১৪ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশ ও বাঙালীর দাবি, ইতিহাসের অমূল্য স্মারক

বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশ ও বাঙালীর দাবি, ইতিহাসের অমূল্য স্মারক
  • বাংলাদেশের প্রথম ডাকটিকেট

মোরসালিন মিজান

স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়ে গিয়েছে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পর্যন্ত এই ভূখ- ছিল পূর্ব পাকিস্তান। পরদিন ২৬ মার্চ থেকে বাংলাদেশ! পাকিস্তান দখলদার বাহিনীকে শুধু ঝেটিয়ে বিদায় করতে হবে। পরিচ্ছন্নতার কাজে অংশ নিয়েছেন বিপুল সাহসী মুক্তিযোদ্ধারা। প্রাণপণে লড়ছে বাঙালী। কিন্তু বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশ নামের নতুন দেশটির পরিচয় তো তুলে ধরতে হবে। ন্যায়ের যুদ্ধে তাঁদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করতে হবে। হ্যাঁ, সে লক্ষ্যেই ডাকটিকেট প্রকাশের চিন্তা। অত্যন্ত কার্যকর এ পদক্ষেপ গ্রহণ করে মুজিবনগর সরকার। মাধ্যমটি ব্যবহার করে বাংলাদেশ পৌঁছে যায় গোটা দুনিয়ার মানুষের কাছে। এখন মুক্ত স্বদেশ। কত কত ডাকটিকেট প্রকাশিত হচ্ছে! কিন্তু যুদ্ধদিনে প্রকাশিত ডাকটিকেট কেবল ডাকটিকেট হয়ে নেই। আজ সেগুলো ইতিহাসের অমূল্য স্মারক।

জানা যায়, ১৯৭১ সালের ২৯ জুলাই প্রকাশিত হয় বাংলাদেশের প্রথম ডাকটিকেট। একসঙ্গে ৮টি ডাকটিকেট প্রকাশ করে অস্থায়ী সরকার। একযোগে প্রকাশিত হয় মুজিবনগর, কলকাতা ও যুক্তরাজ্য থেকে। কারও কারও কাছে এখনও আছে দুর্লভ এই সংগ্রহ। খুঁটিয়ে দেখলে ১৯৭১ সালের বাংলাদেশটাকে দেখা হয়ে যায়। সংক্ষিপ্ত দেখা বটে। এই দেখার তুলনা হয় না। ১০ টাকা মূল্যমানের ডাকটিকেটে তুলে ধরা হয় বাংলাদেশের মানচিত্র। এটি দেখিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্ববাসীর সমর্থন চাওয়া হয়। টিকেটের গায়ে ইংরেজীতে লেখা হয়Ñ সাপোর্ট বাংলাদেশ। বাংলাদেশ বলেই অনিবার্য হয়ে ওঠেন বঙ্গবন্ধু। বাঙালীর অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবের প্রতিকৃতি স্থান পায় ৫ টাকা মূল্যমানের ডাকটিকেটে। শৌর্য বীর্যের সবটুকু নিয়ে দৃশ্যমান হন মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক। ৩ টাকা মূল্যমানের ডাকটিকেটে ছিল ঐতিহাসিক মুজিবনগর সরকার গঠনের খবরটি। এর মাধ্যমে ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল গঠিত সরকারের ঘোষণা ছড়িয়ে পড়ে গোটা দুনিয়ায়। ’৭০ এর নির্বাচনে বিপুলভাবে বিজয়ী হয়েও ক্ষমতা পায়নি আওয়ামী লীগ। বাঙালীর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেনি পাকিস্তানীরা। ২ টাকা মূল্যমানের টিকেট সেই নির্বাচনের ফল ঘোষণা করে। পৃথিবীর সব দেশকে জানিয়ে দেয় মুক্তিযুদ্ধ বাঙালীর অধিকার আদায়ের সংগ্রাম। এই সংগ্রাম অনিবার্য ছিল। নতুন রাষ্ট্রকে চেনাতে জাতীয় পতাকাও খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ১ টাকা মূল্যমানের টিকেটের গায়ে ছিল বাংলাদেশের লাল সবুজের পতাকা। মানচিত্র খচিত পতাকা স্থান পায় এই টিকেটে। ৫০ পয়সা মূল্যমানের টিকেটে খুঁজে পাওয়া যায় বাংলাদেশে সাড়ে ৭ কোটি মানুষের তথ্য। ২০ পয়সা মূল্যমানের ডাকটিকেটে ছিল ২৫ মার্চের কালোরাত্রির ইতিহাস। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় যে গণহত্যা, তার কথা এখানে রক্তের ফোঁটা এঁকে প্রকাশ করা হয়। ১০ পয়সা মূল্যমানের টিকেটে পরিষ্কার করা হয় বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান। এভাবে মোট ৮ টিকেটের একটি মালা। মালাটির নাম বাংলাদেশ! সিরিজ প্রকাশনায় বাংলাদেশ ও বাঙালীর মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস ফুটে ওঠে। ন্যায্য দাবির কথা প্রতিধ্বনিত হয়।

এবার একটু পেছনে যাওয়া যাক। দেশ যখন আক্রান্ত, মানুষ যখন গৃহহারা তখন এমন চমৎকার প্রকাশনা কি করে সম্ভব হলো? উত্তর খুঁজতে গিয়ে প্রথমেই পাওয়া যায় এক বিদেশী বন্ধুর নাম। যুক্তরাজ্যের নাগরিক। নামÑ জন স্টোনহাউজ। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্য ছিলেন তিনি। দায়িত্ব পালন করেছেন পোস্টমাস্টার জেনারেল হিসেবে। এই সূত্রেই বাংলাদেশকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসা। ডাকটিকেটে কী কী বিষয় তুলে ধরা হবে তা ঠিক করে দিয়েছিল প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনের নেতৃত্বাধীন মুজিবনগর সরকার। সে অনুযায়ী শুরু হয় ডাকটিকেটের জন্য ডিজাইনার খোঁজার কাজ। জন স্টোনহাউজের জন্য কাজটা সহজই ছিল। তখন ব্রিটনের রাষ্ট্রীয় ডাকটিকেটের নকশা করে বেশ নাম হয়েছে বিমান মল্লিকের। ভারতের শিল্পী। মহাত্মা গান্ধীর ছবি সংবলিত ডাকটিকেটের নকশা করে খ্যাতি অর্জন করেন। এ কাজ করার সময় তাঁদের পরস্পরের সঙ্গে পরিচয়। পরিচয়ের সূত্রে বাংলাদেশের কাজটির সঙ্গে যুক্ত হন বিমান মল্লিক। নকশাকারের এক সাক্ষাতকার থেকে জানা যায়, ১৯৭১ সালের ২৯ এপ্রিল জন স্টোনহাউজ তাঁকে ফোন করে কাজটি করার প্রস্তাব দেন। জানান, বাংলাদেশের জন্য ডাকটিকেট করে দিতে হবে। সময় খুব। বাংলাদেশের জন্য কাজ করতে পারাকে গর্বের মনে করেই রাজি হয়ে যান মল্লিক। কাজ এগিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে ৩ মে উভয়ের বৈঠক হয় হাউস অব কমন্সে। পরের বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। বিদেশে জনমত গঠনের পাশাপাশি ডাকটিকেট প্রকাশের কাজে বিশেষ ভূমিকা রাখেন তিনি।

জানা যায়, বিমান নকশার কাজ করেন টানা ছয় সপ্তাহ। ট্রেনে যাতায়াতের সময় নকশার কাজ করেন। খাবার টেবিলে বসে চলে নকশার কাজ। কলেজে পড়াশোনা আছে। সেখানে ফাঁকি দিয়ে নকশা করেন। সাক্ষাতকারে তিনি জানিয়েছিলেন, টিকেটের গায়ে কী তথ্য থাকবে, কোন কোন প্রতীক বা ছবি ব্যবহৃত হবে সে সম্পর্কে তাঁকে খুব বেশি ধারণা দেয়া হয়নি। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমেই নকশার কাজটি শেষ করেন তিনি।

জানা যায়, এ কাজের সঙ্গে পরে যুক্ত হন আরেক ব্রিটিশ বন্ধু দাতব্য প্রতিষ্ঠান ‘ওয়ার অন ওয়ান্ট’ প্রধান ডোনাল্ড চেসওয়ার্থ। তিনি কলকাতায় গিয়ে মুজিবনগর সরকারের কাছ থেকে মূল নকশার অনুমোদন নিয়ে আসেন। এরপর শুরু হয় ছাপার কাজ। ছাপার কাজ করা হয় যুক্তরাজ্যের ফরম্যাট ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেসে।

জানা যায়, ২৬ জুলাই হাউস অব কমন্সে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে উপস্থিত থেকে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী ডাকটিকেট ও ফার্স্ট ডে কাভার প্রদর্শন করেন। যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যমে খবরটি গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়। ৮টি ডাকটিকেটের মূল্য ধরা হয় এক পাউন্ড নয় পেনি। টিকেট বিক্রির দায়িত্ব পায় বাংলাদেশ ফিলাটেলিক এজেন্সি। ২৯ জুলাই উত্তর-দক্ষিণ আমেরিকা, যুক্তরাজ্য, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্যর বিভিন্ন দেশে প্রকাশিত হয় বাংলাদেশের ডাকটিকেট। একই সময় বাংলাদেশের মুক্তাঞ্চলে পৌঁছে যায়। হ্যাঁ, ততক্ষণে মোটামুটি দুনিয়াজুড়ে এ নিয়ে আলোচনা। পাকিস্তান তো ইন্টারন্যাশনাল পোস্টাল ইউনিয়নের সদর দফতরে অভিযোগ নিয়ে হাজির। পাকিদের দাবিÑ এসব টিকেটের আইনী ভিত্তি নেই। এগুলো অবৈধ। অথচ এর চেয়ে বৈধ এর চেয়ে সত্য যে কিছু নেই জেনে গেছে বিশ্ববাসী। আর এ জানানোর কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা প্রথম প্রকাশিত ডাকটিকেটগুলোর।

বিশিষ্ট সংগ্রাহক ও ফিলাটেলিক এ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক এটিএম আনোয়ারুল কাদির জানান, এখনও সেসব ডাকটিকেটে তাঁরা অত্যন্ত যতেœর সঙ্গে সংরক্ষণ করছেন। তিনিসহ তাঁদের কয়েক সদস্যের কাছে আছে প্রথম প্রকাশিত ডাকটিকেট। আছে জিপিওর প্রধান কার্যালয়ে অবস্থিত জাদুঘরেও। তবে এগুলো প্রদর্শনের তেমন সুযোগ পান না বলে জানান তিনি। এই দুর্লভ সংগ্রহ, একাত্তরের বাংলাদেশ নতুন প্রজন্মের সামনে আসুক। বিকল্প পাঠ নিশ্চয়ই ভাললাগবে তাঁদের।