২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ফুটবলে নারী জাগরণের নেপথ্যে

অপেক্ষা ছিল দীর্ঘ ৮ মাসের। গত এপ্রিলেই হতে পারত গৌরবময় উৎসব। কিন্তু কিছুটা বিলম্ব হলো। তবে এতে করে যেন আনন্দটা দ্বিগুণ হলো বছরের শেষে। বিজয়ের গৌরবমাখা একটি মাস ডিসেম্বর। দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধ করে পাক হানাদারের কাছ থেকে বিজয় ছিনিয়ে বিশ্ব মানচিত্রে মাথা উঁচু করে নিজেদের অস্তিত্ব প্রকাশ করে স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশ। মাত্র চারদিন আগেই জাতি সেই গৌরবময় উৎসব পালন করেছিল। আর এবার ১৬ কোটি বাংলাদেশীকে আরেকটি গৌরব উপহার দিয়েছে বাংলাদেশ অনূর্ধ-১৪ বালিকা ফুটবল দল। গত রবিবার কাঠমান্ডুর সেনাবাহিনী শারীরিক শিক্ষাকেন্দ্র মাঠে অনুষ্ঠিত এএফসি অনূর্ধ-১৪ গার্লস রিজিওনাল চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে স্বাগতিক নেপালকে ১-০ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়ে দেশে ফিরেছে বাংলাদেশের বালিকা ফুটবলাররা। একমাত্র এ গোলটি করেন মারিয়া মান্দা। এই প্রথম কোন বড় আসরে বাংলাদেশের মহিলা ফুবলাররা (বয়সভিত্তিক কিংবা জাতীয় দল) চ্যাম্পিয়ন হওয়ার অনন্য ইতিহাস সৃষ্টি করল। হিমালয়ের পাদদেশে নিজ দেশের বিজয় কেতন ওড়ালেন কিশোরী ফুটবলাররা। আর এমন গৌরব বয়ে আনা সম্ভব হয়েছে মহিলা ফুটবলের প্রতি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) যতœ, নিরলস চেষ্টা এবং সুযোগ-সুবিধা দেয়ার কারণে। এছাড়া কোচ হিসেবে গোলাম রব্বানী ছোটনও নিজের সর্বোচ্চটা দিয়েই মহিলা ফুটবলারদের প্রশিক্ষণ দিয়ে গেছেন। অবিস্মরণীয় এ সাফল্য পাওয়ার নেপথ্যে আছে আরও অনেক শ্রম ও চেষ্টা।

কিছুদিন আগে কলসিন্দুর নামটা আলোতে আসে বঙ্গমাতা গোল্ডকাপ ফুটবলে এই গ্রামেরই একটি স্কুল চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর। পাহাড়ের কোলঘেঁষা এই গ্রামটি মহিলা ফুটবলে কতটা এগিয়ে গেছে সেটা হঠাৎ করেই জেনে বিস্মিত হয়ে যায় পুরো দেশ। সেই কলসিন্দুরের ৬ ফুটবলার এখন আন্তর্জাতিক সাফল্য পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন। এবার এএফসি অনূর্ধ-১৪ মহিলা ফুটবলের আঞ্চলিক ফাইনালে বাংলাদেশ দলে ছিল ময়মনসিংহ জেলার এই গ্রামেরই ১০ ফুটবলার। শক্তিশালী নেপালের বিরুদ্ধে যে একমাত্র গোলে শিরোপা গৌরব সেটাও এসেছে কলসিন্দুরের মেয়ে মারিয়া মান্দার পা থেকে। এছাড়া এই দলে ছিলেন সানজিদা, শিউলি, শামসুন্নাহার, মার্জিয়া, তাসলিমা, মাহমুদা, রূপা, তহুরা ও নাজমা। এটাই প্রথম কোন মহিলা ফুটবলের বড় আসরে বাংলাদেশের শিরোপা জয়। এর আগে ২০১৩ সালে বাংলাদেশ অনূর্ধ-১৪ মহিলা দল শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত এই আসরে অংশ নিয়ে তৃতীয় হয়েছিল এবং ফেয়ার প্লে ট্রফি লাভ করেছিল। আর এবার হয়ে গেল চ্যাম্পিয়ন। লড়াইয়ে নেমে শিরোপা জিততে উন্মুখ ছিল উজ্জীবিত বাংলাদেশ। কারণ গ্রুপপর্বে ভারতের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করলেও ভুটানকে ১৬-০ গোলের বিশাল ব্যবধানে হারিয়েছিল। সেমিফাইনালে শক্তিশালী ইরানকে ২-০ গোলে হারিয়ে ফাইনালে ওঠে বাংলাদেশের বালিকারা।

গত ২৫ এপ্রিল শিরোপা জয়ের আত্মবিশ্বাস নিয়েই নেপালে গিয়েছিল বাংলাদেশের মেয়েরা। কিন্তু ভয়াবহ ভূমিকম্পে ফাইনালের ভেন্যু দশরথ স্টেডিয়ামে ফাটল ধরে এবং বিপদগ্রস্ত মেয়েদের বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারে করে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। শেষ পর্যন্ত শিরোপা আসলোই। গৌরবটা গত ১০ বছরের চেষ্টার ফসল। সেজন্য কিছুটা পেছনে তাকাতে হবে। ২০০৪ সালে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা নতুন আইন প্রণয়ন করে জানিয়ে দেয় প্রতিটি সদস্য দেশকে পুরুষ দলের পাশাপাশি মহিলা দলও গড়তে হবে। সে সময় বাফুফে দেশের বিভিন্ন ক্রীড়া ইভেন্টে নিয়মিত খেলা মহিলা ক্রীড়াবিদদের নিয়ে একটি ফুটবল দল গড়ে। তখন জোড়াতালি দেয়া সে মহিলা ফুটবল দলে ছিল জাতীয় পর্যায়ে ভলিবল, কাবাডি, হ্যান্ডবল ও বাস্কেটবল খেলা মেয়েরা। দল গড়ার কিছুদিনের মধ্যেই বাফুফে আমন্ত্রণ জানায় ভারতের পশ্চিমবঙ্গ মহিলা ফুটবল দলকে। খুলনা, নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকায় মোট ৫টি ম্যাচ খেলে তাদের বিরুদ্ধে। কিন্তু প্রতিটি ম্যাচেই ১৫/১৬ গোলের বড় ব্যবধানে হারতে হয়। ব্যবধানটাই বুঝিয়ে দেয় উন্নতির জন্য করণীয়টা। বাফুফে সেই পথেই এগিয়েছে।

বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন আদর্শ হিসেবে নেন ভারতীয় মহিলা ফুটবল দল গড়ে ওঠার ইতিহাসকে। ৩০/৪০ বছর ধরে ভারতের মহিলা ফুটবল দল গড়ে উঠেছে। ভারতীয় দলে উপজাতি বা পাহাড়ী ও মণিপুরী মেয়েদের মেয়েদেরই আধিক্য। কারণ পাহাড়ী মেয়েদের ফিটনেস, স্বাস্থ্য ও শক্তিমত্তা অন্য যেকোন অঞ্চলের মেয়েদের চেয়ে ভাল। দারুণ উচ্চতার সঙ্গে আছে কঠোর কর্মনিষ্ঠা। এরপরই বাংলাদেশের পাহাড়ী অঞ্চলসমূহের মেয়েদের নিয়ে দল গঠনের চিন্তা আসে। পরে বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির মেয়েদের নিয়ে ট্যালেন্ট হান্ট কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। ৫০ জন মেয়েকে বাছাই করে ঢাকায় আনা হয় উন্নত ও ধারাবাহিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রকৃত ফুটবলার হিসেবে গড়ে তোলার জন্য। নিতান্তই দরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর পরিবার থেকে আসা এই মেয়েদের উজ্জীবিত রাখতে মাসিক আর্থিক ভাতার ব্যবস্থা করা হয়। এমনকি তাদের আনসার-ভিডিপিসহ বিভিন্ন সরকারী ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেয়া হয়। আর এটাই এই মেয়েদের মানসিকভাবে আরও চাঙ্গা করে তোলে এবং আগ্রহ বাড়িয়ে দেয় ফুটবলের প্রতি। কারণ এই মেয়েদের অনেকেই কখনও প্রত্যন্ত গ্রামের গ-ি পেরিয়ে ঢাকা শহর বা বড় কোন জেলা শহরে পা রাখেনি। তাদের পরিবার একসঙ্গে নগদ ১০ হাজার টাকাও দেখেনি। কিন্তু ফুটবলে মনোনিবেশের পর এ দুটোই সম্ভব হয়েছে যা ছিল এই পরিবারগুলোর জন্য কল্পনার অতীত। নিবিড় অনুশীলন শুরু হয়। এভাবেই ভাল একটি মহিলা ফুটবল দল গড়ার প্রক্রিয়া শুরু। দেশী-বিদেশী কোচ ও ট্রেনার দিয়ে ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ, আবাসিক ও কন্ডিশনিং ক্যাম্প পরিচালনা করা হয়। প্রবাদ আছে ‘সাফল্য অর্জনে প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই’- সেটাই যেন সত্য হয়ে যায়।

টানা অনুশীলন ও প্রশিক্ষণের পর যখন একটা প্রকৃত ফুটবল দলে পরিণত হয় বাংলাদেশ মহিলা ফুটবল দল, তখনই বছর দুয়েক পর ঢাকায় আয়োজন করা হয় ইন্দো-বাংলা গেমস। সেখানে পশ্চিমবঙ্গের মহিলা ফুটবল দলকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় বাংলাদেশের মেয়েরা। অথচ তাদের বিরুদ্ধেই কয়েক ডজন গোল হজম করে যাত্রা শুরু হয়েছিল বাংলাদেশ মহিলা ফুটবল দলের। শিরোপা জেতার পরই যেন সামনে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা হয়ে যায়। ঘাম ঝরানো অনুশীলন থেমে থাকেনি। অক্লান্ত শ্রম দিয়েছে এই ফুটবল অন্তঃপ্রাণ মেয়েরা। পরবর্তীতে গত বছর এশিয়া কাপ বাছাইয়ে এশিয়ার শক্তিশালী দল জর্ডানকে হারিয়ে শুরু করে বাংলাদেশের মেয়েরা। অথচ আগের আসরেই ৬-০ গোলে হেরে গিয়েছিল তাদের কাছে। বর্তমান সময়ে পশ্চিমবঙ্গের মেয়েরা দূরের কথা, ভারত জাতীয় দলও বাংলাদেশের বিরুদ্ধে জয় পেতে হিমশিম খেয়ে যায় এবং সমীহ করেই খেলে। বাংলাদেশ মহিলা ফুটবল দল সমীহ পায় শক্তিশালী ইরান, জর্ডান, থাইল্যান্ডের মতো মহিলা ফুটবল দলগুলোর কাছেও। অজপাড়া গাঁয়ের এই মেয়েরা শহরের নিয়ন আলোয় শুধু আসেনি সুদূর আমেরিকায়ও সফর করেছে। আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট খেলার সুবাদে এশিয়ার বিভিন্ন দেশ সফরের অভিজ্ঞতা হয়েছে।

৩/৪ বছর আগের পিছিয়ে পড়া সেই মেয়েরা এখন চলাফেরা, কথায় ও আচরণে একেবারেই পরিবর্তিত স্বনির্ভর ও আত্মবিশ্বাসী নারীতে পরিণত হয়েছে। কারণ তাঁদের হাতেই এখন যেন সংসারের ভার, পরিবারের হাতে লাখ টাকা তুলে দিতে পেরেছে এই ফুটবলাররা। তাই এখন পাহাড়ী এলাকার পরিবারগুলো মেয়েদের ফুটবলে পারদর্শী করে তুলতে দারুণ উন্মুখ। রুটি-রুজির সংস্থান যেখান থেকে সেটার জন্য মানুষ মরিয়া থাকে। ফুটবলের মাধ্যমে সেটা বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক মেয়েই করতে পেরেছে। আর সে কারণেই ফুটবলের প্রতি অন্তঃপ্রাণ এখন যারা খেলছেন। তাই এগিয়ে গেছে বাংলাদেশের মহিলা ফুটবল। সেটারই সুফল এবার এএফসি অনূর্ধ-১৪ আঞ্চলিক শিরোপা। আরও অগ্রগামী হওয়ার আলোকবর্তিকাও দেখা যাচ্ছে সাম্প্রতিক উৎসাহ ও উদ্দীপনার মধ্যে দিয়ে। যে অগ্রযাত্রার শুরু সেটা আর থেমে রাখা যাবে না, এগিয়ে যাবে বাংলাদেশের মহিলা ফুটবল, আসবে আরও গৌরব।