২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আগামীকাল সাভার মুক্তদিবস

আগামীকাল সাভার মুক্তদিবস

নিজস্ব সংবাদদাতা, সাভার ॥ আগামীকাল সোমবার ১৪ ডিসেম্বর। সাভার মুক্ত দিবস। মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে নাস্তানাবুদ হয়ে পশ্চাদপসারণকারী হানাদার বাহিনীর সঙ্গে সাভার উপজেলার আশুলিয়া থানার জিরাব এলাকাার ঘোষবাগ-গঙ্গাবাগ গ্রামে নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুর নেতৃত্বাধীন মুক্তিযোদ্ধাদের এক গেরিলা গ্রুপের সম্মূখ যুদ্ধের মাধ্যমে সাভার হয়েছিল শত্রুমুক্ত। ওই যুদ্ধে গোলাম মোহাম্মদ দস্তগীর টিটু নামে এক অকুতোভয় অসীম সাহসী কিশোর শহীদ হন। তাঁর লাল রক্তে সাভারের লাল মাটি আরো লাল হয়ে সেদিন সাভার হয়েছিল শত্রুমুক্ত।

মানিকগঞ্জের উত্তর শেওতা গ্রামের তৎকালীন রাজনীতিবিদ ন্যাপ নেতা বাবা গোলাম মোস্তফার অনুপ্রেরণায় ২৭ মার্চ টিটু তার অন্য চার সহোদর ভাই জাহাঙ্গীর, আলমগীর, শাহগীর ও বন্দেগীরের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ করার সংকল্পে ভারত যায় প্রশিক্ষণ নিতে। টিটু তখন ১০ম শ্রেণীর ছাত্র। ভারতে প্রশিক্ষণ শেষে সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশারফের বাহিনীতে সে যুক্ত হয়। এরপর তাকে পাঠানো হয় ঢাকায় যুদ্ধে দায়িত্ব নিয়ে আসা ‘মানিক’ গ্রুপের সাথে। তখন সাভারের আশুলিয়ার তৈয়বপুর এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের একট ক্যাম্প ছিল। ওই ক্যাম্পে নাসিরউদ্দিন ইউসুফ, রাইসুল ইসলাম আসাদসহ বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা আসতেন। ঢাকা থেকে নৌকায় চড়ে তখন ওই এলাকায় আসতে হতো। ১৯৭১ সালের শেষের দিকে পাকবাহিনীর সদস্য এবং তাদের দোষররা মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে বিভিন্ন এলাকায় নাস্তানাবুদ হচ্ছিল। তাই তারা পিছু হটে ঢাকার দিকে ফিরছিল। এ সময় ঢাকা উত্তর গেরিলা ইউনিটের প্রধান শহীদ রেজাউল করিম মানিকের গেরিলা গ্রুপটির মূল দায়িত্ব ছিল ঢাকার উত্তরাঞ্চলের কোথাও সেতু উড়িয়ে দিয়ে, ব্যারিকেড দিয়ে অথবা রাস্তা কেঁটে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে শত্রুবাহিনীর যোগাযোগ বা চলাচলে বিঘœ ঘটানো। এমনই এক অভিযানে ধামরাইয়ের কালামপুরের অদূরে ডাউটিয়া সেতুটি ডিনামাইটের সাহায্যে ধ্বসিয়ে দেয়ার অপারেশনে গ্রুপ কমান্ডার মানিকসহ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা ১৩ নবেম্বর শহীদ হন। এরপর বাংলাদেশ শত্রুমুক্ত হওয়া পর্যন্ত গ্রুপটির কমান্ডার ছিলেন নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু।

নাসিরউদ্দিন ইউসুফের গেরিলা গ্রুপের সঙ্গে গোলাম মোহাম্মদ দস্তগীর টিটু ৮ ডিসেম্বর সাভার উপজেলার আশুলিয়া থানার ইয়ারপুর ইউনিয়নের তৈয়বপুর গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে এসে অবস্থান নেয়। ১৪ ডিসেম্বর সকালে পাক হানাদার বাহিনীর একটি দল টাঙ্গাইল থেকে বিতাড়িত হয়ে ঢাকার পথে জিরাব এলাকার ঘোষবাগ গ্রামে এসে পৌঁছলে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে সে খবর পৌঁছে যায়। শীতের সকালে সোজা পথে না গিয়ে বড় একটি জলাশয় সাঁতার কেটে পাড়ি দিয়ে শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ‘বাচ্চুর বিচ্ছু’ বাহিনী। শুরু হয় প্রচন্ড যুদ্ধ। এ সম্মূখ যুদ্ধে পাক সেনাদের কয়েকজন নিহত হয় এবং কয়েকজন পালিয়ে যেতে সমর্থ হয়। হাতের কাছে পেয়ে হানাদার বাহিনীর সকল সদস্যকে পিষে মারার সুযোগ হাত ছাড়া করতে চায় না কিশোর টিটু। সে ভুলে যায় গেরিলা যুদ্ধে আত্মরক্ষার সাধারণ সাবধানতাটুকু পর্যন্ত। শত্রু হত্যার সাফল্যে উচ্ছ্বসিত কিশোর টিটু সহযোদ্ধাদের নিষেধ উপেক্ষা করে গুলি করতে করতে সামনে এগিয়ে যেতে থাকে। হঠাৎ একঝাঁক তপ্ত বুলেটের আঘাত থামিয়ে দেয় কিশোর টিটুর প্রাণটিকে। মুহূর্ত্বে লুটিয়ে পড়ে টিটুর দেহ। মূমূর্ষ টিটুকে দ্রুত পার্শ্ববর্তী ডেইরি ফার্মে নিয়ে আসা হয়। কিন্তু সেখানে ক্ষত-বিক্ষত টিটুর দেহ থেকে রক্ত বন্ধ করার কোন ব্যবস্থা ছিল না। সাভারের লাল মাটিকে আরও লাল করে অসীম সাহসী প্রাণ টিটুর হৃদয়স্পন্দন ধীরে ধীরে সেখানে থেমে যায়। ততোক্ষণে সাভার হয় শত্রুমুক্ত। তারপর সাভার ডেইরি ফার্ম গেটের কাছে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের ধার ঘেঁষে সমাধিস্থ করা হয় টিটুর প্রাণহীন দেহটিকে।