২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ডাঃ মুর্তজা, তোমাদের ভুলব না

  • এনামুল হক

শীতের সকালের কুয়াশা তখনও কাটেনি। একাত্তরের ১৪ ডিসেম্বর চারদিকে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থার মধ্যে একটা পুরনো মাইক্রোবাস দ্রুত ছুটে এলো ফুলার রোডে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টাফ কোয়ার্টারগুলোর একটি গেটের সামনে। ভেতর থেকে ঝটপট কিছু লোক নেমে দ্রুত এগিয়ে গেল একতলার একটা ফ্ল্যাটে। কড়া নাড়ার শব্দে ভেতর থেকে দরজা খুলে দিতেই লোকগুলো ঝড়ের গতিতে ঢুকে পড়ল ভেতরে। তাদের কারোর কারোর হাতে অস্ত্র।

‘আপনাকে একটু আমাদের সঙ্গে যেতে হবে’Ñ বলেই ফ্ল্যাটের বাসিন্দা ডাঃ মোহম্মদ মুর্তজাকে পিঠমোড়া করে বাঁধল ওরা। পাশে দাঁড়ানো তিন বছরের শিশুকন্যা মিতির ওড়নাটা টান মেরে নিয়ে তা দিয়েই তাঁরা তার চোখ বেঁধে ফেলল। তারপর তাকে ধরে দ্রুত নিয়ে তুলল সেই মাইক্রোবাসটিতে যেখানে আরও ক’জন একই অবস্থায় বসা ছিলেন। বাড়ির মানুষগুলোর বোবা দৃষ্টির সামনে আল-বদররা এভাবেই তুলে নিয়ে গিয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিক্যাল অফিসার ডাঃ মুর্তজাকে। পূর্ব দিগন্তে স্বাধীনতার সূর্য তখন উঁকি দিতে শুরু করেছে মাত্র।

শুধু ডাঃ মুর্তজাই বা কেন। মোটামুটি একইভাবে ওই ঘাতকের দল তুলে নিয়েছিল এদেশের বেশ ক’জন খ্যাতিমান বুদ্ধিজীবীকে। তাদের পিঠমোড়া অর্ধগলিত লাশ কয়েক দিন পর উদ্ধার করা হয় মিরপুর ও রায়ের বাজারের বধ্যভূমি থেকে।

ডাঃ মুর্তজার সঙ্গে আমার পরিচয় সেই ১৯৬৭ সালে একটু বিচিত্রভাবে। তখন রাষ্ট্রবিজ্ঞান প্রথম বর্ষের ছাত্র আমি। গ্যাসট্রিকের সমস্যা নিয়ে ভার্সিটির মেডিক্যাল সেন্টারে এই চিকিৎসকের কাছে গিয়েছিলাম। অতি সাদামাটা নিরীহ চেহারার একজন মানুষ। আমার প্রবলেম খুলে বলতেই উনি মন্তব্য করলেন, আপনার এ সমস্যা কোনদিন যাবে না যতদিন নিজের সমস্যা নিয়ে বেশি মাথা ঘামাবেন। বরং সমাজের সমস্যা নিয়ে ভাবুন। দেখবেন ওসব গ্যাসট্রিক ফ্যাসট্রিক কিসসু থাকবে না। বলাবাহুল্য তিনি আমাকে বিদায় করার আগে কিছু ওষুধের প্রেসক্রিপশন দিতে ভোলেননি।

তখন ছিল লেফট ইনটালেকচুয়ালিজমের যুগ। স্বভাবতই বামপন্থী সাহিত্য বেশ পড়াশোনা করতাম। সহমতের বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা হতো, তর্ক হতো। একদিন আমার এক সহপাঠী বলল, ‘এই, যাবি এক জায়গায় সন্ধ্যার পর? জব্বর আলোচনা হয়।’ তো তার সঙ্গে গেলাম সেখানে। ব্রিটিশ কাউন্সিলের কাছে ফুলার রোডের বিশ্ববিদ্যালয় স্টাফ কোয়ার্টার। এরই একতলার ফ্ল্যাট। ঢুকে দেখি ড্রইংরুমে লোকভর্তি মানুষÑ বিভিন্ন বয়সের। কাঠের চেয়ারে বসা। একপাশে দুটো বইভর্তি আলমারী। জানালার ধারে একটা বড় কাঠের টেবিল। আরেক পাশের দেয়ালে ব্ল্যাকবোর্ড। সেই ব্ল্যাকবোর্ডের পাশে দাঁড়িয়ে যিনি কথা বলছেন চমকে উঠলাম তাকে দেখে। ডাঃ মুর্তজা! সেই মেডিক্যাল অফিসার যিনি বলেছিলেন, ‘আরে, সমাজের সমস্যা নিয়ে ভাবুন।’ উনি সেদিন ব্ল্যাকবোর্ডে আঁকা ও লেখার সাহায্যে ডারউইনের বিবর্তনবাদ ব্যাখ্যা করছিলেন। জটিল জিনিসকে এত সহজবোধ্য করে তোলাÑ আগে আর কখনও দেখিনি।

তারপর থেকে ওখানে যাওয়াটা নিয়মিত হয়ে গেল। একটা নেশার মতো। একেকদিন একেক বিষয়ে আলোচনা। বক্তাও বিভিন্ন জন। আলোচনায় আসতেন মোফাজ্জলুল হক (প্রয়াত অধ্যাপক লোক প্রশাসন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়), প্রকৌশলী খলিল ভাই, নাট্যশিল্পী আলমগীর কবির, লখাভাই প্রমুখ। কখনও কেউ কিছু পরিষ্কার করতে না পারলে ডাঃ মুর্তজা ফ্লোর নিতেন। ব্ল্যাকবোর্ডে গিয়ে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করতেন। অবাক লাগত। পেশায় চিকিৎসক। অথচ ডায়ালেকটিক্সের মতো জটিল ও দুরূহ বিষয়গুলোকে এমন অবলীলায় ও প্রাঞ্জলভাবে বুঝিয়ে দিতে পারতেন যে আর বলার নয়। এমনিভাবেই ডাঃ মুর্তজার পাঠশালায় আমরা পাঠ্যপুস্তকের বাইরে জ্ঞানচর্চার আরেক জগতে বিচরণ করতাম। এভাবেই আমাদের মুক্তবুদ্ধির চর্চা এক স্তর থেকে আরেক স্তরে উন্নীত হয়েছিল। তাঁর ব্যক্তিগত পাঠাগার থেকে আমরা পড়ার জন্য নিতাম এমিল বার্নসের ‘থিওরি অব নলেজ’, দেবী প্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের ‘লোকায়ত দর্শন’, সুপ্রকাশ রায়ের ‘ভারতে কৃষক বিদ্রোহ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম’ এমনি কত কি।

লেখালেখিতেও সমান সিদ্ধহস্ত ছিলেন ডাঃ মুর্তজা। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের ওপর একটা বই লিখেছিলেন ডায়ালেকটিক্সের দৃষ্টিকোণ থেকে। বইটি বেশ সমাদৃত হয়েছিল। এক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে লেখা তাঁর জনসংখ্যা সমস্যার ওপর একটি বই আদমজী পুরস্কার পেয়েছিল। তৎকালীন সমাজের উচ্চবিত্তের জীবনের কুৎসিত দিক উন্মোচন করে তিনি লিখেছিলেন ‘চরিত্রহানির অধিকার’। মার্ক্সীয় সাহিত্যের কিছু অনুবাদগ্রন্থও তাঁর বের হয়েছিল। চিকিৎসা পেশা ও লেখালেখির বাইরে আরও বৃহত্তর ও ঝুঁকিপূর্ণ জীবনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ডাঃ মুর্তজা। সমাজ বদলের রাজনীতি তাঁকে অনেক গভীরে টেনে নিয়ে গিয়েছিল।

আল-বদররা যে এভাবে তাঁকে ধরে নিয়ে যাবে এ যেন অবধারিতই ছিল। কারণ অনেক ভাগেই তিনি জামায়াতে ইসলামীর টার্গেট হয়ে গিয়েছিলেন। একবার তাদের এক সাপ্তাহিক, নামটা সম্ভবত ‘জাহানে নও’ পত্রিকায় তাঁকে নিয়ে বেশ ফলাও করে খবর ছাপা হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ডাক্তার চিকিৎসার নাম করে ছাত্রদের মধ্যে কমিউনিজম মতবাদ ছড়াচ্ছেন এই ছিল রিপোর্টের মূল কথা। একাত্তরের শেষের দিকে যখন জীবনমৃত্যুর কোনটারই কোন ঠিক ঠিকানা ছিল না সে সময় তাঁকে পরামর্শ দেয়া হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐ তল্লাট ছেড়ে নিরাপদ কোন আশ্রয়ে চলে যেতে। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে গভীর হতাশায় তিনি বলেছিলেন, ‘কোথায় যে যাব, নিরাপদ আশ্রয়ইবা কোথায়।’

ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে রায়েরবাজারের বধ্যভূমি থেকে অনেক শহীদ বুদ্ধিজীবীর সঙ্গে ডাঃ মুর্তজার লাশও এলো। ডেডবডি শনাক্ত করা, কফিনে ভরা ইত্যাকার ফরমালিটি শেষ করে লাশগুলো ট্রাকে করে যার যার বাড়ির সামনে নেয়া এবং শেষ দর্শনের পাট চুকে দাফনের জন্য যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদের পেছনের অঙ্গনে নেয়া হলো তখন পড়ন্ত বিকেল।

কবরগুলো আগেই খুঁড়ে রাখা হয়েছে। চারদিকে কর্পূর ও লেবানের গন্ধ। লাশগুলো কবরে শায়িত করা হচ্ছে। স্বজনরা অশ্রুপাত করছে। মুঠো মুঠো করে নেয়া মাটি কবরে ফেলছে। আর আমি যেন দেখছি ওদের অশ্রু আর মাটি মিলেমিশে একাকার হয়ে অসংখ্য ফুলে রূপান্তরিত হয়ে যাচ্ছে এবং এভাবে ফুলে ফুলে ভরে গিয়ে প্রতিটি কবর যেন এক একটা কেয়ারিতে পরিণত হচ্ছে।

সন্ধ্যার কুয়াশার আস্তরণ একটু একটু করে নামছে। একরাশ শূন্যতা নিয়ে বাড়ি ফিরতে লাগলাম। ডাঃ মুর্তজার স্মৃতিগুলো পীড়া দিতে লাগল। চিন্তায় স্বচ্ছতা, আদর্শের প্রতি অবিচলতা আর আপোসহীন ভূমিকার এই মানুষটিকে সমাজের বড়ই দরকার ছিল। তার মতো আর কে এত সুন্দরভাবে বলবেÑ ‘সভ্যতার প্রতিশব্দ শ্রম।’