বোলিং করার অন্যতম কৌশলের মধ্যে আছে প্রচুর পরিমাণে ইনসুইঙ্গার দেয়া। আর বিপিএলে দেখা গেছে খুব ভাল ইয়র্কার ও স্লোয়ার দিতে সক্ষম তিনি। তার দলেই আছেন লঙ্কান পেসার নুয়ান কুলাসেকারা ও মাশরাফি। নিজের বোলিংয়ের উন্নতি করতে নিয়মিতই এ দুই তারকার সঙ্গে আলোচনা করেন রনি। এবার আরও এগিয়ে যাওয়ার পালা রনির।