২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বেপরোয়া ট্রাক কেড়ে নিল সাংবাদিক আব্দুল্লাহ আল ফারুকের প্রাণ

বেপরোয়া ট্রাক কেড়ে নিল সাংবাদিক আব্দুল্লাহ আল ফারুকের প্রাণ
  • সাংবাদিকদের বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ

স্টাফ রিপোর্টার ॥ রাজধানীতে ঘাতক ট্রাকের ধাক্কায় নিহত হয়েছেন সাংবাদিক আব্দুল্লাহ আল ফারুক (৫৩)। তিনি দৈনিক কালের কণ্ঠের সাবেক উপ-সম্পাদক ছিলেন। জাতীয় প্রেসক্লাব, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি ও মোহাম্মদপুর তাজমহল রোডের মসজিদে জানাজা শেষে রবিবার বিকেলে তার লাশ আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। এদিকে ট্রাকের ধাক্কায় আব্দুল্লাহ আল ফারুক নিহতের ঘটনায় সাংবাদিকরা বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। বিকেলে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ সমাবেশ করে সাংবাদিক নেতারা ঘাতক ট্রাক চালককে গ্রেফতার করে শাস্তি প্রদানের জন্য ৪৮ ঘণ্টার সময় দিয়েছেন। এই সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা নেয়া না হলে কঠোর আন্দোলনে কর্মসূচী দেয়ার ঘোষণাও দেয়া হয়েছে। তারা অদক্ষ চালক ও বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানোকেই সড়ক দুর্ঘটনার মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করে অবিলম্বে সরকারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানান।

নিহতের আত্মীয় দৈনিক অবজারভারের বিশেষ সংবাদদাতা শাহনাজ বেগম জানান, শনিবার রাত ১টার দিকে কাকরাইল রাজমনি সিনেমা হল সংলগ্ন রাস্তা পার হচ্ছিলেন সাংবাদিক আব্দুল্লাহ আল ফারুক। এ সময় বেপরোয়া গতির একটি ট্রাক তাকে ধাক্কা দিলে তিনি গুরুতর আহত হন। আহত অবস্থায় প্রায় এক ঘণ্টা রাস্তায় পড়ে থাকার পরে এক সিএনজি অটোরিকশা চালক তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। খবর পেয়ে স্বজন ও সহকর্মীরা তাকে সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রবিবার সকাল ৭টায় তার মৃত্যু হয়। এরপর তার লাশ মোহাম্মদপুর তাজমহল রোডে ৩০/১৯ নম্বর বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। যেখানে তিনি স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে বসবাস করতেন। এদিকে রমনা থানার উপ-পরিদর্শক সামসুদ্দিন সাংবাদিকদের জানান, দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ট্রাকটির সন্ধান তারা পাননি।

জানা যায়, রাজধানীতে সড়ক দুর্ঘটনায় গত পাঁচ বছরে প্রাণ হারিয়েছেন সাত সাংবাদিক। এ ছাড়া রাজধানীর বাইরে এ পাঁচ বছরে সাংবাদিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা মিশুক মুনীরসহ আরও অনেক সাংবাদিককে প্রাণ হারাতে হয়েছে। আব্দুল্লাহ আল ফারুকের আগে ২০১৪ সালের ২৯ নবেম্বর সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন প্রবীণ সাংবাদিক জগ্লুল আহ্মেদ চৌধূরী। ওইদিন রাত ৮টার দিকে রাজধানীর কাওরান বাজার এলাকায় বাস থেকে নামার সময় পেছনে থাকা বাসের ধাক্কায় ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান। ২০১২ সালের ১১ মে রাজধানীর ধানম-িতে বাসচাপায় নিহত হন ইংরেজী দৈনিক দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্টের সিনিয়র রিপোর্টার বিভাস চন্দ্র সাহা। একই দিন শাহবাগে বাসচাপায় নিহত হন বরিশালের আঞ্চলিক দৈনিক মতবাদের ফটোসাংবাদিক শহীদুজ্জামান টিটু। একই বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর নিউমার্কেটের সামনে ফুটওভার ব্রিজের কাছে বাসচাপায় দৈনিক প্রান্ত পত্রিকার স্টাফ রিপোর্টার ফখরুল হোসেন নিহত হন। আর ২০১২ সালের ৮ জানুয়ারি মেয়ে অথৈকে স্কুলে রেখে মোটরসাইকেলে করে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে যাওয়ার পথে গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়ে মারা যান দৈনিক আমাদের সময়ের সিনিয়র রিপোর্টার দীনেশ দাস। ২০১১ সালের ১৬ জুলাই রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিসিএস কম্পিউটার সিটির সামনে বাসের ধাক্কায় মারা যান সময় টেলিভিশনের যুগ্ম বার্তা সম্পাদক বেলাল হোসেন।

আব্দুল্লাহ আল ফারুকের মরদেহ মোহাম্মদপুরের বাসায় নিয়ে যাওয়ার পর স্ত্রী-সন্তানসহ আত্মীয়স্বজন ও দীর্ঘদিনের সহকর্মীরা কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। এ সময় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। পরে বেলা দেড়টার দিকে তার লাশ জানাজা ও সহকর্মীদের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য মোহাম্মদপুরের বাসা থেকে জাতীয় প্রেসক্লাবে নেয়া হয়। সেখানে তার লাশ দেখে সাংবাদিকরা কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। জাতীয় প্রেসক্লাবে প্রথম জানাজা শেষে তার কফিনে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন সাংবাদিক নেতারা।

জাতীয় প্রেসক্লাবে আব্দুল্লাহ আল ফারুকের জানাজায় অংশ নেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, দৈনিক সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ার, জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি মুহাম্মদ শফিকুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক কামরুল ইসলাম চৌধুরী, সাংবাদিক নেতা আবেদ খান, আবুল কালাম আজাদ, মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল, আলতাফ মাহমুদ, ওমর ফারুক, সৈয়দ আবদাল আহমেদ ও কুদ্দুস আফ্রাদ।

জাতীয় প্রেসক্লাবে জানাজা শেষে বেলা সোয়া ২টায় আব্দুল্লাহ আল ফারুকের কফিন তার প্রিয় সংগঠন ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) চত্বরে নেয়া হয়। সেখানে আগে থেকে উপস্থিত কয়েক শ’ সাংবাদিক আব্দুল্লাহ আল ফারুকের কফিন দেখার পর কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। বিশেষ করে মরহুমের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ডিআরইউর সাবেক সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন বাদশার আবেগঘন বক্তব্যের সময় কেউ চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। কফিনের সামনে দাঁড়িয়ে আরও বক্তব্য রাখেন ডিআরইউর সাবেক সভাপতি মাহফুজুর রহমান, শাহেদ চৌধুরী, বর্তমান সভাপতি জামাল উদ্দীন ও সাধারণ সম্পাদক রাজু আহমেদ। এই সাংবাদিক নেতারা ছাড়াও বেলা পৌনে ৩টার দিকে ডিআরইউ চত্ব¡রে আব্দুল্লাহ আল ফারুকের দ্বিতীয় জানাজায় অন্যদের মধ্যে অংশ নেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক মহাসচিব আব্দুল জলিল ভুইয়া, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি আব্দুস শহীদ, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মুহিতুল ইসলাম রাজু, সাজ্জাদ আলম খান তপু, ক্রাইম রিপোর্টার্স এ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ইশারফ হোসেন ইশা, সাবেক সভাপতি আক্তারুজ্জামান লাবলু, পারভেজ খান প্রমুখ। উল্লেখ্য, আব্দুল্লাহ আল ফারুক নিয়মিত ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে যেতেন। দুর্ঘটনার দিন বিকেল থেকে রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত তিনি সেখানে ছিলেন।

দ্বিতীয় জানাজা শেষে আব্দুল্লাহ আল ফারুকের কফিনে প্রথমেই শ্রদ্ধা নিবেদন করেন ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির নেতৃবৃন্দ। এর পর বিএনপির পক্ষ থেকে দলের যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরে ক্রাইম রিপোর্টার্স এ্যাসোসিয়েশন ও নারী সাংবাদিক কেন্দ্রসহ বিভিন্ন সংগঠন তার কফিনে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করে। জানাজার আগে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি ঘাতক ট্রাকের ধাক্কায় আব্দুল্লাহ আল ফারুক নিহতের ঘটনায় ৩ দিনের কর্মসূচী ঘোষণা করেন। কর্মসূচীর অংশ হিসেবে রবিবার বিকেলে ডিআরইউ প্রাঙ্গণ থেকে বিক্ষোভ মিছিল করে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে গিয়ে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ সমাবেশ করা হয়। এ ছাড়া আজ কাল ব্যাজ ধারণ ও কাল মঙ্গলবার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করা হবে।

বিকেলে পৌনে ৩টা থেকে সোয়া ৩টা পর্যন্ত শতাধিক সাংবাদিক জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। এ সময় ঘাতক ট্রাক চালককে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতারের আলটিমেটাম দেন ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি জামাল উদ্দীন। তিনি বলেন, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ঘাতক ট্রাকচালককে গ্রেফতার করা না হলে মঙ্গলবার বেলা ১১টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন থেকে পরবর্তী কঠোর কর্মসূচী ঘোষণা করা হবে।

সমাবেশে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক মহাসচিব আব্দুল জলিল ভুঁইয়া বলেন, এর আগেও চালকদের বেপরোয়া গাড়ি চালানোর কারণে বেশ কয়েকজন সাংবাদিকের মৃত্যু হয়েছে, কিন্তু এর কোন প্রতিকার হয়নি। এ সব ঘটনার জন্য তিনি নৌ পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খানকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, শ্রমিক নেতা শাজাহান খানের শ্রমিকদের পক্ষে সাফাই গাওয়া এবং যেনতেনভাবে ড্রাইভিং লাইসেন্স দেয়ার কারণেই এ সব দুর্ঘটনা ঘটছে। তাই শুধু ঘাতক চালকদের বিচার নয়, শাজাহান খানেরও বিচার করতে হবে।

ডিআরইউ সভাপতি জামাল উদ্দীনের সভাপতিত্বে বিক্ষোভ সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন সাংবাদিক নেতা শাহজাহান মিয়া, শাহেদ চৌধুরী, সাজ্জাদ আলম খান তপু, মাহমুদুর রহমান খোকন, কেরাম উল্লাহ বিপ্লব প্রমুখ।

আবদুল্লাহ আল ফারুকের গ্রামের বাড়ি পাবনা জেলার সাঁথিয়া উপজেলার বিশালীখা গ্রামে। তার বাবার নাম মরহুম গাজিউর রহমান। তিনি প্রায় ২৫ বছর ধরে সাংবাদিকতা করতেন। ২০০৯ সালে কালের কণ্ঠে যোগ দেয়ার আগে সমকালের চীফ রিপোর্টার এবং যুগান্তর ও সংবাদে রাজনীতি ও সংসদ বিষয়ক প্রতিবেদক হিসেবে কাজ করেছেন। সর্বশেষ তিনি আজকের পত্রিকার প্রধান প্রতিবেদক ছিলেন। আগামী ১ জানুয়ারি ‘খোলা কাগজ’ নামে নতুন একটি পত্রিকায় তার যোগ দেয়ার কথা ছিল বলে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাবেক সভাপতি শাহেদ চৌধুরী জানান।

আবদুল্লাহ আল ফারুকের মৃত্যুতে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াসহ বিভিন্ন মহল শোক প্রকাশ করেছেন। খালেদা জিয়া তার শোকবার্তায় বলেন, আব্দুল্লাহ আল ফারুক সাংবাদিকতা জীবনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। স্বাধীন সাংবাদিকতার মহান ব্রতকে সামনে রেখে তিনি যে নিরলসভাবে সাংবাদিকতার দায়িত্ব পালন করেছেন তা তার সতীর্থ ও সহকর্মীদের মধ্যে প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। তিনি মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবার, গুণগ্রাহী ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি সমবেদনা জানান। অপর এক বার্তায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জ ফখরুল ইসলাম আলমগীরও শোক প্রকাশ করেছেন।

বাংলাদেশ পার্লামেন্ট জার্নালিস্ট এ্যাসোসিয়েশনের (বিপিজেএ) সদস্য ও দৈনিক কালের কণ্ঠের সাবেক উপ-সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল ফারুক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ায় শোক প্রকাশ করেছেন সংগঠনটির সভাপতি উত্তম চক্রবর্তী ও সাধারণ সম্পাদক কামরান রেজা চৌধুরী। শোকবার্তায় তারা বলেন, আব্দুুল্লাহ আল ফারুক একজন বিনয়ী ও সদালাপি সাংবাদিক ছিলেন। তারা ঘাতক ট্রাক চালককে দ্রুত খুঁজে বের করে আইনের আওতায় এনে শাস্তি দাবি করেন।