২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আস্থা অর্জন ॥ এগিয়ে যাচ্ছে রফতানিমুখী শিল্প খাত

  • পাঁচ মাসে আয় বেড়েছে ৭ শতাংশ

এম শাহজাহান ॥ সব বাধা অতিক্রম করে দেশের রফতানিমুখী শিল্পখাতগুলো এগিয়ে যাচ্ছে। ক্রেতাদের আস্থা অর্জনে বাড়ছে পণ্য রফতানি। জঙ্গীবাদ ও সন্ত্রাস মোকাবেলায় সরকারের জিরো টলারেন্স অবস্থান থাকায় তাদের মধ্যে যে দ্বিধাগ্রস্ত মনোভাবের সৃষ্টি হয়েছিল তাও কেটে যাচ্ছে। বিদেশীরা বাংলাদেশমুখী হচ্ছেন। আর এ কারণেই চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে রফতানি আয় বেড়েছে প্রায় ৭ শতাংশ। এই পাঁচ মাসে বাংলাদেশ পণ্য রফতানি করে ১ হাজার ২৮৮ কোটি ডলার আয় করেছে। শুধু নবেম্বর মাসে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় রফতানি বেড়েছে প্রায় ১৪ শতাংশ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজনীতির নামে সব ধরনের নাশকতা ও নৈরাজ্য নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা সম্ভব হলে ২০২১ সালের মধ্যে ৫০ বিলিয়ন ডলার রফতানির যে স্বপ্ন রয়েছে তা পূরণ হবে। এছাড়া, রফতানি বৃদ্ধিতে উৎপাদনে নৈপুণ্যের উন্নয়ন, বহির্বাজার সম্প্রসারণ, চীন ও ভারতের সঙ্গে আঞ্চলিক যোগাযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে রফতানি বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। বাজার সম্প্রসারণে এফটিএ এবং পিটিএর মাধ্যমে নতুন নতুন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি হবে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে অন্তত ৫০টি দেশের সঙ্গে এ ধরনের চুক্তি করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ফলে বহির্বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে। যেসব দেশের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি রয়েছে সেসব দেশের ক্ষেত্রে শুল্ককর দিতে হয় মাত্র ২০ শতাংশ। এ অবস্থায় বাংলাদেশী তৈরি পোশাক যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে মরক্কোতে রফতানি হচ্ছে। উচ্চ শুল্কহারের কারণে বাংলাদেশ থেকে সরাসরি রফতানি করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে ওই দেশটির সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর হলে বাংলাদেশের রফতানি বেড়ে যাবে।

জানা গেছে, উচ্চ শুল্কহারের কারণে বাংলাদেশ থেকে সরাসরি বিশ্বের অনেক দেশে রফতানি করা সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু এফটিএর আওতায় এসব সমস্যা দূর করে রফতানি বাড়ানো হবে। এ লক্ষ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যের তথ্য-উপাত্তসহ বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসের ১৯টি বাণিজ্যিক উইংয়ের কাছে দেশভিত্তিক প্রতিবেদন প্রস্তুত করার নির্দেশ দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। বাণিজ্যিক উইংগুলো থেকে অদক্ষ ও অনভিজ্ঞ লোকদের সরিয়ে সেখানে অভিজ্ঞদের নিয়োগ দেয়া শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে রফতানি বাণিজ্য বাড়ানোর জন্যও তাদের নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য মতে, চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে গত বছরের এই একই সময়ের তুলনায় দেশের রফতানি আয় বেড়েছে ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ। এ বছরের শুধু নবেম্বর মাসেই গত বছরের একই মাসের তুলনায় রফতানি বেড়েছে ১৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ পর্যন্ত।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ভাইস-চেয়ারম্যান শুভাশিষ বসু জনকণ্ঠকে বলেন, বছরের শুরুতে বিএনপি-জামায়াতের তিন মাসের হরতাল-অবরোধের মধ্যে ব্যাপক সহিংসতায় দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত ও ভাবমূর্তি সঙ্কটে পড়ে। অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে ওই সময় যেসব ক্রেতা বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন বলে চিন্তা করছিলেন, তারা সবাই এখন বাংলাদেশ থেকে পণ্য কিনছেন। পাশাপাশি বাংলাদেশের গার্মেন্টস মালিকরা ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী কমপ্লায়েন্স বাস্তবায়ন করায় রফতানি আয়ে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

ইপিবির হালনাগাদ তথ্যে দেখা যায়, চলতি ২০১৫Ñ১৬ অর্থবছরের জুলাই-নবেম্বর সময়ে ১ হাজার ২৮৭ কোটি ৯০ লাখ ডলার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে বাংলাদেশ ১ হাজার ২৮৭ কোটি ৯৮ লাখ ৩০ হাজার ডলারের পণ্য রফতানি করেছে। সবচেয়ে বেশি আয় হয়েছে নিট পোশাক রফতানি থেকেÑ ৫২৩ কোটি ৬৭ লাখ ৩০ হাজার ডলার। ওভেন পোশাক থেকে এসেছে ৫২২ কোটি ৬০ লাখ ৩০ হাজার ডলার। এ সময়ে নিট পোশাক রফতানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ৭৮ শতাংশ। আর ওভেনে প্রবৃদ্ধি আরও বেশি, ১১ দশমিক ৩৫ শতাংশ।

এদিকে, চলতি বছর নতুন জিএসপি স্কিম চালু হলেও সুবিধাপ্রাপ্তদের তালিকায় নেই বাংলাদেশ। আশঙ্কা ছিল, এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে গার্মেন্টস পণ্য রফতানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তবে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রফতানি বেড়েছে। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে দেশটি থেকে রফতানি আয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১১ শতাংশ। এ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্য বহুমুখীকরণের ফলে রফতানিকারকদের মধ্যে সৃষ্ট অনাগ্রহ সত্ত্বেও এ প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।

যদিও জিএসপি স্থগিতাদেশের কোন প্রভাব ব্যবসায় পড়বে না বলে শুরু থেকে রফতানি খাত সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা দাবি করে আসছিলেন। সে সময় এর কারণ হিসেবে তারা বলেন, দেশটিতে বাংলাদেশের প্রধান রফতানি পণ্য পোশাক খাত জিএসপি সুবিধার আওতায় নেই। ফলে পোশাক রফতানি আয় কমে যাওয়ার মতো কোন ঘটনা ঘটবে না।

এ প্রসঙ্গে রফতানিকারকদের সংগঠন এক্সপোর্টার্স এ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইএবি) সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী জনকণ্ঠকে বলেন, জিএসপি প্রত্যাহারের প্রভাব পড়েনি। কারণ যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক পণ্য রফতানিতে বাংলাদেশ জিএসপি সুবিধা পায় না। দেশের সিংহভাগ আয়ও আসে এ পণ্য রফতানি থেকে। মূলত এ কারণেই প্রত্যক্ষ কোন নেতিবাচক প্রভাব রফতানি আয়ে পড়েনি।

অপ্রচলিত মার্কেট সম্প্রসারণ ও পণ্য বহুমুখীকরণ ॥ পোশাক রফতানি বাজার সম্প্রসারণে অপ্রচলিত মার্কেটে প্রবেশে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। নতুন বাজার হিসেবে পরিচিত ভারত, চীন, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ, জাপান, লাতিন আমেরিকা এবং দক্ষিণ আফ্রিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পোশাক রফতানি বাড়ানো হবে।