১১ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ক্যাম্পাস জীবন...

নিজে রসায়নবিদ বলে একরকম জোর করেই মেয়েকে রসায়নে ভর্তি করেছেন বাবা। অথচ মেয়ে নুসরাতের পছন্দের বিষয় ছিল স্থাপত্যবিদ্যা। তিনি এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২য় বর্ষের ছাত্রী। নিজের পছন্দ জলাঞ্জলি দিতে হয়েছে বাবার পছন্দের কাছে। তবে এখন আর মনে তেমন দুঃখ নেই। ক্লাস শেষেই বন্ধুদের সঙ্গে মিশে যাচ্ছেন আড্ডায়। কখনও বা মেতে উঠছেন গানে। তুহিনের নাম ছড়িয়েছিল ডানপিটে হিসেবে। কোনরকমে স্কুলের ক্লাস শেষ করেই বন্ধুদের নিয়ে চলে যেতেন ফুটবল মাঠে। তিনি এখন পড়ছেন স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। মাস ঘুরতেই স্কুল শিক্ষক বাবার পাঠানো টাকায় সেমিস্টার ফি গুনতে হচ্ছে। শৈশবের তুমুল সেই দিনগুলোর কথা মনে করে এখন তার মন খুব খারাপ হলেও মুখের হাসি মলিন হয় না। লেখাপড়া শেষে মেতে ওঠেন বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায়। এক বন্ধু পড়ছেন বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় স্টামফোর্ডে। অন্যজন পড়ালেখা করছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়ায়। অন্যদের মতো ঈর্ষাকাতর নন তারা দু’জন। দিনা ও মিতুর বন্ধুত্বে কোন ফাটল ধরেনি। প্রতিদিনই নিয়ম করে পরস্পরের খোঁজ নিচ্ছেন। জন্মদিন বা যে কোন উপলক্ষেই হাজির বন্ধুর বাসায়। সহপাঠীর সঙ্গে প্রেম বেশিদিন টেকে নাÑ এ সত্য নির্মমভাবে ফলে গেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র নোমানের জীবনে। সহপাঠী ন্যান্সির সঙ্গে চুটিয়ে প্রেম করেছেন দুই বছর। হঠাৎ না জানিয়ে তাকে ছেড়ে প্রেয়সী চলে গেছে চিরকালের মতো। এ জীবনের কোন মানে নেই- এমন ভেবে প্রায়ই মন খারাপ হয় তার। দারুণ কষ্টের এ সময়ে বন্ধুরা ভালবাসার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন আপনজনের মতো। তাদের সঙ্গ পেয়ে নিজের একান্ত কষ্টও ভুলে থাকছেন নোমান। বিকেল হলে চলে যাচ্ছেন ধানম-ি লেকে। গিটারের টুং টাং শব্দে ভুলে যাচ্ছেন একান্ত কষ্ট। আর মাত্র এক সেমিস্টার। এরপরই ক্যাম্পাস লাইফের ইতি টানবেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিংয়ের হাসান। বন্ধুদের অনেকেই চাকরি জুটিয়ে ফেললেও সুবিধা করতে পারেননি তিনি। মামা-চাচার খুঁটির জোর নেই বলে আপাতত শিক্ষিত বেকারের দলেই নাম লিখিয়েছেন। এ-হাউস ও-হাউস ঘোরাঘুরি করে শুনছেন ‘কর্ম খালি নেই।’ তারপরও জাবির সবুজ চত্বরে প্রতি সন্ধ্যায় পা পড়া চাই-ই চাই। বন্ধুদের সঙ্গে বসে চায়ের কাপে গল্প জমিয়ে ভুলে যান জীবনের পাওয়া না পাওয়ার হিসাব। পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির কয়েকদিন পরই হলে সিট পেয়ে গেলেন মৎস্য বিজ্ঞান অনুষদের রাসেল। মালপত্র নিয়ে হলে ওঠার দিন থেকেই রাজনৈতিক দলের বড় ভাইদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হতে থাকল তার জীবন। প্রতিদিনই তার রুমমেটদের নানা রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে তালিম দেন বড় ভাইরা। একসময় হলই ছেড়ে দিতে হলো।

এবার নতুন ঠিকানা মেস। নতুন এই জীবনের গল্প শুনতে ঢুকতে হলো দুমকি বাজারে প্রেসক্লাবের মেসে। মেসের বাসিন্দা রাসেল বলেন, মেসের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, পচা-বাসি খাবার, স্যাঁতসেঁতে বাথরুম সব নিয়ে আমরা চরম অশান্তিতে আছি। তারপরও তুমুল বন্ধুত্ব, নিজেদের অবারিত মেলামেশা, আড্ডা ভাল রেখেছে আমাদের।’ হাতখরচের টাকা যোগাড়ের জন্য কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিস্ট্রি বিভাগের ছাত্র মিজবাহ উদ্দীন টিউশনি করাচ্ছেন। পরিবারের জন্য মন খারাপ হলে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ৩য় বর্ষের ছাত্রী নুসরাত জাহান লিজা তুলে নেন সেলফোন।

কান্না চেপে সুদূর ঝালকাঠি জেলায় থাকা কলেজ শিক্ষিকা মাকে শোনান আশার বাণী। হলের পচা-বাসি খাবারগুলো রুমমেটরা ভাগাভাগি করে খেয়ে নেন। খালেদা জিয়া হলের আবাসিক ছাত্রী ইংরেজী বিভাগের নাজিয়াতুল ইসলাম তনু জানালেন ‘হলের খাবার ভাল না লাগলে নিজেরাই রান্নার আয়োজন করি।’

তনু বাবার ওপর চাপ কমাতে ক্লাস শেষে ক্যাম্পাসে ও কুষ্টিয়া শহরে টিউশনি করাচ্ছেন নিয়মিত। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের আবদুল হাই ও মাইনুল বললেন ভাল থাকার নেপথ্যের গল্প, ‘ক্যাম্পাসে না এলে প্রিয় মানুষটির সঙ্গে দেখা হওয়ার ফুরসত নেই।’